ঈদের ছুটিতে ব্যাংক বন্ধ থাকায় জ্বালানি সরবরাহে সংকট, পাম্পে ‘প্যানিক বায়িং’
ঈদুল ফিতরের ছুটিতে দীর্ঘ সময় ব্যাংক বন্ধ থাকায় ডিপো থেকে জ্বালানি সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটেছে। ফলে দেশের অনেক ফিলিং স্টেশনে চাহিদার তুলনায় কম জ্বালানি পৌঁছেছে। এতে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে জ্বালানি নিতে হচ্ছে মোটরসাইকেল চালকদের; কোথাও কোথাও দেখা যাচ্ছে বড় ধরনের ঘাটতিও।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ও পাম্প মালিকরা জানান, গত ১৭ থেকে ২৩ মার্চ পর্যন্ত টানা সাত দিন ব্যাংক বন্ধ থাকায় জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের জট তৈরি হয়েছে।
এই সময়ে ফিলিং স্টেশন মালিকরা পে-অর্ডার ইস্যু করতে পারেননি—যা ডিপো থেকে জ্বালানি উত্তোলনের জন্য বাধ্যতামূলক। ফলে নিয়মিত সরবরাহ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।
ব্যাংকিং সেবা না থাকায় ঈদের সময় ও এর আগে চাহিদা বেড়ে গেলেও ডিলাররা জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারেননি।
এদিকে সরকারের পক্ষ থেকে জ্বালানির কোনো সংকট নেই বলা হলেও পাম্প মালিকরা জানান, তারা পর্যাপ্ত সরবরাহ পাচ্ছেন না। এতে বিভিন্ন স্থানে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে এবং ক্ষুব্ধ গ্রাহকদের হুমকির মুখেও পড়তে হচ্ছে তাদের।
বড় শহরগুলো থেকে পাওয়া খবরে জানা গেছে, ফিলিং স্টেশনগুলোতে অকটেনের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে—যা মূলত ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেলে ব্যবহৃত হয়।
বিপিসির কর্মকর্তারা জানান, পে-অর্ডার ইস্যুতে বিলম্বের কারণে সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। তারা উল্লেখ করেন, অতীতে দীর্ঘ ছুটির সময়ে জ্বালানি ডিলারদের জরুরি লেনদেন নিশ্চিত করতে নির্বাচিত কিছু ব্যাংক শাখা খোলা রাখার নির্দেশনা দেওয়া হতো।
তবে এবার এমন কোনো ব্যবস্থা না থাকায় পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে।
এর সঙ্গে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ অনিশ্চয়তাও সংকটকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে হরমুজ প্রণালিতে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজার থেকে জ্বালানি সংগ্রহেও প্রভাব পড়েছে।
বাংলাদেশে পেট্রোলের পুরো চাহিদাই কনডেনসেট—গ্যাসের একটি উপজাত—প্রক্রিয়াজাত করে স্থানীয়ভাবে পূরণ করা হয়। আর অকটেনের প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ চাহিদা দেশীয়ভাবে মেটানো হলেও বাকি অংশ আমদানিনির্ভর। আন্তর্জাতিক সরবরাহে বিঘ্নের কারণে জ্বালানি ছাড়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে বিপিসি।
এদিকে, খুচরা পর্যায়ে চাপ দৃশ্যমান হলেও বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু প্রকৃত কোনো সংকটের আশঙ্কা নাকচ করে দিয়েছেন। বর্তমান পরিস্থিতির জন্য তিনি 'প্যানিক বায়িং' বা অতিরিক্ত জ্বালানি কেনাকে দায়ী করেছেন।
গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, "দেশে জ্বালানির কোনো সংকট নেই। তবে মানুষ প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কিনতে শুরু করায় ফিলিং স্টেশনগুলোতে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে দ্রুত মজুত শেষ হয়ে যাচ্ছে।"
তবে পাম্প মালিকরা বলছেন ভিন্ন কথা। কম বরাদ্দ ও সরবরাহজনিত সমস্যার কথা উল্লেখ করেছেন তারা। বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতির সভাপতি নজমুল হক বলেন, অনেক স্টেশন চাহিদার তুলনায় অনেক কম জ্বালানি পাচ্ছে।
টিবিএসকে তিনি বলেন, "আমি চাহিদার অর্ধেক জ্বালানি পাচ্ছি। প্যানিক বায়িং এবং সরবরাহ সংকটের কারণে পুরো পরিস্থিতিতে বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে।"
রমনা পেট্রোল পাম্পের মালিক নজমুল হক আরও বলেন, ব্যাংক বন্ধ থাকায় সময়মতো পে-অর্ডার ইস্যু করা সম্ভব হয়নি; এতে সংকট আরও গভীর হয়েছে।
চট্টগ্রামের পরিস্থিতি আরও গুরুতর। সেখানে একাধিক ফিলিং স্টেশনে সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, বিশেষ করে অকটেনের ক্ষেত্রে।
চট্টগ্রামের চান্দগাঁও বহির সিগন্যাল এলাকার শামন্তা সিএনজি ফিলিং স্টেশনে মাসিক বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। আগে যেখানে যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড থেকে প্রতি মাসে আটটি জ্বালানিবাহী ট্যাংকার পাওয়া যেত, এখন সেখানে প্রতি সপ্তাহে মাত্র একটি ট্যাংকার মিলছে।
স্টেশনটির ব্যবস্থাপক হাসান তারেক বলেন, "যমুনা থেকে স্বাভাবিক তেলের সরবরাহ না থাকাই আমাদের প্রধান সংকট। বর্তমানে আমরা অকটেন দিতে করতে পারছি না। ঈদের আগে পাওয়া মজুত শেষ হয়ে গেছে; ফলে টানা তিন দিন ধরে সরবরাহ বন্ধ রয়েছে।"
বন্দরনগরীর বিভিন্ন পেট্রোল পাম্প থেকেও একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এদিকে, এই পরিস্থিতির প্রভাব যাত্রী ও চালকদের ওপর পড়েছে তীব্রভাবে। অনেক স্টেশনে 'অকটেন নেই' লেখা সাইনবোর্ড ঝুলতে দেখা গেছে, আবার কোথাও সীমিত পরিমাণে জ্বালানি সরবরাহ করা হচ্ছে।
গণি বেকারি এলাকার কাছে অপেক্ষমাণ মোটরচালক আবসার হোসেন বলেন, "গতকাল সন্ধ্যা থেকে খুঁজছি, কিন্তু কোথাও অকটেন পাইনি। কোথাও পেলেও অল্পের বেশি দিচ্ছে না।"
রাইডশেয়ার চালক আবদুর রহমান বলেন, এই সংকট তার আয়ে সরাসরি প্রভাব ফেলেছে। তিনি বলেন, "আধা ঘণ্টার বেশি লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও ঠিকমতো চালানোর মতো জ্বালানি পাইনি।"
দেশজুড়ে পেট্রোল ও অকটেনের ব্যাপক সংকটে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। রাজশাহী, দিনাজপুর, বগুড়া, সাভার ও আশুলিয়ায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এসব এলাকার অধিকাংশ পাম্প বন্ধ রয়েছে।
নিরাপত্তা শঙ্কা
এদিকে, নিরাপত্তা উদ্বেগ ও চলমান জ্বালানি সংকটের কারণে দেশের বিভিন্ন স্থানে ফিলিং স্টেশন বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে রোববার সতর্ক করেছে বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতি।
সমিতির দাবি, জ্বালানি কোম্পানিগুলোর দৈনিক বরাদ্দ ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে পর্যাপ্ত নয়, ফলে সারা দেশের পেট্রোল পাম্পগুলো একটি 'সংকটাপন্ন পরিস্থিতির' মুখে পড়েছে।
তাদের অভিযোগ, জ্বালানি বিপণন ব্যবস্থায় নিরাপত্তার বিষয়টি সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছে না। এর ফলে পাম্পগুলোতে বিশৃঙ্খলা বাড়ছে।
সাম্প্রতিক ঘটনার উল্লেখ করে সমিতি জানায়, ঈদের আগে একটি পাম্পে প্রায় ১০,৫০০ লিটার পেট্রোল ও সমপরিমাণ অকটেন এবং অন্য একটি পাম্পে প্রায় ৮,০০০ লিটার জ্বালানি মজুত থাকলেও 'প্যানিক বায়িং' ও বিশৃঙ্খলার কারণে অল্প সময়ের মধ্যেই তা শেষ হয়ে যায়।
এ পরিস্থিতিকে এক ধরনের 'লুটপাট' হিসেবে বর্ণনা করে সমিতি দাবি করেছে, কিছু ব্যক্তি দিনে একাধিকবার জ্বালানি কিনে তা বেশি দামে বিক্রি করছে।
কিছু ক্ষেত্রে মোটরসাইকেল আরোহীরা দিনে ১০ বার পর্যন্ত জ্বালানি নিচ্ছেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। আবার কেউ কেউ আংশিক খালি ট্যাংক নিয়ে বারবার ফিরে এসে জ্বালানি নিচ্ছেন, ফলে প্রকৃত গ্রাহকরা জ্বালানি পাচ্ছেন না।
সমিতি আরও অভিযোগ করেছে, সংঘবদ্ধ কিছু গোষ্ঠী রাতে জোরপূর্বক পাম্প খুলে জ্বালানি নিয়ে যাচ্ছে।
ঠাকুরগাঁওয়ের একটি ঘটনার উল্লেখ করে জানানো হয়, সরবরাহ কার্যক্রম চলাকালে লাঠিসোঁটা নিয়ে এসে একদল দুর্বৃত্ত জ্বালানি লুট করে নিয়ে গেছে।
