রমজানে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে বড় আমদানিকারক ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার দাবি ব্যবসায়ীদের
আসন্ন রমজান মাস ও জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে নিত্যপণ্যের দাম সহনীয় রাখতে সাধারণ খুচরা ব্যবসায়ীদের অহেতুক হয়রানি না করে বড় বড় আমদানিকারক ও 'মেগা মহাজনদের' ওপর নজরদারি এবং বাজার অস্থিতিশীল হওয়ার পেছনে পুলিশ ও প্রশাসনের একাংশের 'ম্যাক্রো লেভেলের' চাঁদাবাজিকে দায়ী করে তা বন্ধের দাবি জানিয়েছে ব্যবসায়ীরা।
রমজান উপলক্ষে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি, মজুদ, সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতি পর্যালোচনায় সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) মতিঝিলে এফবিসিসিআই ভবনে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই আয়োজিত মতবিনিময় সভায় এ দাবি জানান নিত্যপণ্যের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ী নেতারা।
এতে সভাপতিত্ব করেন এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. আবদুর রহিম খান।
এসময় আবদুর রহিম খান বলেন, 'প্রতি বছরের মতো এবারও রমজানে পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক ও মূল্য সহনীয় রাখতে এফবিসিসিআই বাজার তদারকি করবে, যাতে ব্যবসায়ীদের সহযোগিতায় সাধারণ ভোক্তারা ন্যায্যমূল্যে পণ্য পেতে পারেন।'
তিনি আরও বলেন, 'গত বছরের তুলনায় এবার এলসি খোলার পরিমাণ অনেক বেশি, যা বাজারের স্থিতিশীলতার লক্ষণ।'
কোনো ধরনের অনভিপ্রেত বা অস্বাভাবিক আচরণের মাধ্যমে যেন বাজারের সাপ্লাই চেইন কোনোভাবেই ব্যাহত না হয়, সে বিষয়ে তিনি সবাইকে সতর্ক ও সংযত থাকার অনুরোধ করেন।
বাংলাদেশ কাঁচামাল আড়তদার মালিক সমিতি সভাপতি মোহাম্মদ ইমরান মাস্টার বলেন 'কাঁচামাল পচনশীল পণ্য, এখানে সিন্ডিকেট করা সম্ভব নয়। পেঁয়াজ, মরিচ, বেগুন ও ধনেপাতার সরবরাহ পর্যাপ্ত আছে। চাহিদা হঠাৎ বেড়ে গেলে রমজানের প্রথম কয়েকদিন দাম সামান্য বাড়তে পারে, তবে তা দীর্ঘস্থায়ী হবে না। লেবু নিয়ে হয়তো একটু সংকট হতে পারে, তবে সামগ্রিকভাবে কোনো বড় ঘাটতি নেই।'
বাংলাদেশ পাইকারি ভোজ্যতেল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক গোলাম মওলা বলেন, 'রমজান এলেই এনএসআই, ডিজিএফআই বা জেলা প্রশাসন ক্ষুদ্র দোকানগুলোতে হানা দেয়। আট আনা বা এক টাকা বেশিতে বিক্রির অভিযোগে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের লাখ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। অথচ যারা শত শত কোটি টাকা লোপাট করছে, সেই বড় আমদানিকারক বা মিল গেটে কোনো নজরদারি নেই। নজরদারিটা উচ্চ পর্যায়ে নিশ্চিত করতে হবে।'
বাজার পর্যবেক্ষক কাজী আব্দুল হান্নান বলেন, 'আসন্ন রমজান ও নির্বাচনের ট্রানজিশন পিরিয়ডে বড় ধরনের চাঁদাবাজির আশঙ্কা রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, জেলা-উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশকে কোনো কোনো বাজার থেকে ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত থোক চাঁদা তুলে দিতে হয়। এই চাঁদাবাজির সরাসরি প্রভাব পড়ে পণ্যের দামের ওপর।'
পোল্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের উপদেষ্টা খন্দকার মনির আহমেদ খামারিদের দুরবস্থার চিত্র তুলে ধরে বলেন, 'উৎপাদন খরচের চেয়ে বিক্রয়মূল্য কম হওয়ায় খামারিরা এখন কবরের কাছাকাছি। ১০ টাকা ৫৮ পয়সা উৎপাদন খরচের বিপরীতে খামারিরা ৫-৬ টাকায় ডিম বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।'
সরকারের সুলভ মূল্যের ডিম বিক্রির সমালোচনা করে তিনি বলেন, 'উৎপাদন খরচের নিচে দাম নির্ধারণ করলে এই শিল্প ধ্বংস হয়ে যাবে।'
কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব)-সাধারণ সম্পাদক মো. হুমায়ূন কবির ভূঁইয়া বলেন, 'রমজান উপলক্ষে ঢাকা মহানগরে প্রতিদিন ১০টি টিম বাজার তদারকি করবে।'
ব্যবসায়ীদের প্রতি ক্যাশ মেমো সংরক্ষণ এবং যৌক্তিক লাভে পণ্য বিক্রির আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, 'অসাধু উপায়ে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারীদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।'
ব্যবসায়ীরা খেজুরের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক প্রত্যাহার এবং হিমায়িত মাংস আমদানির মাধ্যমে প্রোটিনের ঘাটতি মেটানোরও প্রস্তাব দেন।
সভায় বক্তারা একমত হন যে সঠিক তদারকি এবং চাঁদাবাজি বন্ধ করা গেলে এবার রমজানে পণ্যের দাম বাড়ার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই।
মেঘনা গ্রুপের উপ-মহাব্যবস্থাপক তসলিম শাহরিয়ার বলেন, 'চিনির বাজারে কোনো সমস্যা নেই, আমরা রেকর্ড পরিমাণ পণ্য সরবরাহ করছি। গত বছরের ১৩০ টাকার চিনি এখন মিল গেটে ৯২-৯৩ টাকা। আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামা থাকলেও পাইপলাইনে যথেষ্ট পণ্য আছে। দীর্ঘ ছুটি ও পোর্টের কিছু জটিলতা থাকলেও ইনশাআল্লাহ রমজানে বাজার স্থিতিশীল থাকবে।'
এফবিসিসিআই সাবেক পরিচালক গিয়াস উদ্দিন খোকন বলেন, 'ব্যবসায়িক পরিবেশ এখন অত্যন্ত কঠিন। শিল্পে গ্যাস সংযোগ পেতে ৫ কোটি টাকা ঘুষ চাওয়া হয়। ব্যাংক সুদের হার কমানোর কথা থাকলেও তা উল্টো বেড়েছে। পদে পদে চাঁদা, ঘুষ আর হয়রানি বন্ধ না হলে ব্যবসায়ীদের পক্ষে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না। বাজার মনিটরিং আরও আগে শুরু করা উচিত ছিল।'
মতবিনিময় সভায় সরকারি, বেসরকারি, ব্যবসায়ী মালিক সমিতি, ও বিভিন্ন অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
