মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতে তেল সরবরাহ বিঘ্ন হওয়ার আশঙ্কা: ফিলিং স্টেশনগুলোতে উপচে পড়া ভিড়
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহে সম্ভাব্য বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কায় রাজধানীর পাশাপাশি ঢাকার সাভারের ফিলিং স্টেশনগুলোতেও গ্রাহকদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে।
এছাড়াও পাম্পগুলোতে যানবাহন অনুযায়ী তেল সরবরাহের সর্বোচ্চ পরিমাণ নির্ধারণ করে দেওয়ায় চাহিদা অনুযায়ী তেল নিতে না পেরে পাম্পে পাম্পে ঘুরছেন গ্রাহকরা।
অন্যদিকে পাম্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত ৩ দিনে স্বাভাবিকের তুলনায় গ্রাহকদের মধ্যে জ্বালানি তেলের চাহিদা কয়েকগুণ বেড়েছে। গতকাল থেকে এই চাপ মাত্রা ছাড়িয়েছে বলেও দাবি করেন তারা।
তারা বলছেন, যেসব গ্রাহক আগে ৫০০ টাকার জ্বালানি নিতো, তারা এখন ২ থেকে ৩ গুণ বেশি পরিমাণ তেল দাবি করছে। কেউবা চাচ্ছেন সম্পূর্ণ ট্যাংক ফুল করতে।
এছাড়াও গত ৩ দিনে ডিপোগুলো থেকেও চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি সরবরাহ করা হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন একাধিক পাম্প সংশ্লিষ্টরা।
সকাল থেকে সাভারের পৌর এলাকায় অবস্থিত এস.আই চৌধুরী ফিলিং স্টেশন, আফজাল ফিলিং স্টেশন, সাহারা ফিলিং স্টেশনসহ বিভিন্ন পাম্পগুলোতে ঘুরে দেখা যায়, প্রতিটি পাম্পেই যানবাহনের দীর্ঘ সারি। পর্যাপ্ত মজুদ না থাকায় এবং সরবরাহ সংকটের কারণে পাম্পগুলোতে যানবাহন অনুযায়ী জ্বালানি সরবরাহ সীমিত করে দেওয়া হয়েছে।
আফজাল ফিলিং স্টেশনের ব্যবস্থাপক মো. শাহীন আলম দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, 'ডিপো থেকে আমরা সর্বশেষ তেল পেয়েছি গত বুধবার। গতকাল তেল পাইনি। বুধবার চার দশমিক পাঁচ হাজার লিটার অকটেন এবং ১৩ দশমিক পাঁচ হাজার লিটার ডিজেল সরবরাহ পেয়েছি। ইতোমধ্যে এই মজুদও ফুরিয়ে এসেছে। সর্বোচ্চ বিকাল পর্যন্ত তেল সরবরাহ করা যেতে পারে, যা স্টকে আছে। রোববারের আগে সরবরাহ পাওয়ার আর কোনো সম্ভাবনা নেই। সেদিনও সরবরাহ পাবো কিনা, সেটিও নিশ্চিত না।'
তিনি জানান, অনেকে আতঙ্কিত হয়ে প্রয়োজনের তুলনায় কয়েকগুণ পর্যন্ত বেশি তেল সংগ্রহের চেষ্টা করছেন। যার একশ টাকার তেল প্রয়োজন, তিনি ট্যাংক ফুল করার চেষ্টা করছেন। যার কারণে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে এবং অধিকসংখ্যক মানুষকে তেল দেওয়ার জন্য আমরা গ্রাহক পর্যায়ে তেল সরবরাহের সীমা আরোপ করে দিয়েছি। এক্ষেত্রে একটি মোটরসাইকেলে সর্বোচ্চ ৫০০ টাকার, প্রাইভেট কারে সর্বোচ্চ এক হাজার এবং লং রোডের গাড়িতে ১৫০০ টাকার তেল সরবরাহ করা হচ্ছে।
এছাড়া দূরপাল্লার ক্ষেত্রে যানবাহনগুলোকেও বিবেচনায় নিয়ে সেভাবে জ্বালানি সরবরাহ করা হচ্ছে।
তিনি জানান, পাম্পটিতে স্বাভাবিক সময়ে দৈনিক চাহিদা অকটেন দুই হাজার লিটার এবং ডিজেল পাঁচ হাজার লিটার। পাম্পটি মেঘনা ডিপো থেকে তেল সংগ্রহ করে।
অন্যদিকে রেডিও কলোনি এলাকায় অবস্থিত সাহারা ফিলিং স্টেশনের ক্যাশিয়ার নুর ইসলাম টিবিএসকে জানান, সর্বশেষ গতকাল পাম্পটি ডিপো থেকে ১৩ হাজার লিটার অকটেন পেয়েছে, কিন্তু কোনো ডিজেল পায়নি।
আগামী রোববারও ডিপো থেকে চাহিদা অনুযায়ী তেলের সরবরাহ পাবেন কিনা, সেটিও অনিশ্চিত বলে জানান তিনি। এই পাম্পটিও গ্রাহকদের তেল সরবরাহের ক্ষেত্রে সীমা আরোপ করে দিয়েছে।
একই রকম পরিস্থিতির কথা বলেন এস.আই চৌধুরী ফিলিং স্টেশন সংশ্লিষ্টরাও।
সাহারা ফিলিং স্টেশনে তেলের জন্য লাইনে অপেক্ষমাণ রুহুল আহমেদ নামে একজন তরুণ। তিনি টিবিএসকে বলেন, সকালে একটি পাম্প থেকে মাত্র ১০০ টাকার তেল পেয়েছেন তিনি। এরপর আরেকটি পাম্প থেকে ৫০০ টাকার তেল পেয়েছেন দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে। সর্বশেষ এই পাম্পটিতে এসেছেন আরও কিছু তেল সংগ্রহের জন্য।
এভাবে বারবার কেন পাম্প থেকে পাম্পে ঘুরে তেল সংগ্রহ করছেন—এমন প্রশ্নে এই যুবক বলেন, "যুদ্ধের যেই পরিস্থিতি, সামনে কী হয় তা তো বলা যায় না। যার কারণে একেবারে ঈদ পর্যন্ত যেন সমস্যায় পড়তে না হয়, সেই জন্য এভাবে তেল সংগ্রহ করছেন তিনি।"
এসময় নাইমুল ইসলাম নামে আরেক মোটরসাইকেল চালক, যিনি মূলত মোটরসাইকেলে রাইড শেয়ার করেন, টিবিএসকে বলেন, আমার নিয়মিত তেল প্রয়োজন। তেল না হলে আমি রাইড শেয়ার করতে পারবো না। এমনটা হলে তো আমার উপার্জনের পথ বন্ধ হয়ে যাবে।
এসআই চৌধুরী ফিলিং স্টেশনের তেলের জন্য অপেক্ষমাণ আফজাল হোসেন নামে আরেকজন মোটরসাইকেল চালক বলেন, আমি সাধারণত ২০০ টাকার তেল নেই। কিন্তু যুদ্ধের যেই পরিস্থিতি, সামনে তেল পাবো কিনা, কিংবা পেলেও দাম যদি অনেক বেড়ে যায়—যার কারণে চেষ্টা করছি ট্যাংক ফুল করার, যেন কয়েকদিন অন্তত চলা যায়।
যোগাযোগ করলে সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সাইফুল ইসলাম টিবিএসকে বলেন, 'আমরা ইতোমধ্যে পুরো বিষয়টিকে ক্লোজলি মনিটরিং করছি। কেউ যেন কোনোভাবে কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে না পারে, সে বিষয়েও নজর রাখা হচ্ছে। পাশাপাশি গ্রাহকদের প্রতি আহ্বান থাকবে আতঙ্কিত হয়ে প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল সংগ্রহ থেকে বিরত থাকতে।'
তিনি আরও বলেন, 'চিত্রগুলো যেভাবে দেখা যাচ্ছে, বাস্তবতা এখনও সেই পর্যায়ে যায়নি। যেই ধরনের সংকটের কথা বলা হচ্ছে, যতদূর আমরা জানি সেভাবে সংকট এখনো তৈরি হয়নি—আন্তর্জাতিকভাবেও না, দেশেও না। সরকার শুধু নির্দেশনা দিয়েছে আমাদের ব্যবহারে মিতব্যয়ী হওয়ার জন্য। কাজেই আমি গ্রাহকদের প্রতি আহ্বান জানাবো আতঙ্কিত না হতে।'
