ঈদের ছুটিতে দেশীয় পর্যটনে প্রাণচাঞ্চল্য, হোটেল–মোটেলে ৫০–৭০ শতাংশ অগ্রিম বুকিং
সাত দিনের ঈদুল ফিতরের ছুটি শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকতের শহর কক্সবাজারে পর্যটকদের ভিড় বাড়তে শুরু করেছে।
রমজানজুড়ে পর্যটক কম থাকলেও ঈদের ছুটিতে বদলাতে শুরু করেছে সেই চিত্র। ইতোমধ্যে ৫০০টির বেশি হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ কক্ষ অগ্রিম বুকিং হয়েছে। ১৯ থেকে ২৪ মার্চের মধ্যে পর্যটকের চাপ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে বলে আশা করছেন পর্যটন খাত-সংশ্লিষ্টরা।
পর্যটকদের স্বাগত জানাতে ব্যবসায়ী ও প্রশাসন ইতোমধ্যে নানা প্রস্তুতি নিয়েছে। বিশেষ আয়োজন, বিনোদনমূলক কর্মসূচি এবং বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। হোটেল মালিকরা জানান, বিলাসবহুল থেকে স্বল্প খরচের আবাসন—সবখানেই ধারাবাহিকভাবে বুকিং বাড়ছে।
কলাতলী মেরিন ড্রাইভ হোটেল-রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান বলেন, "ঈদুল ফিতর উপলক্ষে টানা এক সপ্তাহের ছুটিকে ঘিরে বিভিন্ন হোটেলে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ কক্ষ বুকিং সম্পন্ন হয়েছে।"
তিনি আশা প্রকাশ করেন, ঈদের ছুটিতে প্রতিদিন অন্তত লক্ষাধিক পর্যটক কক্সবাজারে অবস্থান করবেন। এতে পর্যটন খাতে ব্যবসার প্রসার ঘটবে এবং ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে ভালো রাজস্ব অর্জন করা সম্ভব হবে।
তিনি আরও বলেন, "ঈদের ছুটিতে অনেক হোটেল কর্তৃপক্ষ বিশেষ প্যাকেজ ও ছাড়ের ঘোষণা দিয়ে পর্যটকদের আকৃষ্ট করছেন।"
হোটেল কক্স-টুডের ফ্রন্ট ডেস্ক ম্যানেজার দুলা বলেন, "ঈদকে সামনে রেখে হোটেলের বুকিং ভালো চলছে। ১৯ তারিখ থেকে পর্যটকদের আগমন শুরু হবে, যা ২৩ থেকে ২৪ তারিখ পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে।"
রামাদা হোটেলের ফ্রন্ট ডেস্ক ম্যানেজার শাহাদাত হোসেন বলেন, "ঈদ উপলক্ষে পর্যটকদের পূর্ণাঙ্গ আনন্দ দিতে বিশেষ আয়োজন রাখা হয়েছে। ঈদের দ্বিতীয় দিন (২২ মার্চ) একটি ডিজে প্রোগ্রামের আয়োজন করা হয়েছে, যেখানে দেশের জনপ্রিয় একজন ডিজে শিল্পী পারফর্ম করবেন। পাশাপাশি থাকবে স্যাক্সোফোন পরিবেশনা।"
তিনি জানান, বিনোদনের পাশাপাশি খাবারের দিকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ উপলক্ষে গালা বুফে ডিনারের আয়োজন করা হয়েছে, যেখানে দেশি-বিদেশি নানা স্বাদের খাবার পরিবেশন করা হবে। পরিবার-পরিজন নিয়ে অতিথিরা স্বাচ্ছন্দ্যে ঈদ উদযাপন করতে পারবেন।
এদিকে পর্যটকদের নিরাপত্তা ও সেবার মান নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসন, ট্যুরিস্ট পুলিশসহ সংশ্লিষ্টরা ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে।
ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার জোনের পরিদর্শক পারভেজ আহমেদ বলেন, "পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তিন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ইউনিফর্ম পরিহিত পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকে নজরদারি ও গোয়েন্দা টিম মাঠে কাজ করছে। প্রতিটি টিম পালাক্রমে ২৪ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করছে।"
তিনি জানান, ঈদ উপলক্ষে লক্ষাধিক পর্যটকের আগমনের সম্ভাবনা রয়েছে। সেই বিষয়টি মাথায় রেখে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে, যাতে কোনো পর্যটক অপ্রীতিকর ঘটনার সম্মুখীন না হন।
কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতে উপচে পড়া ভিড়ের আশা
দেশের একমাত্র সৈকত হিসেবে কুয়াকাটা থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত—দুটোই উপভোগ করা যায়। পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় অবস্থিত এই সৈকতে সূর্যের নানা রূপ দেখতে প্রতিদিনই পর্যটকেরা ভিড় করেন।
কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এম এ মোতালেব শরীফ বলেন, "নির্বাচনের আগে ও রমজানে পর্যটক কম থাকলেও বর্তমানে পরিস্থিতি স্থিতিশীল হওয়ায় ঈদে পর্যটকের চাপ বাড়বে। এবার আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি পর্যটক আসবে বলে আশা করছি।"
তিনি বলেন, "সাত থেকে আট দিনের ছুটিতে কুয়াকাটায় উপচে পড়া ভিড় হতে পারে। ইতোমধ্যে ভালো মানের হোটেলগুলোতে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ অগ্রিম বুকিং হয়েছে। তবে ঈদের সময় হঠাৎ করেই সব হোটেল পূর্ণ হয়ে যায়।"
তার তথ্যমতে, কুয়াকাটায় প্রায় ২০০ থেকে ২৫০টি হোটেল-মোটেল রয়েছে, যেখানে প্রতিদিন ৪০ থেকে ৫০ হাজার পর্যটক থাকার সক্ষমতা আছে।
বান্দরবান রেসিডেন্সিয়াল হোটেল ও রিসোর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম বলেন, "ঈদকে সামনে রেখে আমরা ভালো সাড়া পাচ্ছি। ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশ অগ্রিম বুকিং হয়ে গেছে। সামনে আরও কয়েকদিন সময় আছে, এতে বুকিং আরও বাড়বে বলে আশা করছি।"
তিনি বলেন, "বান্দরবানে হোটেল ও রিসোর্ট মিলিয়ে প্রায় ৮০টির মতো প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে একসঙ্গে প্রায় পাঁচ হাজার পর্যটকের থাকার ব্যবস্থা আছে।"
ঈদে পর্যটকের সংখ্যা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "ঈদের ছুটিতে সাধারণত বান্দরবানে পর্যটকের চাপ বেশি থাকে। এবছরও ছুটির দিনগুলোতে পর্যটকে ভরপুর থাকবে বলে আশা করছি।"
পর্যটন স্পট সম্পর্কে তিনি বলেন, "মেঘলা, নীলাচল, নীলগিরি, স্বর্ণমন্দির, চিম্বুক, বগালেক, রুমা ও থানচি—এসব জায়গায় পর্যটকের ভিড় বেশি থাকবে।"
নিরাপত্তা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "বর্তমানে কোনো ধরনের নিষেধাজ্ঞা নেই। পর্যটকরা নির্বিঘ্নে ভ্রমণ করতে পারবেন।"
ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) সভাপতি মোহাম্মদ রফিউজ্জামান বলেন, "এবার অভ্যন্তরীণ পর্যটনে সাড়া দেখা যাচ্ছে। তবে বিদেশ ভ্রমণের প্রবণতা কম। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ফ্লাইট শিডিউলে অনিশ্চয়তা থাকায় বিদেশি পর্যটক বাংলাদেশে আসছেন না, দেশের মানুষও কম যাচ্ছেন বিদেশে।"
তিনি বলেন, "এবার মূলত অভ্যন্তরীণ পর্যটকরাই বেশি ভ্রমণ করছেন। কক্সবাজার, কুয়াকাটা, সিলেটসহ অন্যান্য জনপ্রিয় স্পটে পর্যটকের উপস্থিতি বাড়বে।"
মোহাম্মদ রফিউজ্জামান বলেন, "ঈদের ছুটিতে সাধারণত দেশের বিভিন্ন পর্যটন স্পটে প্রায় ৫০ লাখ পর্যটক যাতায়াত করে। এবছরও অভ্যন্তরীণ পর্যটন সক্রিয় থাকবে বলে আশা করা যাচ্ছে।"
পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কক্সবাজারসহ বিভিন্ন পর্যটন এলাকায় তিন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ট্যুরিস্ট পুলিশ জানিয়েছে, ইউনিফর্মধারী সদস্যদের পাশাপাশি সাদা পোশাক ও গোয়েন্দা টিম ২৪ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করবে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, অনেকে আগাম বুকিং করলেও বিপুলসংখ্যক পর্যটক সরাসরি গিয়েও হোটেল নেয়। ফলে ঈদের ছুটিতে প্রায় সব আবাসিক হোটেলই কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়।
সব মিলিয়ে দীর্ঘ ছুটি, স্থিতিশীল পরিস্থিতি এবং আগাম বুকিংয়ের প্রবণতায় এবারের ঈদে দেশের পর্যটন খাতে বড় ধরনের উচ্ছ্বাস ও অর্থনৈতিক গতি ফিরবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
