বাংলাদেশের রাজনীতিতে কি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে জাতীয় পার্টি?
এক সময় জাতীয় পার্টির ব্যাপক দাপট ছিল গাইবান্ধায়। ষাটোর্ধ্ব স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকে এখনও গাইবান্ধা-৫ (সাঘাটা-ফুলছড়ি) আসনকে জাতীয় পার্টির ঘাঁটি হিসেবেই মনে করেন। কিন্তু এবারের নির্বাচনে সেই সমীকরণ পাল্টে গেছে।
ফুলছড়ি উপজেলার ব্রহ্মপুত্র নদের গোপ্তমণি চরে দাঁড়িয়ে আবদুল মোমিন হতাশ কণ্ঠে বলেন, "দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলেই দল শেষ হয়ে গেছে।"
এবার গাইবান্ধা-৫ আসনে জাতীয় পার্টির হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন দলটির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী। লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে তিনি পান মাত্র ৩,৩৭৫ ভোট এবং জামানত হারান। অন্যদিকে, দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা আবদুল ওয়ারেজ ৮৯,২৭৪ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন।
গাইবান্ধা-১ আসনেও শামীম হায়দার তৃতীয় স্থান অর্জন করেন; সেখানে তিনি পান ৩২,৭৫৪ ভোট। একসময় কুড়িগ্রামেও জাতীয় পার্টির শক্ত অবস্থান ছিল। কিন্তু, এবার সেখানেও দলের ভরাডুবি হয়েছে; জেলার চারটি আসনই জয় করেছে জামায়াতে ইসলামী।
কুড়িগ্রাম-১ আসনের বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের চর কুটি–বামনডাঙ্গা এলাকার বাসিন্দা নুর ইসলাম বলেন, "জাতীয় পার্টি এখন মৃত দল। এমপি হওয়ার পর তারা নিজেদের স্বার্থ নিয়েই ব্যস্ত থাকে। প্রার্থীরা স্থানীয় মানুষের খোঁজখবর রাখেন না। শুধু ভোটের সময় তাদের দেখা যায়। এ কারণেই এবার কুড়িগ্রামে বড় পরিবর্তন এসেছে।"
রংপুর বিভাগের আট জেলায় এবার জাতীয় পার্টি ৩০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও—একটিতেও জিততে পারেনি। এমনকী সারাদেশে ২০০ আসনে প্রার্থী দিলেও—কোনো আসন তাদের ঝুলিতে যায়নি।
অনেক ভোটারের ধারণা, গত ১৬ বছরে জাতীয় পার্টি কার্যত বিলুপ্তির পথে হেঁটেছে এবং বাস্তবে আওয়ামী লীগের ছায়াতলে অবস্থান নিয়েছে।
গত ১৬ বছরে তিনটি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। রংপুরের ছয়টি আসনের মধ্যে তিনটিতে জয়ী হয়েছিল আওয়ামী লীগ। তবে এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নেয়নি। অন্যদিকে মাঠে জামায়াত–বিএনপির জোটের বিপরীতে জাতীয় পার্টি কার্যকর প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পারেনি।
এই নির্বাচনে দীর্ঘদিনের জাতীয় পার্টির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত রংপুরের ছয়টির মধ্যে পাঁচটি আসন জিতেছে জামায়াতে ইসলামী। বাকি একটি গেছে তাদের মিত্র জাতীয় নাগরিক পার্টির ঝুলিতে। ফলে ঐতিহাসিকভাবে জাতীয় পার্টির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত রংপুর এবার তাদের জন্য শূন্য আসনে পরিণত হয়েছে।
রংপুর-৩ আসনটি সদর উপজেলা ও সিটি করপোরেশন এলাকা নিয়ে গঠিত। জামায়াতে ইসলামী'র কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য ও রংপুর মহানগরের সাবেক আমির মাহবুবুর রহমান বেলাল এবারের নির্বাচনে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ১,৭৮,০৬৪ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন।
এই আসনে বিএনপি প্রার্থী সামসুজ্জামান সামু পান ৮৫,৪৯৮ ভোট। একই আসনে লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের পান ৪৩,৭৯০ ভোট।
গত বৃহস্পতিবার ভোটের দিন জিএম কাদেরকে কোথাও দেখা যায়নি। তিনি নিজেও রংপুরের সেনপাড়ায় অবস্থিত তার স্কাই ভিউ বাসভবন থেকে বের হননি। একাধিকবার গণমাধ্যমকর্মীরা তার বাড়ির সামনে জড়ো হলেও তিনি তাদের সামনে আসেননি।
রংপুর সদর এলাকার দীর্ঘদিনের বাসিন্দা ও একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী ইমরান হোসেন বলেন, "আগের তুলনায় জাতীয় পার্টি এখন অনেক দুর্বল। দলের প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যু, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, এমপিদের এলাকায় অনাগ্রহ, উন্নয়নে পিছিয়ে পড়া এবং আগের সরকারের প্রতি অন্ধ সমর্থন—সব মিলিয়ে এবারের ভোটে প্রভাব ফেলেছে। নির্বাচনী মাঠে জাতীয় পার্টির চিত্র একেবারেই ভিন্ন ছিল।"
নির্বাচনের আগে অনেক ভোটার মনে করেছিলেন, নীলফামারী-৪ (সৈয়দপুর–কিশোরগঞ্জ) আসনে জাতীয় পার্টি বড় ব্যবধানে জিতবে। কিন্তু সেখানেও ফলাফল হতাশাজনক। ওই আসনের ভোটার রুনা প্রামাণিক বলেন, "মানুষের সঙ্গে সংযোগ হারিয়েছে জাতীয় পার্টি। তাই তাদের ভোট কমেছে।"
তবে জাতীয় পার্টির দাবি, ১৯৯১ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত সাধারণ নির্বাচনে রংপুর অঞ্চলের ৯২ শতাংশ আসন তারা জিতেছিল, অনেক ক্ষেত্রে বড় ব্যবধানে। কিন্তু এবার তারা ভয়াবহ পরাজয়ের মুখে পড়েছে।
জাতীয় পার্টি ও নির্বাচনী পরিসংখ্যান
বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ১৯৮৬ সালের ১ জানুয়ারি ক্ষমতায় থাকাকালীন জাতীয় পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন। সেনাপ্রধান থেকে রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে তিনি প্রায় ৯ বছর দেশশাসন করেন। গণঅভ্যুত্থানের মুখে তার সরকারের পতনের পর ১৯৯১ সালে নির্দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে দলটি ৩৫টি আসন পায় এবং প্রায় ১২ শতাংশ ভোট অর্জন করে।
১৯৯৬ সালের নির্বাচনে জাতীয় পার্টি ৩২টি আসন ও প্রায় ১৬ শতাংশ ভোট পায় এবং আওয়ামী লীগকে সমর্থন দিয়ে সরকার গঠনে ভূমিকা রাখে। ২০০১ সালে তাদের আসন কমে দাঁড়ায় ১৪টিতে, ভোটের হার নেমে আসে ৭ শতাংশে।
২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের অংশ হিসেবে দলটি ২৮টি আসন পায়। ২০১৪ সালে যখন বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেয়নি, তখন জাতীয় পার্টি ৩৪টি আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হয়।
২০১৮ সালে দলটি পায় ২২টি আসন এবং ২০২৪ সালে তা কমে দাঁড়ায় ১১টিতে; ভোটের হার নেমে আসে প্রায় ৩ শতাংশে। আর এবারের নির্বাচনে দলটি আরও বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে।
জাতীয় পার্টির ভাঙন
অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের জেরে জাতীয় পার্টি একাধিকবার ভেঙেছে। এবারেও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে দলটি আবারও বিভক্ত হয়। আনিসুল ইসলাম মাহমুদের নেতৃত্বে হেভিওয়েট নেতাদের নিয়ে নতুন একটি অংশ আত্মপ্রকাশ করে। প্রতিষ্ঠাতা এরশাদ জীবিত থাকাকালেও দলটি কয়েকবার বিভক্ত হয়েছিল, যদিও এরশাদ নেতৃত্বাধীন অংশই মূল দল হিসেবে টিকে ছিল।
২০০৯ সালে এরশাদের মৃত্যুর পর দলীয় নেতৃত্ব নিয়ে রওশন এরশাদ ও জিএম কাদেরে মধ্যে বিভক্তি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০২৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জি এম কাদেরকে প্রধান নেতা হিসেবে গুরুত্ব দিলে রওশনপন্থীরা দুর্বল হয়ে পড়ে।
বর্তমানে জি এম কাদেরের নেতৃত্বাধীন অংশে মহাসচিব হয়েছেন শামীম হায়দার পাটোয়ারী। তবে দলীয় সংকট কাটাতে সাবেক মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গা ও সাবেক এমপি নূর মোহাম্মদ মণ্ডলকে দলে ফেরানো হলেও ভাঙন রোধ করা যায়নি।
এর আগে মিজানুর রহমান চৌধুরী ও আনোয়ার হোসেন মঞ্জু জাতীয় পার্টি থেকে আলাদা হয়ে জাতীয় পার্টি (জেপি) গঠন করেন।
এছাড়া নাজিউর রহমান মঞ্জু বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) প্রতিষ্ঠা করেন, যার বর্তমান প্রধান আন্দালিব রহমান পার্থ এবারের নির্বাচনে বিএনপি জোটের প্রার্থী হিসেবে জয়ী হয়েছেন।
জাতীয় পার্টির ভাষ্য
এসব ভাঙন জাতীয় পার্টির রাজনীতি ও ভোটের মাঠে ব্যাপক প্রভাব পড়েছে বলে স্বীকার করেন দলটির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী। এবারের নির্বাচনে 'মহাবিপর্যয়' নিয়ে কথা বলেন দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের সাথে।
তিনি বলেন, "অনেক আসনে আমাদের জনপ্রিয় ব্যক্তি ছিল, সেজন্য এমপি হওয়া নিশ্চিত ছিল। এগুলো ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করে হারিয়ে দেওয়া হয়েছে। শুধু ইঞ্জিনিয়ারিং নয়—জাতীয় পার্টির ভোটগুলো গণনা কমিয়ে লো-কাস্টিং দেখিয়ে থার্ড করানো হয়েছে। এটি করা হয়েছে, যাতে সংসদের উচ্চকক্ষ, নিম্নকক্ষ কোথাও জাতীয় পার্টি আসতে না পারে। এটি একটি ডিজাইন ছিল, সেই ডিজাইনে আমাদের ফেলে দেওয়া হয়েছে।"
জাতীয় পার্টির এই নেতা আরও বলেন, "এখানে জামায়াত এক লাখ দেড় লাখ করে ভোট পেয়েছে। সরকার জাতীয় পার্টিকে সংসদের বাইরে রাখার পরিকল্পনা করেছিল। সেখানে সফলও হয়েছে। তবে জাতীয় পার্টি এতে মোটেও আশাহত নয়। সামনে জাতীয় পার্টি আরও সুসংগঠিত হবে। তবে আমরা একটি বিষয়ে আমরা সফল হয়েছি যে মার্কাটা ব্যালটে ছিল। আমাদের প্রার্থীরাও ভোটের মাঠে ছিল। এটাও অর্জন, কারণ জাতীয় পার্টিকে হুমকি দেওয়া হয়েছিল যে ভোট করতে দেওয়া হবে না। মার্কা থাকা যাবে না। কিন্তু জাতীয় পার্টি ভোটের মাঠে ছিল। এটাও জাতীয় পার্টির অর্জন।"
আওয়ামী লীগের সঙ্গে থাকা ও দলীয় কোন্দলের কারণে প্রভাব পড়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, "দলীয় কোন্দল এবং একটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে থাকার প্রভাব পড়েছে। তবে এটাই প্রধান কারণ নয়। ভোটের মাঠের ইতিহাস হলো আমাদের আসনগুলোতে সব সময়ই প্রথম ছিলাম। কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। এটা হওয়ার কথা নয়। আমাদের ভোটাররা দীর্ঘদিন ধরেই আমাদের সাথে আছেন। জাতীয় পার্টির ভোটের সংখ্যা আমাদের কোর ভোটারের চেয়ে অনেক কম। আবার আরেকটি বিষয় উদ্বেগের বিষয় হলো, ভোটের ১০ দিন আগে থেকেই মিডিয়াতে আমাদের কোনো নিউজ ছিল না। এটাও ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের একটি অংশ।"
এখন কী করবে জাতীয় পার্টি, এমন প্রশ্নের জবাবে শামীম পাটোয়ারী বলেন, "আমরা সব প্রার্থীকে ঢাকা ডেকে পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিব। আমরা মাঠে আছি, থাকব।"
