বাথরুমের পেস্ট ও টয়লেটের পানি খেয়ে থেকেছে মোহনা: শিশু গৃহকর্মী নির্যাতনের বর্ণনা দিয়ে বিচারক
১১ বছরের শিশু গৃহকর্মী মোহনার ওপর হওয়া নির্যাতনের বর্ণনা দিয়ে বিচারক বলেছেন, 'খুন্তি দিয়ে মারধর ও চোখের মধ্যে মরিচের গুঁড়ো দেওয়া হতো মোহনাকে। তাকে বাথরুমের মধ্যে লুকিয়ে রাখতো। ওখানে খাবার দিতো না। বাথরুমে পানির মধ্যে থাকতে থাকতে তার পায়ে পচন ধরে গেছে। পুরো শীতে শীতের পোশাক দেয়নি। ভালো কোনো খাবার দেয়নি। বাথরুমের পেস্ট খেয়েছে। টয়লেটের পানি খেয়ে থেকেছে।'
মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে শিশু গৃহকর্মীকে নির্যাতনের এই মামলায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সাফিকুর রহমান এবং তার স্ত্রী বিথীসহ ৪ জনকে আদালতে হাজির করে পুলিশ।
ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জাকির হোসাইনের আদালতে রিমান্ড শুনানি চলাকালে বিচারক ভুক্তভোগী শিশুর জবানবন্দির বরাতে এসব কথা বলেন। এর আগে গত রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উত্তরা পশ্চিম থানার উপপরিদর্শক রোবেল মিয়া আসামিদের সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করেছিলেন।
এদিন বেলা পৌনে ৩টায় কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে আসামিদের এজলাসে তোলা হয়। বেলা ৩টা ১৩ মিনিটে বিচারক এজলাসে আসার পর শুনানি শুরু হয়। শুরুতে তদন্ত কর্মকর্তা রিমান্ডের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে বলেন, 'মামলাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সেনসেটিভ। ভিকটিমের সাথে কেন তারা এই ধরনের নির্যাতন করেছেন তার মূল রহস্য উদ্ঘাটনের জন্য প্রত্যেকের সাত দিনের পুলিশ রিমান্ড প্রয়োজন।'
এরপর মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে শুনানি করেন আইনজীবী ফাহমিদা আক্তার। তিনি বলেন, 'তিনি একজন সরকারি কর্মকর্তা হয়ে কীভাবে এরকম নির্যাতন করলেন? এই মামলায় চার জনের কথা বলা হয়েছে। এই চারজনেই ভিকটিমকে পাশবিক নির্যাতন করেছেন। কী কারণে তারা টর্চার করেছেন, তা জানা দরকার। শিশু আইনে ১২ বছরের নিচে কাউকে কাজে রাখা যায় না। কিন্তু একজন বিমানের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ আইন জানা সত্ত্বেও কেন শিশু গৃহকর্মী রাখলেন? সেখানে কাজে নিয়ে এমন নির্যাতন কীভাবে করেন? এমনকি কাজের মহিলাও তাকে বিভিন্ন সময়ে থাপ্পড় মারতো। ভুক্তভোগীকে মারার জন্য ওই বাসায় খুন্তি রেডি ছিল। এই ঘটনা সারা বিশ্বকে নাড়া দিয়েছে। আসামিদের সর্বোচ্চ রিমান্ডের প্রার্থনা জানাচ্ছি।'
বাদীপক্ষের আরেক আইনজীবী লিটন মাহমুদ বলেন, 'ভুক্তভোগী গৃহকর্মীকে আসামিরা টয়লেটের ভেতরে আটকে রাখতো। খাবার খেতে দিতো না। সেখানে সে টয়লেটের পানি, টিস্যু, পেস্ট খেয়ে বেঁচেছিল।'
আসামিপক্ষের আইনজীবীরা রিমান্ডের বিরোধিতা করে বলেন, 'মনে হয় বাদীপক্ষ আঘাতের সংজ্ঞা ভুলে গেছেন। আসামিদের মধ্যে কাজের মহিলা রুপালী বেগম বাচ্চাসহ আদালতে এসেছেন। মানবিক কারণে তাদের বিবেচনা করা হোক।' তারা আসামিদের জামিন প্রার্থনা করেন।
গত রোববার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট নাজমিন আক্তারের আদালতে ভুক্তভোগী মোহনা ২২ ধারায় জবানবন্দি দেয়। সেই জবানবন্দি উল্লেখ করে বিচারক বলেন, 'বাংলাদেশের জনগণ যাতে জানতে পারে, ভুক্তভোগী যে পজিশন থেকে এ স্টেটমেন্ট দিয়েছে আমি সেটা শুনাচ্ছি। তার মুখ থেকে গলা পর্যন্ত লম্বা পোড়ার দাগ, যা এখন সাদা হয়ে আসছে। কপালে লাঠি দিয়ে মারার দাগ আছে। হাতে বাঁশের লাঠির আঘাত ও পোড়ার দাগ আছে, সেই দাগটা এখনো দগদগে। পায়ের রানে বড় অংশে খুন্তি দিয়ে ছ্যাঁকার দাগ আছে এবং লাঠি দিয়ে মারার চিহ্ন আছে। হাতে ও পায়ের নখে মারার চিহ্ন আছে। পিঠে লাঠি দিয়ে মারার অসংখ্য গুরুতর আঘাত আছে। চোখ দু'টি গর্তে ঢোকানো, চোখের পাশেও কালো দাগ আছে। শরীরে জ্বর ও মাথায় প্রচুর ব্যথা রয়েছে। হাসপাতাল থেকে আসার পরেও সেগুলো যায়নি।'
আদালত কক্ষে বিচারকের মুখে এই বর্ণনা শুনে উপস্থিত আইনজীবীরা উত্তেজিত হয়ে পড়েন।
বিচারক মোহনার জবানবন্দির আরও লোমহর্ষক অংশ পাঠ করেন, যেখানে বলা হয়েছে— খুন্তি দিয়ে মারধর ও চোখে মরিচের গুঁড়ো দেওয়া হতো। বাথরুমে লুকিয়ে রাখা হতো এবং খাবার দেওয়া হতো না। বাথরুমে পানির মধ্যে থাকতে থাকতে পায়ে পচন ধরে গিয়েছিল। শীতে পোশাক দেওয়া হয়নি, এমনকি সে টয়লেটের পানি ও পেস্ট খেয়ে বেঁচে ছিল। বাঁশ ও লাঠি দিয়ে নিয়মিত মারধর করা হতো।'
এ সময় এজলাসে উপস্থিত এক আইনজীবী দাবি তোলেন, 'ওনারা যে যে নির্যাতন করেছেন, ওনাদের সেই সেই নির্যাতন করা হোক।' অন্য আইনজীবীরাও এতে সমর্থন জানান।
শুনানি শেষে আদালত সাবেক সিইও সাফিকুর রহমানের ৫ দিন, তার স্ত্রী বিথীর ৭ দিন এবং দুই গৃহকর্মী রুপালী খাতুনের ৫ দিন ও সুফিয়া বেগমের ৬ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
