২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির মাইলফলক অর্জনে কাজ করবে সরকার
বর্তমান সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের অর্থনীতির আকার ট্রিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অর্জনের লক্ষ্যে কাজ করছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। একইসঙ্গে তিনি জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের মাথাপিছু আয় ২ হাজার ৭৬৯ মার্কিন ডলার।
সোমবার (৬ এপ্রিল) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের নবম দিনে ঢাকা-১৮ আসনের সংসদ সদস্য এস এম জাহাঙ্গীর হোসেনের লিখিত প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা জানান। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল।
অর্থমন্ত্রী বলেন, 'বর্তমান সরকারের অন্যতম লক্ষ্য হলো ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি মাইলফলক অর্জন করা। এ লক্ষ্যে সরকার বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়ন, ক্রিয়েটিভ অর্থনীতি, স্পোর্টস অর্থনীতি ইত্যাদিকে বিবেচনায় নিয়ে কর্মপরিকল্পনা তৈরি করছে।'
জনগণের মাথাপিছু আয় বাড়ানোর বিষয়ে তিনি সংসদে জানান, সরকার শুধু একটি খাতে নয়, বরং কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, উৎপাদন, রপ্তানি, প্রবাস আয়, দক্ষতা উন্নয়ন, সামাজিক সুরক্ষা এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা—সবগুলো দিক একসঙ্গে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে।
মাথাপিছু আয় বাড়াতে সরকারের গৃহীত প্রধান পদক্ষেপগুলো তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী জানান:
কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বেকারত্ব কমানো: দেশে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। উৎপাদন, নির্মাণ, সেবা, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি-প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা খাতে কাজের সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কর্মসংস্থান বাড়লে পরিবারের আয় বাড়ে, ফলে মাথাপিছু আয়ও ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায়।
বেসরকারি বিনিয়োগ ও শিল্পায়ন বৃদ্ধি: ব্যবসা শুরু ও সম্প্রসারণের প্রক্রিয়া সহজ করা, বিনিয়োগ-সহায়ক পরিবেশ তৈরি, শিল্প স্থাপনে উৎসাহ দেওয়া এবং উৎপাদনমুখী খাতে অর্থপ্রবাহ বাড়ানোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়লে নতুন কারখানা, নতুন ব্যবসা এবং নতুন চাকরির সুযোগ সৃষ্টি হয়, যা সরাসরি আয় বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।
ক্ষুদ্র, মাঝারি ও উদ্যোক্তা খাতে সহায়তা: ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ দেশের কর্মসংস্থানের বড় উৎস। এ খাতের জন্য অর্থায়ন সহজ করা, নতুন উদ্যোক্তাকে সহায়তা দেওয়া, নারী ও যুব উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করা এবং বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে ছোট ব্যবসা বড় হবে, নতুন কর্মসংস্থান ও আয়ের সুযোগ তৈরি হবে এবং স্থানীয় পর্যায়ে অর্থনৈতিক কার্যক্রম বাড়বে।
গৃহীত প্রধান পদক্ষেপ
রপ্তানি বৃদ্ধি ও বাজার সম্প্রসারণ: রপ্তানিমুখী শিল্পকে উৎসাহ প্রদান, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, নতুন বাজার অনুসন্ধান এবং বিদ্যমান বাজার ধরে রাখার মাধ্যমে বৈদেশিক আয় বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। রপ্তানি আয় বাড়লে উৎপাদন বাড়ে, শিল্পে কর্মসংস্থান বাড়ে এবং সামগ্রিকভাবে মানুষের আয় বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়।
প্রবাস আয় বৃদ্ধি: বিদেশগামী কর্মীদের দক্ষতা বাড়ানো, বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণ, প্রবাস আয় বৈধ পথে পাঠাতে উৎসাহ দেওয়া এবং এ সংক্রান্ত সেবা সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রবাস আয় বাড়লে পরিবারভিত্তিক আয় বাড়ে, গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙা হয় এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অবস্থাও শক্তিশালী হয়।
দক্ষতা উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণ: দেশীয় ও বিদেশি শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী কারিগরি ও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। দক্ষ জনশক্তি বেশি আয় করতে পারে, ভালো কাজ পায় এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ায়। এই কারণে দক্ষতা উন্নয়নকে মাথাপিছু আয় বাড়ানোর একটি মৌলিক উপাদান হিসেবে ধরা হচ্ছে।
কৃষি, গ্রামাঞ্চল ও উৎপাদনভিত্তি শক্তিশালী করা: কৃষি উৎপাদন, গ্রামীণ অবকাঠামো, সেচ, খাদ্য সরবরাহ এবং কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র ব্যবসা জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গ্রামে আয় বাড়লে দেশের মোট আয়ও বাড়ে, কারণ জনসংখ্যার বড় অংশ এখনো গ্রামাঞ্চলে বসবাস করে।
বাস্তবায়নের সময়সীমা: উল্লিখিত পদক্ষেপগুলোর একটি অংশ চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরেই বাস্তবায়নাধীন আছে। আর বাকি পদক্ষেপগুলো স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে। বিশেষ করে কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, দক্ষতা উন্নয়ন, রপ্তানি ও প্রবাস আয় বৃদ্ধির উদ্যোগগুলো ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে নেওয়া হবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, 'মাথাপিছু আয় বাড়ানোর লক্ষ্যে সরকার এমন পদক্ষেপ নিচ্ছে, যেগুলো মানুষের আয় বাড়াবে, বেকারত্ব কমাবে, উৎপাদন ও বিনিয়োগ বাড়াবে, প্রবাস আয় ও রপ্তানি শক্তিশালী করবে এবং একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সুরক্ষিত রাখবে।'
