পুরান ঢাকায় উৎসবমুখর ভোট: উচ্ছ্বসিত নতুন ভোটার, স্বস্তিতে প্রবীণরা
পুরান ঢাকার সকালগুলো এমনিতেই আনন্দমুখর থাকে। দিন শুরু হয় এক বিশেষ চিরচেনা আমেজের মধ্য দিয়ে। এখানকার সরু গলিগুলোতে ইতিহাস আর ঐতিহ্যের নস্টালজিয়া যেমন মিশে থাকে, তেমনি থাকে স্থানীয় জীবনের প্রাণচঞ্চলতা—যা এই এলাকার একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। আজ সকালে সেই চিরচেনা রুটিনে এক বিশেষ মাত্রা যোগ হয়েছে চলমান নির্বাচনের মাধ্যমে। মুখরোচক নাস্তা আর ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ হাতে রাস্তার ধারের প্রাণবন্ত আড্ডায় আজ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এক ভিন্ন মেজাজ তৈরি করেছে।
আজ সকালে সূত্রাপুর, ওয়ারী, গেন্ডারিয়া ও কোতোয়ালির অলিগলি ঘুরে দেখা গেছে জীবনের এক সামান্য ভিন্ন ছন্দ। কেউ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ভোটকেন্দ্রে যাচ্ছেন, কেউবা দলে দলে দাঁড়িয়ে প্রার্থীদের প্রতিশ্রুতি নিয়ে আলোচনা করছেন। দিনের শুরুর ভাগেই ভোট দেওয়ার তাড়না অলিগলিগুলোতে এক নতুন প্রাণশক্তি জুগিয়েছে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চায়ের দোকানগুলোতে রাজনৈতিক আলোচনা আরও জোরালো হয়ে ওঠে। বাতাসে ভাসছিল পছন্দের প্রার্থীর বিজয়ের আশা। সব মিলিয়ে সামাজিক এই বাসিন্দাদের জন্য জাতীয় নির্বাচন নিজেদের মতামত বিনিময়ের এক নতুন উপলক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভোটকেন্দ্রগুলোর সামনে ছোট ছোট ভিড় দেখা গেছে। কেউ লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন, কেউবা অপেক্ষায়। আর যারা ইতিমধ্যে ভোট দিয়েছেন, তারা আঙুলের কালির ছাপ দেখিয়ে বেশ উচ্ছ্বসিত হয়ে বেরিয়ে আসছিলেন। ঢাকা-৬ আসনের টিকাটুলি এলাকার সেন্ট্রাল উইমেন্স কলেজ কেন্দ্রে ভোট দিয়েছেন ২২ বছর বয়সী 'জেন-জি' ভোটার আশরাফুল ইসলাম। তিনি বলেন, "জীবনে প্রথমবারের মতো ভোট দিতে পেরে আমি খুশি। খুব ভালো লাগছে।" তিনি আরও জানান যে নিজের পছন্দ অনুযায়ী তিনি গণভোটেও তার রায় দিয়েছেন।
সদরঘাট এলাকার কিশোরীলাল জুবিলী স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে ২৩ বছর বয়সী ভোটার মিথিলা আক্তারও প্রথমবারের মতো ভোট দিয়েছেন। মা ও এক বান্ধবীর সঙ্গে হাসিমুখে কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে আসতে দেখা যায় তাঁকে। নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে মিথিলা বলেন, "গতকাল থেকেই আমি খুব উত্তেজিত ছিলাম। নিরাপত্তা নিয়ে কিছুটা দুশ্চিন্তা ছিল, কিন্তু এখন পর্যন্ত তেমন কিছু ঘটেনি। নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পেরে আমার খুব ভালো লাগছে।"
নতুন ভোটারদের উদ্দীপনার পাশাপাশি প্রবীণ ভোটারদের দায়িত্ববোধ নির্বাচনের উৎসবে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ষাটোর্ধ্ব ভোটার আশরাফুল হক ভোট দিতে এসেছিলেন নারিন্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে। দীর্ঘকাল ধরে গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচনের অনুপস্থিতি নিয়ে তাঁর কণ্ঠে কিছুটা আক্ষেপের সুর থাকলেও এবারের ভোট নিয়ে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, "এতদিন পর আমার ভোটের অধিকার ফিরে পেয়ে ভালো লাগছে। অনেক বছর আমি ভোট দিতে পারিনি। সে কারণেই অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে সকালেই চলে এসেছি। আশা করি আজকের ভোট শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হবে।"
উৎসবের মেজাজের মধ্যেও অবশ্য সতর্কতার ছাপ ছিল স্পষ্ট। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টহল এবং ভোটকেন্দ্রে নিয়ন্ত্রিত প্রবেশাধিকার শৃঙ্খলা বজায় রাখার প্রচেষ্টাকেই প্রতিফলিত করেছে। তবে ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ পুরান ঢাকাকে এক প্রাণবন্ত রূপ দিয়েছে।
ওয়ারী বিভাগের ডিআইজি মো. শাহাবুদ্দিন বলেন, পুরান ঢাকায় উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তিনি আরও যোগ করেন, "আশা করি সামনের সময়গুলোতেও নিরাপত্তার কোনো ত্রুটি হবে না।"
প্রতিবেদকরা ঢাকা-১০ আসনের ঢাকা কলেজ, ঢাকা সিটি কলেজ এবং সরকারি ল্যাবরেটরি স্কুল পরিদর্শন করেন। এরপর তারা লালবাগ মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং রহমতুল্লাহ হাই স্কুলেও যান। কেন্দ্রগুলোতে ভোটারদের উপস্থিতি ছিল সন্তোষজনক। এসব এলাকায় বড় ধরনের কোনো বিশৃঙ্খলা বা সহিংসতার খবর পাওয়া যায়নি।
