কাল নির্বাচন ঘিরে নিরাপত্তা জোরদার, ভোট আয়োজনে পুরোপুরি প্রস্তুত ইসি
ভোটের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ। বহুল প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সামনে রেখে সারাদেশে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা, পর্যবেক্ষণ ও প্রযুক্তিগত নজরদারিসহ সব দিক থেকেই নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি প্রায় শেষ বলে জানিয়েছে কমিশন।
ইসির দাবি, অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় এবার বেশি সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে একটি শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করা হবে।
মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে নির্বাচন কমিশন ভবনে এক ব্রিফিংয়ে নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, আগামী ১২ জানুয়ারি নির্বাচন আয়োজনের জন্য কমিশন পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছে এবং সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সন্তোষজনক।
তবে নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর বিচ্ছিন্ন কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব ঘটনা না ঘটলে পরিবেশ আরও সুসংহত হতো।
নির্বাচন বিশ্লেষকেরা বলছেন, সামনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যেন কোনো অবনতি না হয়, সে বিষয়ে ইসিকে কঠোর নজরদারি রাখতে হবে।
নির্বাচনী সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য ও ইসি সচিবালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন তুলি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "এখন নির্বাচন কমিশনের সবচেয়ে বড় মনোযোগ দেওয়া উচিত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর। ভোটের দিন যদি কোথাও বড় ধরনের সহিংস ঘটনা ঘটে, তাহলে পুরো নির্বাচনই প্রশ্নবিদ্ধ হবে। বগুড়ার সাম্প্রতিক ঘটনার মতো কিছু হলে সেটি অবশ্যই উদ্বেগের।"
তিনি বলেন, "ভোট গ্রহণের সময়সূচি বা কাউন্টিং প্রক্রিয়া কমিশন পরিষ্কারভাবে জানিয়েছে। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ভোটকেন্দ্রে কোনো বিশৃঙ্খলা না হওয়া এবং ফলাফল যত দ্রুত সম্ভব প্রকাশ করা।"
ভোট শুরুর সময় নিয়ে তিনি বলেন, "ভোট সকাল সাড়ে ৭টায় শুরু হবে। এতে কোনো সমস্যা দেখি না। সাধারণ ভোটাররা সাধারণত একটু পরে আসেন। তবে যদি নেতাকর্মীরা খুব ভোরে কেন্দ্র ঘিরে উত্তেজনা তৈরি করেন, সেটি সমস্যা হতে পারে।"
নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "ভোটকেন্দ্রে যদি কোনো ঝামেলা না হয়, ব্যালট বাক্স ছিনতাই, কেন্দ্র দখল বা বাইরে মারামারির ঘটনা না ঘটে—তাহলে নির্বাচন অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য হবে। শান্তিপূর্ণভাবে ভোট শেষ করে দ্রুত ফল প্রকাশ করতে পারলে সেটাই হবে সবচেয়ে বড় সাফল্য।"
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, "গত কয়েক সপ্তাহে সারাদেশে ৮৫০টির বেশি অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে, যা সম্ভাব্য সহিংসতা প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার প্রমাণ।"
তিনি রাজনৈতিক দল, প্রার্থী ও ভোটারদের শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচন সম্পন্ন করার আহ্বান জানান।
এদিকে গতকাল ইন্টারকন্টিনেন্টাল ঢাকায় বিদেশি সাংবাদিকদের জন্য মিডিয়া সেন্টার উদ্বোধন অনুষ্ঠানে ইসি সচিব আখতার আহমেদ বলেন, ২৯৯টি আসনে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে এবং সব ব্যালট পেপার ও নির্বাচনী সামগ্রী ইতোমধ্যে পাঠানো হয়েছে।
সারাদেশে মোট ৪২ হাজার ৯৫৮টি ভোটকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪২ হাজার ৬৫৯টি সরাসরি ভোটগ্রহণের জন্য এবং ২৯৯টি ডাকযোগে ভোট গণনার জন্য নির্ধারিত। ইসি প্রায় ৫০ ভাগ কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
তিন স্তর বিশিষ্ট নিরাপত্তা ব্যবস্থা
নির্বাচনে ৮ হাজার ৭৭০টি কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম। তিনি আশ্বস্ত করেছেন, এসব কেন্দ্রে তিন স্তরের কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকবে।
গতকাল (১০ ফেব্রুয়ারি) পুলিশ সদর দপ্তরের মিডিয়া সেন্টারে 'জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি' নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে আইজিপি এসব তথ্য জানান।
আইজিপি বলেন, "সারা দেশে মোট ৪২ হাজার ৭৭৯টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৮ হাজার ৭৭০টি ঝুঁকিপূর্ণ। ১৬ হাজার কেন্দ্রকে মধ্যম ঝুঁকিপূর্ণ এবং বাকি কেন্দ্রগুলোকে সাধারণ হিসেবে ধরা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ ও মধ্যম ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে বাড়তি নজরদারি থাকবে।"
আসন্ন নির্বাচনকে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে নিরাপদ নির্বাচন হিসেবে আয়োজন করতে সরকার সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েছে বলে জানান আইজিপি। তিনি জানান, নির্বাচনে সারা দেশে প্রায় ১ লাখ ৮৭ হাজার ৬০৩ জন পুলিশ সদস্য, প্রায় ৬ লাখ আনসার, বিজিবি এবং ১ লাখ সেনা সদস্য মোতায়েন থাকবে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পর্কে তিনি বলেন, "তিন স্তরের নিরাপত্তা থাকবে। প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে থাকবে স্ট্যাটিক ফোর্স, এর বাইরে থাকবে মোবাইল টিম এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় থাকবে স্ট্রাইকিং ফোর্স।"
আইজিপি জানান, গত ১১ ডিসেম্বরের পর থেকে নির্বাচন ঘিরে ৩১৭টি সহিংসতার ঘটনায় ৬১৩ জন আহত এবং ৫ জন নিহত হয়েছেন। তিনি বলেন, "একটি মৃত্যুও আমাদের জন্য দুর্ভাগ্যজনক।"
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদি ও শেরপুরের জামায়াত নেতা রেজাউল করিমসহ মোট ৫ জন নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতায় মারা গেছেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
নির্বাচন নিরাপত্তায় প্রযুক্তির ব্যবহারের ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনের উদ্যোগে ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে পুলিশ বডি ক্যামেরা ব্যবহার করবে এবং পাশাপাশি জেলা পুলিশ সুপাররা প্রয়োজনে ড্রোন ক্যামেরাও ব্যবহার করবেন।
আইনশৃঙ্খলা ও প্রযুক্তি
নির্বাচনে নিরাপত্তায় সারাদেশে প্রায় ৯ লাখ ৫৮ হাজার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি দায়িত্ব পালন করছেন প্রায় ২ হাজার ১০০ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও ৬৫৭ জন বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট।
এবার প্রথমবারের মতো নির্বাচনে ড্রোন (ইউএভি), বডি-ওয়ার্ন ক্যামেরা এবং ব্যাপকভাবে সিসিটিভি ক্যামেরা ব্যবহার করা হচ্ছে।
ইসি জানিয়েছে, ৯০ শতাংশের বেশি কেন্দ্রে সিসিটিভি নজরদারি নিশ্চিত করা হয়েছে।
নির্বাচনী আইন প্রতিপালন নিশ্চিত করতে সারাদেশে এক হাজারের বেশি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হচ্ছে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্য ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় টহল ও ভোটকেন্দ্র পরিদর্শন করছেন।
ভোট গণনা ও ফলাফল
জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের দুটি ব্যালট একসঙ্গে গণনা করা হবে। কেন্দ্র পর্যায়ে প্রাথমিক ফল প্রকাশের পর তা রিটার্নিং কর্মকর্তার মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনে পাঠানো হবে। বেশিরভাগ আসনের ফলাফল মধ্যরাতের মধ্যেই পাওয়া যাবে বলে আশা করছে কমিশন।
নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, "এ পর্যন্ত যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আছে, নির্বাচন কমিশন তাতে সন্তুষ্ট। যে বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলো ঘটেছে, এগুলো না ঘটলে আরও ভালো হতো।"
তিনি বলেন, "অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে আমরা ভালো অবস্থায় আছি। সারাদেশে প্রায় ৯ লাখ ৫৮ হাজার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।"
ভোটের হার কেমন হবে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, "আমরা কোনো ধরনের অনুমান করতে চাই না। তবে যে ফিডব্যাক পেয়েছি, তাতে ভোটার উপস্থিতি ভালো হবে বলে ধারণা করছি। মানুষের মধ্যে উৎসবমুখর পরিবেশ দেখা যাচ্ছে। অনেকেই ভোট দিতে বাড়িতে যাচ্ছেন। ভোটারদের উপস্থিতি, উচ্ছ্বাস ও রাজনৈতিক দলগুলোর সম্পৃক্ততা লক্ষণীয়। এত বড় পরিসরে আগে কখনো এত ফোর্স ও সক্ষমতা মোতায়েন করা হয়নি।"
সোমবার ইসির সিনিয়র সহকারী সচিব মো. শহীদুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় বলা হয়, সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তাদের অধীনে নিয়োজিত ডেটা এন্ট্রি অপারেটররা প্রতি দুই ঘণ্টা অন্তর ভোটকেন্দ্রভিত্তিক উপস্থিতির তথ্য নির্বাচন ব্যবস্থাপনা সিস্টেমে (ইএমএস) আপলোড করবেন।
তথ্য যাচাই ও অনুমোদনের পর তা ইসির 'কপোট ড্যাশবোর্ড'-এ প্রদর্শন করা হবে, যাতে তাৎক্ষণিক পর্যবেক্ষণ সম্ভব হয়।
