মেয়াদ শেষেও চেয়ার ছাড়তে নারাজ চসিক মেয়র, আইনি বিতর্ক
স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন অনুযায়ী চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) বর্তমান পর্ষদের পাঁচ বছরের মেয়াদ গত রবিবার (২২ ফেব্রুয়ারি) শেষ হলেও চেয়ার চাড়তে নারাজ মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।
ব্যক্তিগতভাবে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং মন্ত্রণালয়ের সচিবের সঙ্গে কথা বলে গ্রিন সিগন্যাল পেয়েছেন বলেও যুক্তি দিয়েছেন তিনি।
৫ আগস্টের পর আদালতের রায়ে মেয়রের আসনে বসা শাহাদাতের দাবি, তিনি ২০২৯ সাল পর্যন্ত স্বপদে থাকতে পারবেন। এমন অবস্থায় মেয়াদ শেষেও দায়িত্বে থাকা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন, ২০০৯ অনুযায়ী কোনো সিটি করপোরেশনের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার তারিখ থেকে পাঁচ বছর মেয়াদ গণনা করা হয়।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) বিদায়ী পর্ষদের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০২১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি। সে হিসেবে আইনত মেয়াদ পূর্ণ হয়েছে ২০২৬ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি। তবে মেয়াদ শেষের পরও দায়িত্বে বহাল থাকার ঘোষণা দিয়েছেন মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।
এতে প্রশাসন ও রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আইনি বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণ জনগণ থেকে শুরু করে নগরজুড়ে চসিকে প্রশাসক নিয়োগ নাকি নতুন নির্বাচন এই নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
গত রবিবার চট্টগ্রাম নগরীতে অনুষ্ঠান শেষে মেয়র শাহাদাত হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, 'রেজাউল করিম চৌধুরীর পুরো মেয়াদই অবৈধ ঘোষণা করেছেন আদালত। তাই যেদিন থেকে তিনি শপথ নিয়েছেন, সেদিন থেকে পাঁচ বছর মেয়াদ তার। আদালতের রায়ে আমাকে মেয়র ঘোষণা করা হয়েছে।'
তিনি বলেন, 'কোর্ট অর্ডার দিয়েছেন ২০২৯ সাল পর্যন্ত। অর্থাৎ ২০২৯ সালের ৩ নভেম্বরের আগে মেয়াদ শেষ হবে না। আর সরকার তাকে যে কূটনৈতিক পাসপোর্ট দিয়েছে, তার মেয়াদও পাঁচ বছরের, দেড় বছরের নয়।'
তাই পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন তিনি।
শাহাদাত হোসেন বলেন, '২০২৯ সালে মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগে প্রশাসক নিয়োগেরও কোনো সুযোগ নেই। কারণ প্রশাসক বদল হয়েই আমি মেয়রের দায়িত্ব নিয়েছি। কাজেই পরে আর প্রশাসক দেওয়ার সুযোগ নেই। এরপরও জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচন হোক আমি চাই।'
তিনি বলেন, 'জনগণের অংশগ্রহণে নির্বাচনি বৈতরনী পার হয়ে মেয়রের দায়িত্ব নেওয়ার মাধ্যমে আমি আমার জনপ্রিয়তা যাচাই করতে চাচ্ছি। আমার এই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দিয়েছে।'
তিনি আরও দাবি করেন, স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন ২০০৯–এর ৬ নম্বর ধারা অনুযায়ী পরবর্তী নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত তিনি এই পদে বহাল থাকতে পারবেন। এই বিষয়ে তিনি ব্যক্তিগতভাবে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং মন্ত্রণালয়ের সচিবের সঙ্গে কথা বলেছেন বলে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন।
মেয়রের ভাষ্য অনুযায়ী, মন্ত্রী তাকে আশ্বস্ত করেছেন যে নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত তার ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার আইনের ৬ নম্বর ধারা বা 'সেকশন সিক্স' প্রযোজ্য হবে।
তবে ২০১১ সালে এক সংশোধনীর মাধ্যমে আইনের ৬ ধারাটি বিলুপ্ত করা হয়েছে।
স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন ২০০৯–এর ৬ নম্বর ধারায় ২০১১ সালে সংশোধনী এনে বর্তমান মেয়রের স্বপদে থাকার সব পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ওই ধারায় শুধু একটি বাক্যই অবশিষ্ট আছে যেখানে বলা হয়েছে যে করপোরেশনের মেয়াদ হবে উহার প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হইবার তারিখ হইতে পাঁচ বছর।
প্রশাসকের বিষয়ে আইনের ৬০ ধারার ২৫ (১) উপ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো সিটি করপোরেশনের মেয়াদ শেষ হলে সরকার নতুন পর্ষদ গঠিত না হওয়া পর্যন্ত কার্যাবলী সম্পাদনের জন্য একজন উপযুক্ত ব্যক্তি বা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত কর্মকর্তাকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিতে পারবে।
অতীতে এই বিধানের প্রয়োগের নজির রয়েছে। করোনা মহামারির সময় ২০২০ সালে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) নির্বাচন স্থগিত হলে তৎকালীন মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের মেয়াদ শেষে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) ছাড়া দেশের ছয়টি সিটি করপোরেশনে সোমবার প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে সরকার। তবে চসিকের বিষয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।
যেভাবে মেয়র পদে শাহাদাত
২০২১ সালের ২৭ জানুয়ারির নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী এম রেজাউল করিম চৌধুরী বিজয়ী ঘোষিত হন। ফলাফল চ্যালেঞ্জ করে মামলা করেন বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী ডা. শাহাদাত হোসেন।
৫ আগস্টের পর আইনি প্রক্রিয়া শুরু করলে ২০২৪ সালের ১ অক্টোবর আদালত তাকে মেয়র ঘোষণা করেন। একই বছরের ৩ নভেম্বর তিনি শপথ গ্রহণ করেন এবং দায়িত্ব নেন।
এরমধ্যেই স্থানীয় সরকার বিভাগ নির্বাচন কমিশনকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে চিঠি দিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
আইনে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগের ১৮০ দিনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ফলে নির্বাচন কমিশনের ওপরও সময়চাপ তৈরি হয়েছে।
ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনসহ দেশের অন্যান্য সিটিতেও নির্বাচন ঘিরে আলোচনা চলছে।
