ধারণক্ষমতার পাঁচ গুণ রোগী: ঢাকা মেডিকেলে শিশুদের ঠাঁই হয় মেঝেতে
গায়ে মাখার অ্যালার্জির ওষুধ ভুলে খেয়ে ফেলে তিন বছরের শিশু জুরাইজ সাদমান। প্রথমে কল্যাণপুরের ইবনে সিনা হাসপাতালে দ্রুত নেওয়া হয় তাকে। কিন্তু বিষক্রিয়ার ঘটনা হওয়ায় এবং বিষয়টিকে 'পুলিশ কেস' হিসেবে গণ্য করে কোনো চিকিৎসা ছাড়াই সরকারি হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয় বেসরকারি ওই হাসপাতালটি।
সেখান থেকে সাদমানকে নেওয়া হয় ঢাকা শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে। কিন্তু পাকস্থলী পরিষ্কার বা 'ওয়াশ' (গ্যাস্ট্রিক ল্যাভেজ) করার ব্যবস্থা নেই বলে তাকে ফেরত পাঠায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
নিরুপায় হয়ে স্বজনরা তাকে নিয়ে ছোটেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে। জরুরি বিভাগে তার পাকস্থলী পরিষ্কার করার পর ভর্তি করা হয় শিশু ওয়ার্ডে। দুই দিন ধরে ওয়ার্ডের মেঝের ওপর শুয়েই চিকিৎসা নিয়েছে শিশুটি।
সাদমানের মতো বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত অনেক রোগীকে বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি নেওয়া হয় না, কারণ এগুলোকে 'পুলিশ কেস' হিসেবে ধরা হয়। তাদের শেষ ভরসা ঢাকা মেডিকেল, কারণ এখান থেকে কোনো রোগী ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। তবে সবাইকে চিকিৎসা দিলেও শয্যার তীব্র সংকটে রোগী ও স্বজনদের পোহাতে হয় চরম ভোগান্তি। শয্যার তুলনায় চার থেকে পাঁচ গুণ রোগী থাকায় বেশিরভাগই মেঝেতে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হয়। অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে শিশুদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের সংক্রমণের ঝুঁকিও বাড়ছে।
গত বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) শিশু মেডিসিন ওয়ার্ডের ১০৮ নম্বর কক্ষ ঘুরে দেখা যায়, ৮ নম্বর শয্যায় গাদাগাদি করে শুয়ে আছে তিনটি শিশু। তাদের বয়স ছয় মাস, দুই মাস ও এক বছর। দুই জনের হাতে লাগানো স্যালাইন ড্রিপ, একজনের শরীরে ক্যানুলা। প্রায় সব শয্যাতেই দুই-তিনজন করে শিশু।
শয্যার সামনের মেঝেতে বিছানো চাদরের ওপর পাশাপাশি শুয়ে আছে আরও চার শিশু। কারো শরীরে স্যালাইন চলছে, কেউবা মায়ের কোলে শুয়েই স্যালাইন নিচ্ছে। নার্সরা ইনজেকশন দিচ্ছেন, চিকিৎসকরা রিপোর্ট দেখছেন, আর স্বজনরা নথিপত্র নিয়ে নার্স ও চিকিৎসকদের পেছনে ছুটছেন।
১৯ শয্যার এই ওয়ার্ডে সোমবার সকালে ভর্তি ছিল ১০১ জন রোগী। একই চিত্র দেখা গেছে অন্য দুটি শিশু মেডিসিন ওয়ার্ডেও। শিশু ক্যানসার ও শিশু সার্জারি ওয়ার্ডেও সক্ষমতার চেয়ে তিন-চার গুণ বেশি রোগী ভর্তি ছিল।
ওয়ার্ডের দায়িত্বরত নার্স ও চিকিৎসকরা জানান, বর্তমানে নিউমোনিয়া বেড়ে যাওয়ায় সব ওয়ার্ডেই রোগীর চাপ কয়েক গুণ বেড়েছে।
কেরানীগঞ্জের ছয় মাসের শিশু সাফায়েত মুখ দিয়ে রক্তক্ষরণ হওয়ায় ২১০ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি হয়েছে চার দিন আগে। সেই থেকে মেঝের ওপর শুয়েই তার চিকিৎসা চলছে। ১৪ শয্যার এই ওয়ার্ডে বুধবার রোগী ভর্তি ছিল ৬২ জন। একই অবস্থা জামালপুর থেকে আসা নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত দুই মাসের শিশু সাদিয়ার। মায়ের কোলে মেঝের ওপর শুয়েই চিকিৎসা চলছে তার।
মাথার সংক্রমণে ভোগা নীলফামারীর সৈয়দপুরের ছয় মাসের শিশু সাদিকা ১৫ দিন ধরে আছে ২০৭ নম্বর ওয়ার্ডে। উচ্চ জ্বরের কারণে ব্রেইন ইনফেকশন হওয়ায় প্রথমে তাকে রংপুর মেডিকেলে নেওয়া হয়েছিল, সেখান থেকে রেফার করা হয়েছে ঢাকা মেডিকেলে। ১৪ শয্যার এই ওয়ার্ডে সাদিকার মতো প্রায় ৭০ জন রোগী ভর্তি। সে একটি শয্যার অর্ধেক জায়গা পেয়েছে, আর তার মাথার কাছে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকেন বাবা বা মা।
২০৮ নম্বর ওয়ার্ডের ইনচার্জ সিনিয়র স্টাফ নার্স আশরাফুন্নেসা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, 'সকালের শিফটে আমাদের আটজন নার্স থাকলেও রোগী ১০১ জন। প্রতিটি বেডে দুই-তিনজন করে রোগী। মেঝেতেও রোগী আছে। কারো অবস্থা খারাপ হলে আমরা অন্য কাউকে সরিয়ে তাকে শয্যায় নিয়ে সাকশন দিই। অবস্থা ভালো হলে আবার মেঝেতে পাঠানো হয়। আমাদের পর্যাপ্ত অক্সিজেন ও সাকশন মেশিন আছে, কিন্তু ভিড়ের কারণে বেশিরভাগই মেঝেতে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হয়।'
ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিশু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. লুৎফুন নেসা বলেন, শয্যা সংকটের মধ্যেও শিশুদের প্রয়োজনীয় সব চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, 'যখন এই হাসপাতাল তৈরি হয়েছিল তখন শয্যা সংখ্যা নির্দিষ্ট ছিল এবং তা এখনও অপরিবর্তিত। কিন্তু জনসংখ্যা বেড়েছে কয়েক গুণ। শয্যা সংখ্যা বাড়ানো ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।'
ঢামেক হাসপাতালের শিশু বহির্বিভাগের আবাসিক চিকিৎসক ডা. শাহেদুর রহমান বলেন, আউটডোরে প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৫০০ রোগী দেখা হয়, কখনো তা আরও বেশি হয়। তিনি বলেন, 'এই মাসে একদিন ৭০০ রোগী এসেছিল। সম্প্রতি হঠাৎ নিউমোনিয়া বেড়ে গেছে। বেশিরভাগ রোগীকে প্রয়োজনীয় ওষুধ দিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কেবল যাদের ইনজেকশন প্রয়োজন, তাদেরই ভর্তি করা হচ্ছে।'
তিনি আরও জানান, প্রতিদিন বহির্বিভাগ থেকে ৩৫-৪০ জন রোগী ভর্তি করা হয়। শিশু ওয়ার্ডে ৬০টি শয্যা বরাদ্দ থাকলেও ২৫০ জনের বেশি রোগী ভর্তি থাকে। ডা. শাহেদুর বলেন, 'মেঝেতে ভর্তির কারণে সংক্রমণ ছড়ায়। রোগী আসে এক রোগ সারাতে, গিয়ে আক্রান্ত হয় অন্য রোগে। তাই অতি সংকটাপন্ন রোগী ছাড়া আমরা ভর্তি করছি না।
তিনি আরও বলেন, 'শিশু রোগী বাড়ছে, কিন্তু হাসপাতালগুলোতে শয্যা বাড়ছে না। শিশুদের জন্য বাজেট বাড়াতে হবে, শয্যা বাড়াতে হবে, পাশাপাশি জনবল বাড়াতে হবে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ঢাকা মেডিকেলের কোনো বিকল্প নেই, তাই এর অবকাঠামো ও জনবল বাড়াতেই হবে।'
চিকিৎসকরা জানান, বহির্বিভাগে পাঁচজন চিকিৎসককে প্রতিদিন ৪০০-র বেশি রোগী দেখতে হয়। প্রতি চিকিৎসক ছয় ঘণ্টায় ১০০-র বেশি রোগী দেখেন, যার ফলে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এছাড়া, ঢাকা মেডিকেলের শিশু এনআইসিইউতে শয্যা আছে ৪০টা। প্রতিদিন তিন থেকে চারটা শয্যা খালি হয় কিন্তু অপেক্ষমাণ তালিকায় থাকে অন্তত ২০০ শিশু।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, শুধু শিশু বিভাগ নয়, সব বিভাগেই চাপ অনেক। বর্তমানে ২,৬০০ শয্যার এই হাসপাতালে প্রতিদিন ৪,০০০-এর বেশি ইনডোর রোগী থাকে। অতিরিক্ত রোগীরা মেঝে, বারান্দা এমনকি সিঁড়িতেও চিকিৎসা নিচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, আগের সরকারের ৫,০০০ শয্যার মেগা প্রজেক্ট বাতিল হওয়ার পর অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামলাতে ৪,০০০ শয্যার একটি সম্প্রসারণ প্রকল্পের নতুন প্রস্তাব জমা দেওয়া হয়েছে। তবে তিনি মনে করেন, 'শুধু ভবন বাড়ালেই হবে না। ঢাকা মেডিকেলের ওপর যে চাপ, তা কমানোর পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যান্য হাসপাতালের সক্ষমতাও বাড়াতে হবে যাতে ছোটখাটো সমস্যার জন্য রোগীদের ঢাকা মেডিকেলে রেফার করা না হয়।'
