সব ধরনের জ্বালানির সরবরাহ বেড়েছে, তবু ফিলিং স্টেশনে লম্বা লাইন কেন?
গত দুই অর্থবছরের গড় দৈনিক ব্যবহারকে ছাড়িয়ে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে জ্বালানি সরবরাহ ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। তা সত্ত্বেও সারা দেশে গাড়িচালকদেরকে ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ সময় ধরে অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ক্রমবর্ধমান চাহিদা ও অসম বণ্টনের অসামঞ্জস্যের পাশাপাশি ভোক্তাদের আচরণের কারণে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলেই দেশব্যাপী জ্বালানি পাম্পগুলোতে এখন এই দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) ২ এপ্রিলের তথ্য অনুযায়ী, দৈনিক ডিজেল বিক্রির পরিমাণ ছিল ১২ হাজার ২৪৮ টন—২০২৫ সালের মার্চ-জুনের গড় ১২ হাজার ৬৫ টনের চেয়ে প্রায় ১.৫২ শতাংশ বেশি। পরিবহন ও কৃষি খাতে ডিজেলের নিরবচ্ছিন্ন চাহিদাকে নির্দেশ করে এই পরিসংখ্যান।
অকটেনের বিক্রিও সামান্য (০.৪১ শতাংশ) বেড়ে দৈনিক ১ হাজার ২২২ টনে দাঁড়িয়েছে। এটি ব্যক্তিগত যানবাহন, বিশেষ করে মোটরসাইকেলের অব্যাহত চাপের ইঙ্গিত দেয়।
তবে পেট্রোলের বিক্রি সামান্য কমে দৈনিক ১ হাজার ৪১১ টনে নেমেছে, যা আগের গড় ১ হাজার ৪২৭ টনের চেয়ে প্রায় ১.১২ শতাংশ কম।
বিপিসির তথ্য বলছে, জ্বালানির সার্বিক ব্যবহার বাড়ছে ঠিকই, কিন্তু চাহিদার বণ্টন সুষম নয়। এর ফলে নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় ঘাটতি দেখা দিচ্ছে এবং ফিলিং স্টেশনগুলোর ওপর বাড়তি চাপ পড়ছে।
বেড়েছে জ্বালানি বিক্রি
বছরওয়ারি তুলনা করলে দেখা যায়, সব প্রধান ক্যাটাগরিতেই জ্বালানির বিক্রি বেড়েছে।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে অকটেনের বিক্রি ছিল ৩ লাখ ৮৭ হাজার ২৫৬ টন, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৭.৩৪ শতাংশ বেড়ে ৪ লাখ ১৫ হাজার ৬৫৩ টনে দাঁড়িয়েছে। এ জ্বালানির দৈনিক বিক্রিও প্রায় ১ হাজার ৬১ টন থেকে বেড়ে ১ হাজার ১৩৯ টন হয়েছে।
পেট্রোলের বিক্রি ৪ লাখ ৩০ হাজার ৯৫২ টন থেকে প্রায় ৭.৩২ শতাংশ বেড়ে ৪ লাখ ৬২ হাজার ৪৭৫ টনে পৌঁছেছে। একই সময়ে এর দৈনিক ব্যবহার অনেকটা বেড়ে ১ হাজার ৬১ টন থেকে ১ হাজার s২৬৭ টন ছাড়িয়েছে।
অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত ডিজেলের বিক্রি তুলনামূলকভাবে কিছুটা কম বেড়েছে। এ জ্বালানির বিক্রি ৪২ লাখ ৫০ হাজার টন থেকে ২.২৪ শতাংশ বেড়ে ৪৩ লাখ ৫০ হাজার টন হয়েছে। দৈনিক ডিজেল সরবরাহও ১১ হাজার ৬৫৭ টন থেকে বেড়ে ১১ হাজার ৯১৮ টনে উন্নীত হয়েছে।
বিপিসির তথ্যানুসারে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট জ্বালানি তেলের সরবরাহ প্রায় ৬৮ লাখ ৩৫ হাজার টনে পৌঁছেছে।
তবু দেশজুড়ে দীর্ঘ লাইন
তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন।
ডিপোগুলো থেকে শিডিউল অনুযায়ী জ্বালানি সরবরাহ করা হলেও চট্টগ্রামে ফিলিং স্টেশনগুলো হয় রেশনিং পদ্ধতিতে চলছে, নাহয় মাঝেমধ্যেই বন্ধ থাকছে। ভোক্তাদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে, এমনকি খালি হাতেও ফিরতে হচ্ছে অনেককে।
একটি ডিপোর একজন কর্মকর্তা বলেন, শিডিউল অনুযায়ী জ্বালানি সরবরাহ অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু 'ক্রমবর্ধমান চাহিদার তুলনায় এই পরিমাণ সবসময় পর্যাপ্ত থাকে না, ফলে পাম্পগুলো রেশনিংয়ের মাধ্যমে তেল বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে'।
সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে রেশনিং তুলে নিলেও বিভিন্ন স্টেশনে বিক্রির সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। স্টেশনগুলোতে মোটরসাইকেলের জন্য ৫০০ টাকা ও প্রাইভেট কারের জন্য সর্বোচ্চ ২ হাজার টাকার জ্বালানি বিক্রি করা হচ্ছে।
চট্টগ্রামের ডিলারস অ্যাসোসিয়েশনের নেতা মোহাম্মদ মইনুদ্দিন টিবিএসকে বলেন, দেশে জ্বালানির চরম সংকট নেই। 'কিন্তু মানুষ প্রয়োজনের চেয়ে বেশি জ্বালানি কিনে মজুত করছে—এটাই হলো মূল সমস্যা।'
আতঙ্কজনিত কেনাকাটা ও মজুত
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, হঠাৎ করে এই চাহিদা বৃদ্ধির পেছনে মূল কারণ হলো আতঙ্কজনিত কেনাকাটা (প্যানিক বায়িং) ও অবৈধভাবে জ্বালানি মজুত।
জ্বালানি বিভাগের একজন কর্মকর্তা জানান, একটি মোটরসাইকেলে মাসে গড়ে প্রায় ৬০ লিটার অকটেন প্রয়োজন হয়। তিনি বলেন, 'ব্যবহারকারীরা যদি বাড়িতে বাড়তি ২০-৩০ লিটার মজুত করতে শুরু করেন, তাহলে সেটা আসলে ১০-১৫ দিনের অগ্রিম চাহিদাকে এক ধাক্কায় সামনে নিয়ে আসে।'
মানুষের এই আচরণ জ্বালানির ব্যবহারে কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে দেয়, যা ফিলিং স্টেশনগুলোর ওপর তাৎক্ষণিক চাপ ফেলে। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, 'সরবরাহ চেইন তৈরি করা হয়েছে একটি স্বাভাবিক চাহিদার ওপর ভিত্তি করে, হঠাৎ করে মজুত করার জন্য নয়।'
সরবরাহ চেইনকে বিপর্যস্ত করছে চাহিদার ধাক্কা
মতিঝিলের একটি ফিলিং স্টেশনের ব্যবস্থাপক সাইফুল ইসলাম বলেন, 'আগে যেখানে সারাদিনে ১৩ হাজার লিটার অকটেন বিক্রি হতো, সেখানে এখন মাত্র পাঁচ ঘণ্টার মধ্যেই ৯ হাজার লিটার শেষ হয়ে যাচ্ছে।'
বাংলামোটরের আরেকটি স্টেশনে তেলবাহী ট্যাংকার আসতে দেরি হওয়ায় জ্বালানি বিক্রি বন্ধ রাখতে হয়েছিল। সেখানকার ব্যবস্থাপক বলেন, 'জ্বালানির ট্যাংকার এখনো এসে পৌঁছায়নি, তাই বিক্রি সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে।'
এমনকি যেসব স্টেশনে জ্বালানির সরবরাহ মোটামুটি ভালো, সেখানেও চাহিদা নাটকীয়ভাবে বেড়ে গেছে।
ঢাকার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের কাছের একটি ফিলিং স্টেশনের সহকারী ব্যবস্থাপক আহমদ রুশদ বলেন, 'আগে যেখানে প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৭০০টি মোটরসাইকেল আসত, এখন সেখানে প্রায় ৫ হাজার মোটরসাইকেল লাইনে দাঁড়াচ্ছে।'
তিনি আরও বলেন, 'আনুষ্ঠানিকভাবে যদিও রেশনিং তুলে নেওয়া হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। আমাদের লক্ষ্য হলো যতটা সম্ভব বেশিসংখ্যক গ্রাহকের জ্বালানি প্রাপ্তি নিশ্চিত করা।'
বিতরণে প্রতিবন্ধকতা ও সরবরাহে ঘাটতি
চাহিদার চাপের পাশাপাশি পরিবহন ও লজিস্টিক্যাল চ্যালেঞ্জগুলোও ফিলিং স্টেশনে এই দীর্ঘ লাইনের অন্যতম কারণ।
ফিলিং স্টেশনগুলোর দেওয়া তথ্যানুযায়ী, তারা প্রতিদিনের বদলে কয়েক দিন পরপর জ্বালানি পাচ্ছে। এর ফলে মাঝেমধ্যেই সংকট দেখা দিচ্ছে। যখন সরবরাহ আসে, তখন আগে থেকে জমে থাকা চাহিদার কারণে তা খুব দ্রুত শেষ হয়ে যায়।
উদাহরণস্বরূপ, চট্টগ্রামের একটি স্টেশন এক চালানে ১৩ হাজার লিটার অকটেন ও ৯ হাজার লিটার ডিজেল পেয়েছিল—কিন্তু স্বাভাবিকের চেয়ে দ্বিগুণ চাহিদার কারণে সেই মজুত খুব দ্রুত ফুরিয়ে যায়।
এদিকে জ্বালানির একটি সম্পূরক উৎস দেশীয় কনডেনসেট উৎপাদন কমে গেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ২৪৭.১০ টন থেকে উৎপাদন কমে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১৯৫.৯৮ টনে নেমেছে। প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) এর উৎপাদন কমেছে ২০.৬৯ শতাংশ। ফলে সরবরাহ আরও সংকুচিত হয়ে পড়েছে, যার কারণে অকটেন উৎপাদনও কমেছে।
