১৯৯ আসনে প্রার্থী দিয়েও এক শতাংশ ভোট পায়নি জাতীয় পার্টি, জামানত হারিয়েছেন শীর্ষ নেতারা
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সারা দেশে ১৯৯টি আসনে প্রার্থী দিয়ে একটিতেও জিততে পারেনি জাতীয় পার্টি (জাপা)। এমনকি প্রতিদ্বন্দ্বিতায়ও আসতে পারেনি কোনো আসনেই। ইসির তথ্য অনুযায়ী, দলটি মাত্র ০.৮৯ শতাংশ ভোট পেয়েছে।
দলের চেয়ারম্যান তার আসনে তৃতীয় হয়ে জামানত রক্ষা করতে পারলেও দলের মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী দুটির মধ্যে একটি আসনে জামানত হারিয়েছেন। এর বাইরে দলের প্রায় সব নেতাই তাদের আসনগুলোতে জামানত হারিয়েছেন। সব মিলিয়ে বড় ধরনের রাজনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে দলটি।
শামীম হায়দার পাটোয়ারী গাইবান্ধা-১ আসন থেকে তৃতীয় হয়ে জামানত রক্ষা করতে পারলেও গাইবান্ধা-৫ আসনে জামানত হারিয়েছেন।
এছাড়া দলের তিন বারের সংসদ সদস্য বরিশাল-৩ আসনের গোলাম কিবরিয়া টিপু, ঢাকা-৭ আসনের মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন আহমেদ মিলন তাদের জামানত হারিয়েছেন।
ইসির প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এবারের নির্বাচনে বিএনপি ৪৯.৯৭ শতাংশ, জামায়াত ৩১.৭৬ শতাংশ ও এনসিপি ৩.০৫ শতাংশ ভোট পেয়েছে।
এবারের নির্বাচনে বিএনপি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও জামায়াতে ইসলামীর পর সবচেয়ে বেশি প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে জাতীয় পার্টির।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, এক সময়ে ক্ষমতায় থাকা এবং গত কয়েকটি সংসদে বিরোধী দল হিসেবে থাকা জাতীয় পার্টির এমন ভরাডুবির অন্যতম কারণ আওয়ামী লীগের 'দোসর' হিসেবে থাকা।
তারা বলছেন, দলটির ভোটাররা এবার জাতীয় পার্টিকে ভোট দেয়নি। অথচ দলটি আওয়ামী লীগের ভোট প্রত্যাশা করেছে। দলটির কর্মী ও সমর্থকের সংখ্যা দিন দিন কমেছে। এর ফল এবারের নির্বাচনে হাতে-নাতে পেয়েছে দলটি। অবশ্য সর্বশেষ ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনেও জাপা মাত্র ১১টি আসন পেয়েছিল, যা দলটির ইতিহাসে সর্বনিম্ন।
রোববার (১৫ ফেব্রুয়ারি) নির্বাচন কমিশন এবারের নির্বাচনে কে কত শতাংশ ভোট পেয়েছে এর প্রতিবেদন দিয়েছে। সেখানে দেখা যায় জাতীয় পার্টির প্রাপ্ত ভোটের হার এক শতাংশেরও কম। দলটি ভোট পেয়েছে ০.৮৯ শতাংশ। অনেক ছোট দলও এর চেয়ে বেশি ভোট পেয়েছে।
সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ জাতীয় পার্টি নামে দলটি গঠন করেছিলেন। নব্বইয়ে পতনের আগ পর্যন্ত জাতীয় পার্টি ক্ষমতায় ছিল। এমনকি ক্ষমতা হারানোর পরও জাতীয় পার্টি তৃতীয় বৃহৎ দল হিসেবে পরিগণিত হতো। প্রতিটি নির্বাচনেই দলটির শক্তিশালী অবস্থান ছিল জাতীয় সংসদে। রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলকে জাতীয় পার্টির দুর্গ হিসেবে গণ্য করা হতো। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মতো দলকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা বিজয়ী হয়ে আসতেন।
২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট ক্ষমতায় আসে। সেই জোটে জাতীয় পার্টিও ছিল। ২০১৪ সালে বিএনপি-জামায়াতের বর্জনের মুখে একতরফা নির্বাচনে জাতীয় পার্টি হয়ে যায় প্রধান বিরোধী দল। এরপর থেকে টানা তিন মেয়াদে দলটি সংসদে বিরোধী দল হিসেবে গণ্য হয়। তবে জনসাধারণের মধ্যে দলটি সম্পর্কে বিরূপ প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়। স্বৈরাচারের দোসর হিসেবে দলটিকে আখ্যায়িত করে দেশবাসী। ফলে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর চরম সংকটে পড়ে দলটি।
এবারের নির্বাচনে স্বৈরাচারের দোসর হিসেবে জাতীয় পার্টি যেন অংশ নিতে না পারে এ ব্যাপারে জামায়াতসহ বিভিন্ন দলের দাবি ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত দলটি নির্বাচনে অংশ নেয়। কিন্তু ফলাফলে ফুটে ওঠে দলটির ক্ষয়ে যাওয়া অবস্থার চিত্র। বিশেষ করে বারবার ভাঙনের মুখে পড়া এবং ক্ষমতার ভাগ-ভাটোয়ারায় নিজেদের সম্পৃক্ত করায় জাতীয় পার্টি আজ অস্তিত্ব সংকটে।
যদিও এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪-দলীয় জোট ও মিত্র অধিকাংশ দল ছিল ভোটের বাইরে। একমাত্র জাতীয় পার্টিই বিপুলসংখ্যক প্রার্থী দিয়ে ভোটে ছিল। আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, মুজিবুল হক চুন্নু, রুহুল আমিন হাওলাদার ও কাজী ফিরোজ রশিদের মতো হেভিওয়েট নেতারা ভোটের আগে আলাদা দল ঘোষণা করেন। কিন্তু তারা প্রতীক জটিলতায় ভোট করতে পারেননি।
১৯৯টি আসনে প্রার্থী দিয়েও এক শতাংশের কম ভোট পাওয়ার বিষয়ে সাবেক নির্বাচন সংস্কার কমিশন সদস্য ড. আব্দুল আলিম টিবিএসকে বলেন, লেজুড়ভিত্তিক রাজনীতি করে কখনও সফল হওয়া যায় না। একটি রাজনৈতিক দলের নিজস্ব আদর্শ (আইডিওলজি) থাকতে হয়। সেই আদর্শ নিয়ে জনগণের কাছে যেতে হয়, কথা বলতে হয়। তিনি আরও বলেন, বিরোধী দলে থাকা এবং আবার সরকারি দলে থাকা, এই দ্বৈত অবস্থান মানুষ ভালোভাবে নেয়নি।
