মোংলায় চিংড়ির ঘের দখল নিয়ে দুই পক্ষের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, আহত ২১
বাগেরহাটের মোংলার চাঁদপাই ইউনিয়নে ৩০ বিঘার একটি চিংড়ি ঘেরের দখলকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। বুধবার (১৮ মার্চ) দুপুরে কানাইনগর এলাকায় ঘটে যাওয়া এই সংঘাতের ঘটনায় উভয় পক্ষের অন্তত ২১ জন গুরুতর জখম হয়েছেন। আহতদের উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে এবং আশঙ্কাজনক অবস্থায় দুজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
ভুক্তভোগী ও স্থানীয়রা জানায়, কালিকাবাড়ি এলাকার ৩০ বিঘা আয়তনের একটি চিংড়ি ঘেরের দখল নিয়ে সেলিম ও জাকির গ্রুপের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে দ্বন্দ্ব চলে আসছিল। ভুক্তভোগীদের দাবি, এ জমির মূল মালিক সেলিম রেজা বাচ্চু ও মৃনাল নামের দুই ব্যক্তি। জমিটি নিয়ে সেলিম রেজা বাচ্চু দীর্ঘদিন ধরে তালবাহানা করায় এবং তারই 'কারসাজিতে' এই সংঘর্ষের সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
জানা গেছে, ২০২৫ সালে ওই চিংড়ি ঘেরটি বাচ্চুর কাছ থেকে লিজ (বাৎসরিক চুক্তি) নিয়ে মাছ চাষ করেছিলেন মোঃ সেলিম হাওলাদার। পরে সেলিম হাওলাদারের সাথে মালিক বাচ্চুর টাকার হিসাব নিয়ে সমস্যা তৈরি হয়। সেলিম হাওলাদারের পাওনা না মিটিয়েই ২০২৬ সালে ঘেরটি জাকির গ্রুপকে লিজ দেন মালিক বাচ্চু। এ নিয়ে পূর্বের চাষি ও বর্তমান দখলদার সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা চরমে পৌঁছায়। বর্তমানে ঘেরটিতে দুই গ্রুপই বসবাস করছিল এবং দখলের চেষ্টা চালাচ্ছিল।
বুধবার দুপুরে ওই ঘেরের দখলকে কেন্দ্র করে সেলিম হাওলাদারের পক্ষে আ. রশিদ গ্রুপ ও জাকির গ্রুপের সমর্থকরা দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে একে অপরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। প্রায় ঘণ্টাব্যাপী চলা এই সংঘর্ষে কানাইনগর এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। সংঘর্ষে রশিদ গ্রুপের কাশেম, জাফর, ওহিদ, লাখী বেগম, জাহিদ, ফরিদ ও ওহিদুলসহ ১১ জন রক্তাক্ত জখম হন। অন্যদিকে জাকির গ্রুপের মালেক, আলাম, আঃ সোরাপ ব্যাপারী, কালাম, ওসমান, আলামিন ও রোকেয়া বেগমসহ অন্তত ১০ জন আহত হন।
আহতদের ডাক চিৎকারে স্থানীয়রা এগিয়ে এসে তাদের উদ্ধার করে মোংলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। এদের মধ্যে রশিদ গ্রুপের জাফর ও কাশেমের অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাদের দ্রুত খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এক গ্রুপের প্রধান জাকির আওয়ামী লীগের ওয়ার্ড কমিটির সভাপতি এবং তিনি দীর্ঘদিন ধরে বন্দরের বাণিজ্যিক জাহাজের চোরাকারবারের সাথে যুক্ত। তার হাতের দেশীয় অস্ত্রের আঘাতেই ৮-১০ জন রক্তাক্ত জখম হয়েছে বলে দাবি তাদের। স্থানীয়দের মতে, মালিক সেলিম রেজা বাচ্চুর পরামর্শেই এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়েছে।
মোংলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. বুলেট সেন জানান, "দুপুরের পর মারামারির ঘটনায় ১৮ থেকে ২০ জন রোগী মোংলা হাসপাতালে এসেছেন। এদের মধ্যে ১২ জনকে ভর্তি করা হয়েছে এবং দুজনকে গুরুতর অবস্থায় খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। বাকিদের ওপরও পর্যবেক্ষণ চালানো হচ্ছে।"
মোংলা থানার ওসি (তদন্ত) মানিক চন্দ্র গাইন বলেন, "খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। বর্তমানে এলাকায় নতুন করে সংঘর্ষ এড়াতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। এ সংঘাতের ঘটনায় জমির মালিক বাচ্চুর ভূমিকাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পুরো কানাইনগর এলাকায় এখন থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে।"
পুলিশ আরও জানায়, ভুক্তভোগী পরিবারগুলো থানায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব না হলেও পুলিশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর মোংলা উপজেলায় অন্তত ৭৫টি মাছের ঘের দখলের ঘটনা ঘটেছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
