ব্যয় কমাতে ও প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য একাধিক মন্ত্রণালয়কে একীভূত করার পরিকল্পনা বিএনপির
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিএনপি। সরকার গঠনকে ঘিরে ইতোমধ্যেই দলীয় ও রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা ও প্রস্তুতি। এবারের মন্ত্রী পরিষদের আকার ছোট হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে এক মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আরেক মন্ত্রণালয়কে একীভূত করার পরিকল্পনা করছে বিএনপি।
এবারের মন্ত্রীসভায় দলের অভিজ্ঞ সিনিয়র নেতাদের পাশাপাশি গুরুত্ব পাচ্ছেন নতুন প্রজন্মের রাজনীতিকরাও। ফলে অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের সমন্বয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ মন্ত্রিসভা গঠনের ইঙ্গিত মিলছে।
দলীয় সূত্র বলছে, নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়ন, প্রশাসনে গতি আনা, নীতি-নির্ধারণে নতুন ভাবনা এবং নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টি করতেই তরুণদের অন্তর্ভুক্তির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
আজ মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) বেলা সাড়ে ১১ টায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা এবং এরপর বিকাল ৪টায় প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রী পরিষদের শপথ অনুষ্ঠিত হবে।
মন্ত্রণালয়কে একীভূত করার পরিকল্পনা
তারেক রহমানের মন্ত্রী পরিষদের আকার বিগত সরকারের তুলনায় ছোট হতে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে ২৭ থেকে ৩৩ সদস্যদের মন্ত্রী পরিষদ হতে পারে। রাষ্ট্রীয় ব্যয় কমানো, প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি এবং দাপ্তরিক কাজের সমন্বয় জোরদারের লক্ষ্যে কয়েকটি মন্ত্রণালয়কে একীভূত করার পরিকল্পনা করছে।
এ ক্ষেত্রে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, যোগাযোগ সম্পর্কিত ৪ মন্ত্রণালয় মিলে একটি মন্ত্রণালয় হতে পারেন।
বিএনপির একটি সূত্র দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে ( টিবিএস) জানায়, কিছু কিছু মন্ত্রণালয়কে একীভূত করার পরিকল্পনা করছেন তারেক রহমান। সরকারের ব্যয় কমাতে এমন উদ্যোগ নিতে চাচ্ছেন তিনি। এতে কাজের গতি ও জটিলতা কমে আসবে। নতুন সরকার প্রথম পর্যায়ে মন্ত্রী পরিষদের আকার ছোট রাখবেন। একজন মন্ত্রীর অধীনে একাধিক মন্ত্রণালয় থাকবে। ধাপে ধাপে মন্ত্রণালয় একীভূত করে মন্ত্রণালয়ের সংখ্যা কমিয়ে আনবে।
শপথের পরে সংসদীয় দলের বৈঠক ডেকেছে বিএনপি
জাতীয় সংসদের নবনির্বাচিত সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠানের পর সংসদীয় দলের সভা ডেকেছে বিএনপি। শপথ অনুষ্ঠান শেষে সকাল সাড়ে ১১টায় সংসদ ভবনেই এই সভা হবে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, সংসদীয় দলের এই সভায় সংসদ নেতা নির্বাচন হবে। সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হিসেবে আমাদের দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হবেন।
আলোচনায় যারা
বিএনপির ২০০১-৬ সরকারের সময়ের বেশ কয়েকজন মন্ত্রীকে এবারের মন্ত্রী পরিষদেও রাখার কথা ভাবছে বিএনপি।
এ বিষয়ে বিএনপির সূত্র জানায়, বিএনপির বিগত সময়ে যে সব মন্ত্রণালয় বির্তকের ঊর্ধ্বে ছিল, যাদের বিষয়ে বির্তক নেই, ক্লিন ইমেজ রয়েছে তাদেরকে নতুন সরকারের বিভিন্ন দায়িত্বে রাখা হবে।
এদের মধ্যে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খানকে স্পিকার, সালাহউদ্দিন আহমেদকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বিষয়ে ভাবা হচ্ছে।
এছাড়াও মন্ত্রী পরিষদে থাকছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, হাফিজ উদ্দিন আহমদ, এজেড এম জাহিদ হোসেন, ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু।
এদিকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
মন্ত্রী পরিষদে থাকছে নবীনরা
নতুন মন্ত্রী পরিষদে যুক্ত হচ্ছে একাধিক নতুন মুখ। দলের নতুন নেতৃত্ব তৈরি করতে আধুনিক শিক্ষায় উচ্চ শিক্ষিত তরুণদের যুক্ত করা হবে। সম্ভবনাময়ী এমন কয়েকজনকে মন্ত্রী পরিষদে রাখা হচ্ছে।
এদের মধ্যে বিএনপির সিনিয়র যুগ্নমহাসচিব রুহুল কবির রিজভীকে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রনালয় (টেকনোক্র্যাট), চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ইসমাইল জবিউল্লাহকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় (টেকনোক্র্যাট), যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানিকে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী (টেকনোক্র্যাট) হিসেবে বিবেচনায় আছে।
মন্ত্রী পরিষদে থাকছে যুগপৎ আন্দোলনের শরিকরা
কয়েক বছর আগেই আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দাবি যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলো নিয়ে জাতীয় সরকারের ঘোষণা দিয়েছিল বিএনপি। ফলে নতুন মন্ত্রী পরিষদে থাকছে যুগপৎ আন্দোলনের একাধিক নেতা।
দলটির নেতারা বলছেন, দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামে যারা একসঙ্গে ছিল, সরকার গঠন প্রক্রিয়াতেও তাদের অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করা হবে। অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিনিধিত্বশীল কাঠামোর মাধ্যমে গণতন্ত্র পুনর্গঠন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণই হবে এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
এদের মধ্যে বিভিন্ন দল ঘুরে বিএনপিতে যোগ দেওয়া ড. রেজা কিবরিয়া, এনডিএম ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দেওয়া ববি হাজ্জাজ, বিজেপি'র আন্দালিব রহমান পার্থ, গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক নুরু আলোচনায় রয়েছে।
সংবিধান অনুযায়ী, নতুন সরকার গঠনের শুরুটা হবে নবনির্বাচিত সদস্যদের শপথ গ্রহণের মাধ্যমে। সংসদ সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রীকে নিয়োগ নিবেন রাষ্ট্রপতি। প্রধানমন্ত্রী শপথ গ্রহণের মধ্যে দিয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। এরপর নতুন প্রধানমন্ত্রী তার নেতৃত্বে মন্ত্রীসভা গঠন শুরু করবেন। নতুন মন্ত্রীসভা কত সদস্যবিশিষ্ট হবে সেটা নির্ধারণ করবে নির্বাচনে বিজয়ী দল।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণ শুরু হয়। বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ২৯৯টি আসনে ভোটগ্রহণ চলে। ২১১টিতে জয় পেয়েছে বিএনপি।
তবে জয় পেলেও মামলা-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে দুটি আসনে (চট্টগ্রাম-২ ও ৪) ফল ঘোষণা স্থগিত থাকবে। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী পেয়েছে ৬৮টি আসন।
অন্যান্য দলের মধ্যে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ৬টি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ১টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২টি, খেলাফত মজলিস ১টি, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) ১টি, গণঅধিকার পরিষদ ১টি, গণসংহতি আন্দোলন ১টি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ৭টি আসনে জয়ী হয়েছেন।
