২০ দিনে ৬০ জনসভা, কল্যাণরাষ্ট্র গঠন ও কর্মজীবী নারীদের নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি জামায়াত আমিরের
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী আমির ডা. শফিকুর রহমান মঙ্গলবার সকাল (১০ ফেব্রুয়ারি) তার দেশব্যাপী ব্যাপক নির্বাচনি প্রচারণা শেষ করবেন। এর মধ্য দিয়ে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও রাষ্ট্র সংস্কারবিষয়ক গণভোটকে সামনে রেখে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের মাঠপর্যায়ের নির্বাচনি কার্যক্রমের ইতি টানা হবে।
২০ দিনের টানা প্রচারণায় ডা. শফিকুর রহমান জোটের প্রধান মুখ হিসেবে আবির্ভূত হন। তিনি দেশের সব বিভাগে ৬০টির বেশি জনসভায় বক্তব্য দেন এবং কার্যত জোটের ডি ফ্যাক্টো নেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
তার বক্তব্যগুলোতে ধারাবাহিকভাবে নির্বাচনকে একটি সন্ধিক্ষণ হিসেবে তুলে ধরা হয়, যার মাধ্যমে তিনি 'নতুন বাংলাদেশ' বাস্তবায়নের আহ্বান জানান—যা তার ভাষায় কাঠামোগত সংস্কার ও কল্যাণমুখী শাসনব্যবস্থার ওপর দাঁড়িয়ে থাকবে।
ডা. শফিকুর রহমান ২২ জানুয়ারি ঢাকায় নিজের নির্বাচনি এলাকা থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচারণা শুরু করেন। পরদিন উত্তরাঞ্চলের জেলা পঞ্চগড় থেকে দেশব্যাপী সফর শুরু করেন তিনি। তার সফরসূচিতে উত্তরাঞ্চলের দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, রংপুর ও বগুড়া জেলার পাশাপাশি দক্ষিণ ও মধ্যাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা অন্তর্ভুক্ত ছিল।
জনসভাগুলোতে তিনি জোট-সমর্থিত প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেন এবং তাদের হাতে দলীয় প্রতীক তুলে দেন। একই সঙ্গে তিনি বারবার জোর দেন, রাজনৈতিক ক্ষমতা যেন কোনো পরিবার বা অভিজাত গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত না থাকে।
এসব জনসভার কয়েকটিতে বিপুল জনসমাগম দেখা যায়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তরুণদের নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনার বিদায়ের পর যে রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে, জামায়াত দ্রুত সেই শূন্যতা পূরণ করেছে এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রধান শক্তিগুলোর একটি হিসেবে উঠে এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগের দমন-পীড়নের চেষ্টার পরও জামায়াত কৌশলগতভাবে তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠিত কার্যক্রম চালিয়ে গেছে। ফলে এখন দলটি ক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবিদার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে—এবং এবারের নির্বাচন হয়তো কয়েক দশকের মধ্যে দলটির জন্য সবচেয়ে বড় সুযোগ।
এমন মূল্যায়ন আরও জোরালো হয় দেশের বড় কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত পাঁচটি ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে, যেখানে জামায়াতের ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির ভূমিধস বিজয় অর্জন করে।
ডা. শফিকুর রহমানের প্রচারণার একটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল রাষ্ট্র সংস্কারবিষয়ক গণভোটে জনগণকে 'হ্যাঁ' ভোট দেওয়ার সরাসরি আহ্বান।
যেখানে কিছু বড় দল এ বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান নিতে এড়িয়ে গেছে, সেখানে জামায়াত আমির ধারাবাহিকভাবে গণভোটকে তার ভাষায় কর্তৃত্ববাদী রাজনৈতিক কাঠামো ভেঙে দেওয়ার একটি অপরিহার্য অংশ হিসেবে তুলে ধরেন।
দক্ষিণাঞ্চলের জেলা বরিশালে এক জনসভায় তিনি বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির প্রথম ভোট—অর্থাৎ গণভোট—প্রস্তাবিত সংস্কারের ওপর জনগণের রায় হিসেবে কাজ করবে। তিনি এটিকে জুলাই আন্দোলনের চেতনা ও প্রস্তাবিত জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পথ বলে উল্লেখ করেন।
নারীর অধিকার, বিশেষত কর্মজীবী নারীদের বিষয়ে জামায়াতের কঠোর অবস্থান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে। তবে নির্বাচনের প্রাক্কালে দলটি তাদের রক্ষণশীল ভাবমূর্তি কিছুটা নরম করার চেষ্টা করছে এবং সামাজিক ন্যায়বিচার, সুশাসন ও দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানকে বারবার সামনে এনেছে।
দিনাজপুরে এক জনসভায় জামায়াত আমির বলেন, ক্ষমতায় গেলে ঘরে ও কর্মক্ষেত্রে নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
তিনি কর্মজীবী নারীদের অংশগ্রহণের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, নারীদের দক্ষতা অনুযায়ী জাতীয় উন্নয়নে অবদান রাখার সুযোগ সৃষ্টি করা হবে।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে জামায়াত একটি প্রযুক্তিনির্ভর 'এগ্রো-রেভ্যুলেশন'-এর রূপরেখা তুলে ধরে, যার লক্ষ্য দীর্ঘদিন অবহেলিত উত্তরাঞ্চলকে জাতীয় শিল্পের চালিকাশক্তিতে রূপান্তর করা।
এর মধ্যে রয়েছে তিস্তা মহাপরিকল্পনার দ্রুত বাস্তবায়ন এবং বিশেষায়িত খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র স্থাপন, যাতে কৃষকরা কাঁচা পণ্য উৎপাদনের পর সেটি উচ্চমূল্যের রপ্তানিমুখী পণ্যে রূপান্তর ঘটাতে পারেন।
লালমনিরহাটে এক জনসভায় ডা. শফিকুর রহমান বলেন, তিস্তা নদীকে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের চালিকাশক্তিতে পরিণত করা সম্ভব।
তিনি রাজস্ব ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেন। উচ্চ করহার ও অস্বচ্ছ ব্যবস্থার পরিবর্তে একটি স্বচ্ছ, ডিজিটালভিত্তিক করব্যবস্থার কথা বলেন তিনি।
বেকার ভাতার ধারণা প্রত্যাখ্যান করে জামায়াত আমির বলেন, কাজের মাধ্যমেই মানুষের মর্যাদা নিশ্চিত করা হবে। এ লক্ষ্যে এসএমই ও উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর শিল্পায়নের মাধ্যমে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির অঙ্গীকার করেন তিনি।
৪ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত জামায়াতের ইশতেহারে শিক্ষাখাতে জিডিপির পাঁচ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। বিশেষভাবে উচ্চশিক্ষা সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যাতে তা বৈশ্বিক শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।
দলটি এমন একটি কর্মসংস্থান-সংযুক্ত পাঠ্যক্রমের কথা বলেছে, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার সঙ্গে বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ ও কারিগরি প্রশিক্ষণ যুক্ত থাকবে—যাতে শিক্ষার্থীরা কেবল সনদ নয়, বাস্তব দক্ষতা নিয়ে বের হতে পারে।
স্বাস্থ্যখাতেও জামায়াত আমির একটি বড় প্রতিশ্রুতি দেন।
তিনি সার্বজনিক স্বাস্থ্যসেবার অঙ্গীকার করেন, যার মধ্যে জাতীয় স্বাস্থ্য কার্ড ব্যবস্থা ও স্বাস্থ্যবীমা চালুর কথা রয়েছে। এর মাধ্যমে স্বল্পমূল্যে বা বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা হবে, বিশেষ করে পাঁচ বছরের নিচের শিশু ও ষাটোর্ধ্ব নাগরিকদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জামায়াতে ইসলামী জুলাইয়ের চেতনাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার কথা বলেছে এবং অতীতের অন্যায়-অবিচারের শান্তিপূর্ণ সমাধানের ওপর জোর দিয়েছে।
দলটি জাতিসংঘের কারিগরি সহায়তায় এবং একটি উচ্চপর্যায়ের জাতীয় টাস্কফোর্সের মাধ্যমে একটি ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক 'ট্রুথ অ্যান্ড হিলিং কমিশন' গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে, যা গত ১৫ বছরে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘন ও গুমের ঘটনা তদন্ত করবে।
তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করতে প্রচারণায় ভিন্নধর্মী কৌশলও গ্রহণ করা হয়, যার মধ্যে বড় শহরগুলোতে পপ-কালচার অনুপ্রাণিত পোস্টার ব্যবহারের বিষয়টি উল্লেখযোগ্য।
এখন প্রচারণা বন্ধের সময় শুরু হওয়ায় সবারই নজর সরে যাচ্ছে ব্যালট বাক্সের দিকে। তাতেই দেখা যাবে, জোটের ব্যাপক মাঠপর্যায়ের প্রচারণা ও সংস্কারভিত্তিক এই বার্তা ভোটে কতটা প্রতিফলিত হয়।
