উন্নয়ন প্রকল্পকে লুটপাটের সিঁড়িতে পরিণত করা হয়েছে, এই অবস্থার পরিবর্তনই আমাদের লক্ষ্য: জামায়াত আমির
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান দুর্নীতির প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেছেন, অতীতের শাসকগোষ্ঠী রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও প্রতিষ্ঠানকে দলীয় ও ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করেছে। উন্নয়ন প্রকল্পকে লুটপাটের সিঁড়িতে পরিণত করা হয়েছে। এই অবস্থার পরিবর্তনই আমাদের অন্যতম লক্ষ্য।
সোমবার সন্ধ্যায় বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত ভাষণে তিনি এ কথা বলেন। এ সময় আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে 'নতুন বাংলাদেশ' গড়ার এক মহাসুযোগ হিসেবেও উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি আরও বলেছেন, দেশ একটি ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে এবং এই পরিবর্তন বাস্তবায়নে জনগণের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত ও অংশগ্রহণ প্রয়োজন।
ভাষণের শুরুতে তিনি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। একই সঙ্গে জুলাই আন্দোলনে আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, "জুলাই গণ-অভ্যুত্থান সম্ভব হয়েছিল কারণ পুরো দেশ এক হয়েছিল। তরুণ, শ্রমিক, নারী, পেশাজীবী ও বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির ঐক্যই জুলাইকে সম্ভব করেছে।"
তিনি বলেন, জুলাই কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি দীর্ঘদিনের বৈষম্য, পরিবারতন্ত্র, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও ভোটাধিকার হরণের বিরুদ্ধে জনগণের বিস্ফোরণ। বিশেষ করে ২০০৯ সালের পর থেকে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও নির্বাচন ব্যবস্থাকে 'তামাশায়' পরিণত করার মাধ্যমে জনগণকে তাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।
জামায়াত আমির বলেন, দেশের তরুণ প্রজন্ম এখন 'বাংলাদেশ ২.০' দেখতে চায়, যা হবে একটি ন্যায়ভিত্তিক, আধুনিক ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র। এই তরুণরা সাহসী, মেধাবী ও প্রযুক্তিবান্ধব। ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ তারাই গড়বে।
রাষ্ট্র সংস্কার প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান জানান, জুলাই-পরবর্তী সরকার কিছু কাঠামোগত সংস্কার উদ্যোগ নিলেও অনেক পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি বা প্রাথমিক পর্যায়ে রয়ে গেছে। এসব সংস্কার প্রক্রিয়া স্থায়ী ও সাংবিধানিক ভিত্তি দিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোটের আয়োজন করা হয়েছে। তিনি জনগণকে গণভোটে 'হ্যাঁ' ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান।
ভাষণে তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামী নীতিনির্ধারণে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পলিসি সামিট আয়োজন করেছে এবং নির্বাচনি ইশতেহারে সেসব প্রতিফলিত হয়েছে। দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ ও সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের মতামতের ভিত্তিতে এই ইশতেহার প্রণয়ন করা হয়েছে।
নারী অধিকার বিষয়ে তিনি বলেন, নারীর মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে সমাজ কখনো সমৃদ্ধ হতে পারে না। জামায়াত ক্ষমতায় এলে নারীরা ঘরের বাইরে ও রাষ্ট্র পরিচালনায় সমান মর্যাদায় নেতৃত্ব দেবেন।
সংখ্যালঘু ও মানবাধিকার প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ সবার দেশ—মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান সবার। ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নির্যাতনের চেষ্টা হলে তা প্রতিরোধ করা হবে বলে অঙ্গীকার করেন তিনি।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও জলবায়ু ইস্যুতে তিনি সমমর্যাদাভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তনে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদারের কথা বলেন। প্রবাসীদের জন্য সংসদে প্রতিনিধিত্ব ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির বিষয়েও পরিকল্পনার কথা জানান।
জামায়াত আমির আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচনে জামায়াত ও ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীদের প্রতি সমর্থন চেয়ে বলেন, "রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব হলো আমানত। আমরা ইনসাফ ও জবাবদিহির ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনার অঙ্গীকার করছি।"
