চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী ‘চাক সেমাই’: স্বাদে-ঐতিহ্যে অনন্য
রমজান এলেই খাবারের পসরা বদলে যায়। ইফতার ও ঈদকে ঘিরে ঘরে ঘরে বাড়ে সেমাইয়ের কদর। আর এই সময়টাতেই চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী 'ফকির কবীর চাক সেমাই'-এর চাহিদা বেড়ে যায় প্রায় সাতগুণ। প্রায় ৯০ বছর ধরে চট্টগ্রামে এই চাক সেমাইয়ের সুনাম রয়েছে।
চিরায়ত বাংলার খাবার না হলেও উপমহাদেশের মুসলিম সমাজে সেমাই ঈদ-আনন্দের অন্যতম অনুষঙ্গ। পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশে ঈদুল ফিতর যেন সেমাই ছাড়া অপূর্ণ।
ভাষাবিজ্ঞানী সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় 'সেমাই' শব্দের ব্যুৎপত্তি নির্দেশ করতে গিয়ে গ্রিক শব্দ Semidalis-এর উল্লেখ করেছেন। আফগানিস্তানে এটি 'সেমিয়া', পাকিস্তানে 'সেঁওয়াই' নামে পরিচিত। ধারণা করা হয়, বহির্বিশ্ব থেকেই একসময় এ অঞ্চলে সেমাইয়ের আগমন; পরে তা বাঙালি মুসলিম সমাজের খাদ্য-ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়।
নগরীর বহদ্দারহাট–চকবাজার সড়কের কাপাসগোলা স্কুলের পাশে অবস্থিত ফকির কবীর বেকারি। ১৯৩৬ সালে সুফি ঘরানার মানুষ কবীর আহম্মেদের হাত ধরে যাত্রা শুরু হয় প্রতিষ্ঠানটির। স্থানীয়দের কাছে এটি 'বাংলা সেমাই' নামেও পরিচিত। প্রতিষ্ঠাতার আধ্যাত্মিক সংশ্লিষ্টতার কারণে তিনি 'ফকির কবীর' নামেই অধিক পরিচিতি পান।
প্রায় নয় দশক ধরে নগরীর চকবাজার এলাকায় তৈরি হওয়া এই সেমাই স্বাদ ও গুণমানে আলাদা পরিচয় ধরে রেখেছে।
বর্তমান স্বত্বাধিকারী আবু আহম্মেদ বলেন, "আমার বাবা ভাড়া দোকানে ব্যবসা শুরু করেছিলেন। ১৯৪৭ সালে জায়গা কিনে নেন। তখন থেকেই এই চাক সেমাইয়ের সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। এখন অনেক প্রতিষ্ঠান মেশিনে সেমাই তৈরি করলেও আমরা এখনো পুরোনো পদ্ধতিতেই গুণমান বজায় রেখে তৈরি করছি।"
বেকারির এক কর্মচারী জানান, "সারা বছর সপ্তাহে প্রায় ১০০ কেজি সেমাই উৎপাদন হয়। কিন্তু রমজানে প্রতিদিনই ১০০ থেকে ১৫০ কেজি পর্যন্ত তৈরি করতে হয়। অনেক ব্যবসায়ী এসে পাইকারি কিনে নিয়ে যান। অনেকে আত্মীয়স্বজনের জন্য বিদেশেও পাঠান।"
রমজান মাসে শুধু নিজস্ব দোকানেই নয়, নগরীর বিভিন্ন দোকানেও সরবরাহ করা হয় এই সেমাই। চট্টগ্রাম ছাড়িয়ে দেশের বিভিন্ন জেলা এবং বিদেশেও রয়েছে এর কদর।
আধুনিক যুগে বিভিন্ন কোম্পানি অত্যাধুনিক যন্ত্রে বাংলা, লাচ্ছা কিংবা বোম্বাইয়া সেমাই তৈরি করলেও ফকির কবীরের চাক সেমাই এখনো তৈরি হয় বিশেষ ঐতিহ্যবাহী প্রক্রিয়ায়। বড় কড়াইয়ে গরম পানির সঙ্গে ময়দা মিশিয়ে খামির তৈরি করা হয়। পরে তা বিশেষ যন্ত্রে ঢেলে চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে সূক্ষ্ম সেমাই আকারে বের করা হয়। এরপর চাক আকৃতিতে ডালায় সাজিয়ে রোদে শুকানো হয় এবং তন্দুরে হালকা আগুনে সেঁকে লালচে রং আনা হয়। এই প্রক্রিয়াই সেমাইয়ে আনে ভিন্ন স্বাদ ও সুবাস।
বর্তমানে প্যাকেটজাত সেমাইয়ের চাহিদা বাড়লেও খোলা সেমাইয়ের একটি বিশেষ ক্রেতাশ্রেণি রয়েছে। ফকির কবীরের চাক সেমাই খোলা বিক্রি হয় প্রতি কেজি ২৫০ টাকায়। গুণগত মান অক্ষুণ্ণ রাখাই তাদের মূল লক্ষ্য বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী বলেন, "এটি শুধু ব্যবসা নয়, আমাদের আবেগের জায়গা। মানুষের ভালোবাসাই আমাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।"
ঐতিহ্য, স্বাদ ও বিশ্বাস—এই তিনের সমন্বয়ে 'ফকির কবীর চাক সেমাই' আজও চট্টগ্রামের রমজান সংস্কৃতির এক অনন্য অংশ হয়ে আছে।
