শীর্ষ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কাল বৈঠকে বসছেন প্রধানমন্ত্রী, গঠিত হচ্ছে ‘বেসরকারি খাত উপদেষ্টা পরিষদ’
দেশের বিনিয়োগ পরিবেশ এবং শিল্প খাতের বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে আলোচনার লক্ষ্যে আগামীকাল (৪ এপ্রিল) শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠকে বসছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠেয় এই বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির উপস্থিত থাকবেন বলে সরকারি সূত্রে জানা গেছে।
এমন এক সময়ে এই উচ্চপর্যায়ের সংলাপ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যখন বাংলাদেশের উৎপাদন ও বিনিয়োগ পরিস্থিতি জ্বালানি সংকট, ঋণের উচ্চ সুদ হার এবং সামষ্টিক অর্থনীতির নানা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই বৈঠকের মাধ্যমে দেশে প্রথমবারের মতো 'বেসরকারি খাত উপদেষ্টা পরিষদ' আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করবে। নীতিনির্ধারক ও ব্যবসায়ী নেতাদের মধ্যে একটি কাঠামোগত সংলাপের পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে এই প্ল্যাটফর্মটি কাজ করবে।
প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে গঠিত এই পরিষদে অর্থমন্ত্রী ও বাণিজ্যমন্ত্রীর পাশাপাশি বস্ত্র, ওষুধ, ফুটওয়্যার, অটোমোবাইল এবং ভোগ্যপণ্য খাতের ৯ জন বিশিষ্ট উদ্যোক্তা সদস্য হিসেবে থাকছেন।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের শুরুর দিকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার আলোকে ব্যবসায়িক পরিবেশের উন্নয়নে এই পরিষদ গঠনের নীতিগত পরিকল্পনা করা হয়েছিল। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক বিন হারুন এই পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন। তবে এরপর এ বিষয়ে আর কোনো অগ্রগতি জানা যায়নি।
কর্মকর্তারা বলছেন, এই প্ল্যাটফর্মের লক্ষ্য হলো নীতিনির্ধারক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে সরাসরি মতবিনিময়ের একটি কার্যকর চ্যানেল তৈরি করা। এর মাধ্যমে বাস্তবভিত্তিক তথ্যের ওপর নির্ভর করে আরও সময়োপযোগী ও কার্যকর অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়ন সম্ভব হবে।
উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন ডিবিএল গ্রুপের এম এ জব্বার, প্যাসিফিক জিন্সের সৈয়দ এম তানভীর, অ্যাপেক্স ফুটওয়্যারের সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর, বে ফুটওয়্যারের জিয়াউর রহমান, প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের আহসান খান চৌধুরী, ইনসেপ্টা গ্রুপের আব্দুল মুক্তাদির, রানার গ্রুপের হাফিজুর রহমান খান, র্যাংগস গ্রুপের সোহানা রউফ চৌধুরী এবং এসিআই-এর আরিফ দৌলা।
বিডা চেয়ারম্যান আশিক বিন হারুন বলেন, ব্যবসায়ীদের চ্যালেঞ্জগুলো আরও গভীরভাবে বোঝার প্রধানমন্ত্রীর যে সদিচ্ছা, এই উদ্যোগ তারই প্রতিফলন। তিনি বলেন, 'প্রধানমন্ত্রী সরাসরি ব্যবসায়ী নেতাদের কাছ থেকে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা, তারা কী ধরনের প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হচ্ছেন, তাদের কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন এবং কোন ধরণের নীতিগত পদক্ষেপ নতুন বিনিয়োগের পথ উন্মুক্ত করতে পারে—সেসব বিষয়ে শুনতে চান।' তিনি আরও জানান, ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের তাৎক্ষণিক সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা এবং সক্ষমতা বজায় রাখার উপায়গুলো নিয়ে আলোচনায় গুরুত্ব দেওয়া হবে।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বৈঠকে চলমান জ্বালানি সংকট নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার সম্ভাবনা রয়েছে, যা শিল্পোৎপাদন ব্যাহত করার পাশাপাশি পরিচালন ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। এছাড়া ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদ হার, অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা এবং পুঁজিবাজারের অস্থিরতা নিয়েও ব্যবসায়ীরা উদ্বেগ প্রকাশ করতে পারেন।
স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) কাতার থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি এবং বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে প্রয়োজনীয় নীতিগত সমন্বয় নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হবে।
বৈঠকে আমন্ত্রিত একজন ব্যবসায়ী নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বর্তমানে উদ্যোক্তারা 'বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ' মোকাবিলা করছেন। তিনি বলেন, 'জ্বালানি সংকট ও উচ্চ সুদ হার এখন বড় উদ্বেগের বিষয়। একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাত ও পুঁজিবাজারের দুর্বলতা ব্যবসায়ীদের সামগ্রিক আত্মবিশ্বাসে প্রভাব ফেলছে। আমরা বৈঠকে এই বিষয়গুলো তুলে ধরব।'
রানার গ্রুপের চেয়ারম্যান হাফিজুর রহমান খান বলেন, ব্যবসায়ী সমাজ এই উপদেষ্টা পরিষদ গঠনকে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে, তবে তারা সুনির্দিষ্ট ফলাফল আশা করছেন। তিনি বলেন, 'আমরা এখনও বৈঠকের চূড়ান্ত আলোচ্যসূচি জানি না। তবে অটোমোবাইল খাতের দৃষ্টিকোণ থেকে কর ব্যবস্থা, রেজিস্ট্রেশন এবং নীতির ধারাবাহিকতা নিয়ে আমাদের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। আমরা আশা করি, এই প্ল্যাটফর্মটি অর্থবহ সংস্কারের পথ সুগম করবে।'
