ঈদের ছুটিতে ফাঁকা চট্টগ্রাম, নেই চিরচেনা যানজট; নিরাপত্তায় সিএমপির ১৯ নির্দেশনা
পবিত্র ঈদুল ফিতরের দীর্ঘ ছুটিতে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম এখন অনেকটাই জনশূন্য হয়ে পড়েছে। মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) থেকেই নগরের ব্যস্ততম এলাকাগুলোতে চিরচেনা যানজট ও ভিড় উধাও হয়ে গেছে।
বুধবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বহদ্দারহাট, চকবাজার ও কাজির দেউড়ি মোড়ের মতো জনবহুল এলাকা ছিল প্রায় ফাঁকা। মুরাদপুর থেকে আগ্রাবাদ পর্যন্ত যেতে গণপরিবহনগুলোকে কোনো ধরনের সিগন্যালের মুখে পড়তে হয়নি।
বাস ও সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালকরা জানিয়েছেন, এবার ঈদের ছুটি দীর্ঘ হওয়ায় মানুষ আগেভাগেই শহর ছাড়তে শুরু করেছেন। বিশেষ করে শনি ও রোববার থেকে ঘরমুখী মানুষের ঢল নামে বাস ও রেল স্টেশনে। সোমবার শবে কদরের পর থেকে এই ভিড় আরও বেড়ে যায়। আজ বুধবার সকাল থেকেও চট্টগ্রামের আশপাশের জেলাগুলোর বাসিন্দারা শহর ছাড়ছেন, যার ফলে রাস্তায় বাসের সংখ্যা কমে গেছে এবং ছোট গাড়ির চাপ বাড়ছে।
নগরীর বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত আগ্রাবাদ ও ব্যাংক পাড়ায় প্রতিদিনের যে যানজট থাকে, গতকাল বিকেলে সেখানে তার ছিটেফোঁটাও ছিল না। বহদ্দারহাট থেকে আগ্রাবাদ কিংবা পতেঙ্গা থেকে কালুরঘাট সব রুটেই যাত্রীর সংকট দেখা দিয়েছে। বাসের চালক ও সহকারীরা জানিয়েছেন, যাত্রী কম থাকায় তেলের খরচ তোলাও এখন কঠিন হয়ে পড়েছে, ফলে অনেক মালিক গাড়ি বের করছেন না।
মূলত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পরিবার আগেভাগেই গ্রামে চলে যাওয়ায় এবং শবে কদরের আগেই ঈদের কেনাকাটা শেষ করে সাধারণ মানুষ বাড়ির পথ ধরায় শহর এখন শান্ত। সরকারি ছুটির সাথে ১৮ মার্চ বাড়তি ছুটি যুক্ত হওয়ায় এবার টানা সাত দিনের বড় অবকাশ পাচ্ছেন সরকারি কর্মীরা, যা নগরীকে দ্রুত ফাঁকা করে দিয়েছে।
যাত্রী সংকটের এই চিত্র ফুটে ওঠে বাসের সহকারী ২৫ বছর বয়সী মইন উদ্দিনের কথায়। তিনি টিবিএসকে বলেন, গত রাত থেকেই যাত্রী সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে এবং মঙ্গলবার সকাল থেকে পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। পর্যাপ্ত যাত্রী না থাকায় গাড়ির তেলের খরচ জোগানোই এখন চালক ও সহকারীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মইন উদ্দিন আরও জানান, পতেঙ্গা থেকে কালুরঘাট যাওয়ার পথেও হাতেগোনা কয়েকজন যাত্রী পেয়েছেন তারা। মূলত তীব্র যাত্রী সংকটের কারণেই সড়কে গণপরিবহণের সংখ্যা এখন নগণ্য।
সিএমপির ১৯ নির্দেশনা
এদিকে শহর ফাঁকা হওয়ার সুযোগে বাসাবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চুরির ঘটনা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)। এই নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে নগরবাসীর জন্য ১৯টি বিশেষ নির্দেশনা জারি করেছে পুলিশ প্রশাসন।
মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) সিএমপির জনসংযোগ শাখা থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে নাগরিকদের অনুরোধ করা হয়েছে যেন তারা বাসা বা অফিস ছাড়ার আগে দরজায় উন্নতমানের অতিরিক্ত তালা ব্যবহার করেন এবং ঘরে নগদ টাকা, স্বর্ণালঙ্কার বা মূল্যবান সামগ্রী রেখে না যান।
এছাড়া সিসি ক্যামেরা ও অ্যালার্ম সিস্টেম সচল আছে কি না তা পরীক্ষা করা এবং প্রয়োজনবোধে অতিরিক্ত নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। নতুন নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র ও ছবি সংরক্ষণ করা এবং এলাকা ত্যাগের আগে সংশ্লিষ্ট বিট অফিসার বা থানাকে অবহিত করার ওপর জোর দিয়েছে পুলিশ।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে একসঙ্গে ছুটি না দিয়ে একটি অংশকে নিরাপত্তার দায়িত্বে রাখতে হবে এবং ভল্ট এলাকায় সিসি ক্যামেরার কাভারেজ নিশ্চিত করতে একজন ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তা নিয়োগ করতে হবে। এছাড়া রাতে প্রতিষ্ঠানের চারপাশ পর্যাপ্ত আলো এবং গ্যারেজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।
আরও বলা হয়েছে, কোনো অপরাধী যেন জানালার পাশে থাকা গাছের ডাল ব্যবহার করে ভেতরে ঢুকতে না পারে, সেজন্য গাছের অপ্রয়োজনীয় শাখা কেটে ফেলারও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ভাড়াটিয়াদের ক্ষেত্রে ঈদের ছুটিতে বাড়িতে না থাকার বিষয়টি আগেভাগেই বাড়ির মালিককে জানিয়ে রাখার অনুরোধ করা হয়েছে।
ভ্রমণকালীন নিরাপত্তার বিষয়েও পুলিশ বেশ কিছু সতর্কতা জারি করেছে। হাইওয়ে বা ব্যক্তিগত গাড়ি বেপরোয়া গতিতে না চালানো এবং অপরিচিত কারো দেওয়া খাবার বা পানীয় গ্রহণ না করতে বলা হয়েছে, যাতে অজ্ঞান পার্টি বা মলম পার্টির খপ্পরে পড়তে না হয়।
এছাড়া নাগরিকদের ঈদযাত্রা ও ফাঁকা শহরের নিরাপত্তা নিশ্চিতে পুলিশের টহল ও নজরদারি কয়েকগুণ বাড়ানো হয়েছে। যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা বা সন্দেহজনক চলাফেরা দেখলে তাৎক্ষণিকভাবে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ অথবা সিএমপির হটলাইন নম্বরগুলোতে (০১৩২০-০৫৭৯৯৮, ০১৩২০-০৫৭৯৯৯) যোগাযোগ করার জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে।
নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (গণমাধ্যম) আমিনুর রশীদ টিবিএসকে বলেন, 'নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নগরে যে বিশেষ নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়েছিল, সেই কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা বর্তমানেও বলবৎ রয়েছে। যদিও আমাদের কিছু সদস্য ছুটিতে গিয়েছেন, তবে বাড়তি ফোর্স মোতায়েনের মাধ্যমে সেই শূন্যতা পূরণ করা হচ্ছে।'
তিনি আরও বলেন, 'ঈদের একদিন পরেই তারা আবার কর্মস্থলে ফিরবেন, তাই জনবল নিয়ে কোনো সমস্যা হবে না। এছাড়া নগরজুড়ে গোয়েন্দা নজরদারি আগের চেয়ে অনেক বাড়ানো হয়েছে। চট্টগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলো আমরা সিসিটিভির মাধ্যমে সার্বক্ষণিক মনিটরিং করছি। আশা করছি, আমরা নগরবাসীর সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারব।'
