অনানুষ্ঠানিকভাবে ভোটার উপস্থিতি ৬১%, ২০০৮ সালের ৮৭% এর তুলনায় বড় পতন
বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট ভোটার উপস্থিতি অনানুষ্ঠানিকভাবে ৬১ শতাংশ হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি আরও বেশি হবে বলে অনেকেই আশা করেছিলেন।
আগের জাতীয় নির্বাচনে ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ভোটার উপস্থিতির হার জানানো হতো। তবে এবার তা হয়নি।
গতকাল বিকেল সাড়ে ৪টায় ভোটগ্রহণ শেষ হলেও ১২ ঘণ্টা পরও নির্বাচন কমিশন (ইসি) আনুষ্ঠানিকভাবে সার্বিক ভোটার উপস্থিতির হার ঘোষণা করেনি। তবে ইসির একটি সূত্র দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে জানিয়েছে, ভোটার উপস্থিতি ছিল ৬১ শতাংশের মতো।
এর আগে, দুপুরে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ জানান, দুপুর ১২টা পর্যন্ত ৩২ হাজার ৭৮৯টি ভোটকেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি ছিল ৩২ দশমিক ৮৮ শতাংশ।
রাত সাড়ে ৯টার দিকে কমিশন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিনসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা ফল ঘোষণা শুরু করেন। তবে সে সময় ভোটার উপস্থিতির হার জানানো হয়নি।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ইসি সচিব আখতার আহমেদ বলেন, "২৯৭ বা ২৯৯টি কেন্দ্রের ভোট গণনার তথ্য পাওয়ার পর আমরা ভোটার উপস্থিতির হার জানাব। ততক্ষণ পর্যন্ত ধৈর্য ধরুন।"
এদিকে, নির্বাচনী সংস্কার কমিশনের সদস্য এবং নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন তুলি ভোটার উপস্থিতি ঘোষণায় বিলম্ব নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।
তিনি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "আগের নির্বাচনে ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার দুই ঘণ্টার মধ্যেই ভোটার উপস্থিতির হার ঘোষণা করা হতো।"
২০২৪ সালের জুলাইয়ের রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের পর এবারের নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রে ব্যাপক উপস্থিতির প্রত্যাশা ছিল। তবে সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। আগের সাধারণ নির্বাচনের অভিজ্ঞতা থেকে যে ধারণা তৈরি হয়েছিল, বাস্তবে উপস্থিতি তার চেয়ে কম। এ নির্বাচনকে দেশের রাজনৈতিক গতিপথে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
যদি গতকাল ভোটার উপস্থিতি সত্যিই ৬১ শতাংশ হয়ে থাকে, তবে তা আগের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল ৮৭ দশমিক ১৩ শতাংশ। সে সময় রাজনৈতিক উৎসাহ এবং ছবি সংবলিত ভোটার পরিচয়পত্র চালুর কারণে ভোটার অংশগ্রহণ বেড়েছিল বলে মনে করা হয়।
২০০১ সালের সাধারণ নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল ৭৫ দশমিক ৫৯ শতাংশ। সে নির্বাচনে ৫৪টি রাজনৈতিক দল অংশ নেয়। ১৯৯৬ সালের জুনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে অংশগ্রহণ ছিল ৭৪ দশমিক ৯৬ শতাংশ। আর স্বৈরশাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট দেন ৫৫ দশমিক ৪৫ শতাংশ ভোটার।
অন্যদিকে, সর্বনিম্ন ভোটার উপস্থিতি রেকর্ড করা হয় ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। সে নির্বাচনে অংশগ্রহণ ছিল মাত্র ২০ দশমিক ৯৭ শতাংশ। অধিকাংশ প্রধান রাজনৈতিক দল বর্জন করায় পরবর্তীতে ওই নির্বাচন বাতিল করা হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের তুলনামূলক কম অংশগ্রহণের প্রধান কারণ ছিল ব্যালটে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি। তাদের মতে, দলটির অনেক সমর্থক ভোটকেন্দ্রে যাননি।
কিছু বিশ্লেষক আবার 'জেনারেশন জেড'-এর (জেন-জি) একটি অংশের অনাগ্রহের কথাও উল্লেখ করেছেন। তাদের মধ্যে অনেকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি সন্তুষ্ট নন বলে জানা গেছে।
বিবিসি বাংলার সাবেক প্রধান সাবির মুস্তাফা বলেছেন, অন্তর্ভুক্তির ঘাটতি সরাসরি প্রভাব ফেলেছে। তিনি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "নির্বাচন পুরোপুরি অন্তর্ভুক্তিমূলক ছিল না। আওয়ামী লীগের বাইরে থাকা মোট ভোটার উপস্থিতির ওপর বড় প্রভাব ফেলবেই।"
গতকাল ঢাকায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেন, কিছু লোক ভোটারদের হুমকি ও নিরুৎসাহিত না করলে ভোটার উপস্থিতি আরও বেশি হতে পারত।
তিনি বলেন, "এ ধরনের ঘটনা না ঘটলে ভোটার উপস্থিতি আরও বাড়তে পারত।"
