সরকার রেশনিং তুলে নিলেও পাম্প মালিকরা কমাচ্ছেন তেল বিক্রির পরিমাণ
ইরান যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বব্যাপী হুমকিতে পড়েছে জ্বালানি তেলের সরবরাহ। জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশ হিসাবে বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহও পড়েছে নানাবিধ জটিলতায়। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তেলের সংকট মোকাবিলায় চলতি মাসের ৬ তারিখ জ্বালানি তেল রেশনিংয়ের সিদ্ধান্ত জানিয়েছিল সরকার।
পরবর্তীতে ১৫ মার্চ, ফিলিং স্টেশনগুলোতে তেলের সংকট এবং দীর্ঘ যানবাহনের সারি নিয়ে বাড়তে থাকা জনভোগান্তির অভিযোগের প্রেক্ষাপটে সরকার পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেলের ওপর বিদ্যমান রেশনিং ব্যবস্থা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয়।
এখন আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো রেশনিং না থাকলেও রাজধানীর ফিলিং স্টেশনগুলোতে দেখা মিলছে ভিন্ন চিত্রের। জ্বালানি তেল বিক্রিতে সরকারের বেঁধে দেয়া কোনো সীমা না থাকলেও—পাম্প অপারেটররা ৫০০ বা ৬০০ টাকার বেশি তেল দিচ্ছেন না মোটরসাইকেলে। প্রাইভেট কারের ক্ষেত্রেও এমন সীমা দেখা গেছে।
বেসরকারি চাকরিজীবী সালাহউদ্দিন আহমেদ টিবিএসকে বলেন, "বাইকের তেল নেয়ার জন্য তিনটি ফিলিং স্টেশনে ঘুরতে হয়েছে। রাজধানীর ধোলাইপার, গুলিস্তানে ফিলিং স্টেশন বন্ধ পেয়ে শেষে মৎসভবন এলাকার একটি পাম্পে ঘন্টাখানেক সিরিয়ালে দাঁড়ানোর পর তেল পেয়েছি। তবে অনেক অনুরোধ করা সত্ত্বেও পাম্প কর্তৃপক্ষ ৫০০ টাকার বেশি তেল দিচ্ছে না।"
একইরকম চিত্র দেখা যায় রাজধানীর পরিবাগের মেঘনা মডেল সার্ভিস সেন্টার ফিলিং স্টেশনে। তেল নেয়ার জন্য ৩০০ মিটারের বেশি লাইন করে দাঁড়িয়ে ছিলেন বাইকার এবং প্রাইভেট কার চালকরা। এখানে বাইকারদের সর্বোচ্চ ৬০০ টাকার তেল দিচ্ছিলেন পাম্প অপারেটররা। এবং প্রাইভেট কারে সর্বোচ্চ ১০ লিটার করে জ্বালানি তেল সরবরাহ করতে দেখা যায়।
গ্রাহকরা অভিযোগ করছেন, তেলের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। সরকার রেশনিং পদ্ধতি তুলে দিলেও, বাড়তি চাপ সামলাতে ফিলিং স্টেশনগুলো তেল দেয়ার পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছে।
এখানে কথা হয় তেল নিতে আসা রাইড শেয়ারিং বাইক চালক জোবায়ের আহমেদের সাথে। তিনি বলেন, "ঘন্টাখানেক সিরিয়ালে অপেক্ষা করার পর ফিলিং স্টেশনের নজলের কাছাকাছি আসতে পারলাম। কিন্তু, চাহিদামাফিক তেল পাচ্ছি না। এখানে সর্বোচ্চ পাঁচ লিটার অকটেন দিচ্ছে বাইক চালকদের।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, "সিন্ডিকেট ও কারসাজি করে বেশি মুনাফার আশায় এমন সংকট তৈরি করেছেন মাম্প মালিকরা। খোলাবাজারে ২০০ টাকা দরে প্রতি লিটার অকটেন বিক্রি হচ্ছে। উত্তরার একটি বাইকের দোকান থেকে ঈদের দুইদিন পরে ১০ লিটার অকটেন ২,০০০ টাকায় নিতে বাধ্য হয়েছি, যেখানে সরকার নির্ধারিত মূল্য প্রতি লিটার অকটেন ১২০ টাকা।"
রাজধানীতে তেলের অভাবে বেশ কিছু ফিলিং স্টেশন বন্ধও দেখা গেছে। পেট্রলপাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম কাবুল টিবিএসকে বলেন, রাজধানী ঢাকার বাইরের পাম্পগুলোর অবস্থা আরো করুণ।
পাম্প মালিকদের এই প্রতিনিধি বলেন, "আমরা ডিপো থেকে চাহিদামাফিক তেল পাচ্ছি না। একটা ট্যাংকলরির ধারণক্ষমতা ৯,০০০ লিটার হলে ডিপো থেকে ৬,০০০ লিটার দিচ্ছে। ১৩,৫০০ লিটার হলে ৯,০০০ লিটার দিচ্ছে। কিন্তু, ডিপো থেকে তেল নিয়ে আসার ক্ষেত্রে আমাদের পরিবহন খরচ একই থাকছে, ক্ষেত্রবিশেষে বাড়ছে। ফলে অনেক পাম্প মালিক পাম্প বন্ধ রাখছেন বা কর্মী কমিয়ে আনছেন।
পাম্প মালিকদের স্বপ্রণোদিত হয়ে যানবাহনভেদে তেলের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণের বিষয়ে তিনি বলেন, "এটা ছাড়া কি করবে? এখন সবাই এসে ট্যাংক ফুল করতে চাচ্ছে। বেশিসংখ্যক গ্রাহকদের কাছে পৌঁছানোর জন্য এটা করতে হচ্ছে।"
তবে ভিন্ন চিত্রও দেখা যাচ্ছে । শনিবার দুপুর আড়াইটায় মহাখালীর ৪টি ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা যায়, যানবাহনের সারি খুব দীর্ঘ নয়। সিরিয়ালে ৪০-৫০টি প্রাইভেট গাড়ি ও সমপরিমাণ মোটরসাইকেল তেল নেয়ার জন্য সিরিয়ালে রয়েছে। তেল পেতে আধাঘন্টা লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। তবে চারটির মধ্যে ৩টিতে সর্বোচ্চ কোনো লিমিট নেই। যদিও একটিতে মোটরসাইকেলে সর্বোচ্চ ৫০০ টাকার এবং গাড়িতে সর্বোচ্চ ৩ হাজার টাকার তেল দেয়া হচ্ছিল। এসব পাম্পে দুপুর ১১টার পর থেকে তেল দেয়া শুরু হয়।
এরমধ্যে একটি গুলশান সার্ভিস স্টেশন। এই ফিলিং স্টেশনের একজন কর্মকর্তা জানান, ১১টায় একটি এবং ১২টায় আরেকটি তেলের গাড়ি ঢুকেছে। রাত ১০টা পর্যন্ত তেল দেয়া যাবে বলে জানান তিনি। টিবিএসকে তিনি বলেন, "আজকে পর্যাপ্ত তেল আছে। এ কয়দিন তেলের গাড়ি কম এসেছিল।"
যদিও ভিন্ন চিত্র ছিল বিজয় স্বরণীর ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে। গাড়ির সিরিয়াল স্টেশন থেকে শুরু হয়ে জাহাঙ্গীর গেট পার হয়ে বনানী থেকে আসা ফ্লাইওভারের মুখ পর্যন্ত চলে গিয়েছে। অন্য পাম্পগুলোতে পর্যাপ্ত তেল না দেয়া, তেল পাওয়ার নিশ্চয়তা না পাওয়া এবং বিশ্বস্ততার জন্য এ পাম্পে ভিড় করছেন গাড়িচালকরা। এছাড়া এ স্টেশনে মোটরসাইকেলের সিরিয়ালও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় পার হয়েছে।
গাড়িচালক হাবিবুর রশীদ বলেন, সাড়ে নয়টার দিকে লাইনে দাঁড়িয়েছিলাম। তেল পেতে ৫ ঘন্টা লেগেছে। তখন অন্য পাম্পগুলোতে তেল দিচ্ছিল না। ট্রাস্টে সবসময় ফুল তেল দিয়ে আসছে। একারণে সময় বেশি লাগলেও এখানে এসেছি।
জাহাঙ্গীর গেটে থাকা আরেকজন গাড়িচালক মেহেদী হাসান জানান, তিনি দুই ঘন্টা ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি বলেন, অন্য পাম্পগুলোতে অনেকক্ষণ লাইনে দাঁড়ানোর পর হঠাৎ করে বলে তেল শেষ। তখন উল্টো সময় নষ্ট হয়। একারণে ট্রাস্টে সময় বেশি লাগলেও এখানে চলে এসেছি।
এদিকে সারাদেশে ফিলিং স্টেশনগুলোতে ডিপো থেকে তেল সরবরাহ মনিটরিং জোরদার করতে প্রতিটি স্টেশনের জন্য 'ট্যাগ অফিসার' নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
কিছু ক্ষেত্রে নির্ধারিত পাম্পে তেল সরবরাহ না হয়ে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এছাড়া জেলা পর্যায়ে জ্বালানি তেল বিতরণ ও মজুত পরিস্থিতি তদারকিতে ভিজিল্যান্স টিম গঠন করা হয়েছে। মজুতদারদের তথ্য দিলে পুরস্কারের ঘোষণাও দিয়েছে সরকার।
