অস্থিতিশীলতার মধ্যে দরপত্রে সাড়া না পাওয়ায় বেশি দামে স্পট এলএনজি কিনছে বাংলাদেশ
প্রথম দফার দরপত্রে কোনো সাড়া না পাওয়ার পর বিশ্ববাজারের চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দেশের গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি সহনীয় রাখতে অস্থিতিশীল স্পট মার্কেট থেকে বেশি মূল্যে দুই কার্গো তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কিনেছে বাংলাদেশ।
দুই দিনের মরিয়া চেষ্টার পর বুধবার দুই কার্গো এলএনজি সংগ্রহ করতে পেরেছে রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলা। এর মধ্যে এক কার্গোর দাম পড়েছে প্রতি এমএমবিটিইউ ২৮ ডলারের বেশি, অন্যটির দর ২৪ ডলার। গত ১ মার্চ যে গ্যাসের দাম ছিল ১০ ডলারের নিচে, মাত্র চার দিনের ব্যবধানে তা প্রায় আড়াই গুণ বেড়ে গেছে।
জ্বালানি সচিব মো. সাইফুল ইসলাম জানান, কাতারের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার জেরে বিশ্ব এলএনজি বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
টিবিএসকে তিনি বলেন, 'চড়া দামেই স্পট এলএনজি কিনছি আমরা। চার দিন আগের তুলনায় এখন দাম প্রায় আড়াই গুণ বেশি।'
মধ্যপ্রাচ্যে বাড়তে থাকা সংঘাত ও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটায় কাতার থেকে নিয়মিত গ্যাস আসা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির ভিত্তিতে কাতার থেকেই সবচেয়ে বেশি এলএনজি পায় বাংলাদেশ। কিন্তু সেই জোগান অনিশ্চিত হয়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়েই স্পট মার্কেটে ঝুঁকতে হয়েছে পেট্রোবাংলাকে।
কর্মকর্তারা বলেন, স্পট মার্কেট থেকে দুটি কার্গো কেনার জন্য মঙ্গলবার টেন্ডার ডাকা হলেও তাতে কোনো প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়নি। বাজারের অস্থিতিশীলতার জেরে পিছু হটেন ব্যবসায়ীরা। বুধবার ফের নতুন করে দরপত্র আহ্বান করলে তাতে সাড়া দেয় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক সংস্থা ভাইটাল এশিয়া ও গানভোর। আগামী ১৫ ও ১৮ মার্চের মধ্যে ওই দুটি কার্গো বাংলাদেশে পৌঁছনোর কথা রয়েছে।
ইরানের হামলায় কাতারের জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উৎপাদন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কাতারএনার্জি। এ পরিস্থিতিতে তারা বেশ কয়েকটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে 'ফোর্স মেজোর' ধারা কার্যকর করেছে। এই ধারার সুবাদে বিশেষ পরিস্থিতিতে কোনো প্রতিষ্ঠান আইনি দায়বদ্ধতা ছাড়াই পণ্য সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে পারে।
বিশ্বের মোট এলএনজি চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশই মেটায় কাতার। ফলে দেশটির সরবরাহ ব্যাহত হতেই বিশ্ববাজারে গ্যাসের দাম বাড়তে শুরু করেছে হু হু করে।
পেট্রোবাংলা নিশ্চিত করেছে, ২ মার্চ কাতারএনার্জি আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশকে 'ফোর্স মেজোর' কার্যকরের কথা জানায়।
এর জবাবে এপ্রিলে আসার কথা রয়েছে, এমন দুটি কার্গোর বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা চেয়ে কাতারকে চিঠি পাঠিয়েছে পেট্রোবাংলা। তবে কাতারএনার্জির তরফে এখনও কোনো উত্তর মেলেনি বলে জানান কর্মকর্তারা।
জ্বালানি সচিব বলেন, 'এপ্রিলের কার্গোগুলোর বিষয়ে অবস্থান স্পষ্ট করতে আমরা কাতারএনার্জিকে চিঠি লিখেছি। তবে এখনও কোনো জবাব আসেনি।'
এ বছর বাংলাদেশের মোট ১১৫টি এলএনজি কার্গো আমদানির পরিকল্পনা ছিল, যার মধ্যে একাই ৪০টি পাঠানোর কথা ছিল কাতারএনার্জির। এ কারণে এ বিষয়ে উদ্বেগ বেশি।
কাতারএনার্জি ট্রেডিং এলএলসি, ওকিউ ট্রেডিং লিমিটেড ও এক্সেলারেট গ্যাস মার্কেটিং লিমিটেডের মতো অন্য দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহকারীরাও বিপাকে পড়তে পারে। কারণ, তাদের এলএনজি সংগ্রহের মূল উৎসও আদতে কাতার।
এশিয়ায় এলএনজি কেনার হিড়িক
জ্বালানি বিশ্লেষকরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিরতা এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে এলএনজি প্রতিযোগিতা লড়াই উসকে দিয়েছে। বিকল্প উৎসের সন্ধানে বিভিন্ন দেশ মরিয়া হয়ে ওঠায় স্পট মার্কেটের দাম আকাশ ছুঁয়েছে। ফলে বাংলাদেশের মতো ছোট অর্থনীতির দেশগুলোর পক্ষে এই চড়া দরে জ্বালানি কেনা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে।
জ্বালানির এই সংকট কেবল এলএনজিতেই সীমাবদ্ধ নেই।
অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) নিয়েও। কারণ, বিশ্ববাজারে এলপিজির একটি বড় অংশ উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে হরমুজ প্রণালির দিয়ে পরিবাহিত হয়। এই সংকীর্ণ জলপথটি বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম 'এনার্জি চোকপয়েন্ট' হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্বের মোট তেল ও এলএনজি পরিবহনের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ এই প্রণালির মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়। ফলে সেখানে সামান্যতম ব্যাঘাতও বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যকে ব্যাহত করতে পারে।
সম্ভাব্য ঘাটতি মোকাবিলায় গতকাল এলপিজি আমদানিকারকদের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে আমদানির পরিমাণ বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
তবে আমদানিকারকরা বলছেন, পরিস্থিতি ক্রমেই চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠছে।
জেএমআই এলপিজির মালিক জেএমআই গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবদুর রাজ্জাক টিবিএসকে বলেন, যুদ্ধ এলপিজি আমদানিকে অত্যন্ত জটিল করে তুলেছে।
'মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এলপিজি আমদানিকে ভীষণ কঠিন করে তুলেছে। জাহাজভাড়া বাড়ছে, শিপিং রুট নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে, ব্যবসায়ীরাও সতর্ক হয়ে উঠেছেন,' বলেন তিনি।
জ্বালানির মজুতও কমছে
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, ৪ মার্চ পর্যন্ত দেশে ডিজেলের মজুত কমে ১ লাখ ১৫ হাজার ৪৭৩ টনে নেমে এসেছে, যা প্রায় নয় দিনের চাহিদা মেটাতে পারবে। এর দুই দিন আগে ডিজেলের মজুত ছিল ১ লাখ ৩৪ হাজার ৬২ টন।
অকটেনের মজুতও ৩৩ হাজার ৬৪০ টন থেকে কমে ২৮ হাজার ১৫২ টনে দাঁড়িয়েছে, যা দিয়ে প্রায় ১৫ দিনের চাহিদা মেটানো যাবে।
এদিকে বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ফার্নেস অয়েলের মজুতও ৭৬ হাজার ১৫৬ টন থেকে কমে ৬৬ হাজার ১৯২ টনে দাঁড়িয়েছে, যা দিয়ে ৬০ দিনের চাহিদা মেটানো যাবে।
