লিখিত পরীক্ষা ছাড়া শুধু মৌখিক নিয়েই জুলাই স্মৃতি জাদুঘরে জনবল নিয়োগের উদ্যোগ
প্রথম শ্রেণির পদসহ সব পদে লিখিত পরীক্ষা ছাড়াই জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরে জনবল নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে সংস্থাটির চাকরি প্রবিধানমালা অনুসরণ করা হয়নি বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
তবে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের মহাপরিচালক তানজিম ওয়াহাব বলেছেন, 'শতভাগ নিয়ম অনুসরণ করেই নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।'
সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, গত ২৮ জানুয়ারি তারিখে ২০ গ্রেড থেকে ৬ গ্রেড পর্যন্ত মোট ৬২টি পদে ৯৬ জন নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে জাদুঘর কর্তৃপক্ষ। এসব পদে ৪ ফেব্রুয়ারি বিকাল ৫টা পর্যন্ত অনলাইনে আবেদন নেওয়া হয়। শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী কয়েক হাজার প্রার্থী আবেদন করেছেন।
মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, সদ্য স্থাপিত এই জাদুঘরে প্রথম শ্রেণির পদসহ সব পদে লিখিত পরীক্ষা ছাড়াই শুধু মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে রাজস্ব খাতে সৃষ্ট পদে নিয়োগ দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
'জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর (কর্মকর্তা ও কর্মচারী) চাকরি প্রবিধানমালা ২০২৫' অনুযায়ী, বিভিন্ন পদে নিয়োগে লিখিত পরীক্ষা বাধ্যতামূলক। এতে বাংলা, ইংরেজি, গণিত ও সাধারণ জ্ঞান বা প্রাসঙ্গিক টেকনিক্যাল বিষয়ের ওপর পরীক্ষা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে এবং ন্যূনতম ৫০ শতাংশ নম্বর পাওয়ার শর্ত রয়েছে। লিখিত ও ব্যবহারিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের মৌখিক পরীক্ষার জন্য যোগ্য বিবেচনা করার বিধানও রয়েছে।
তবে একই প্রবিধানমালায় বলা আছে, বিশেষায়িত জাদুঘর হওয়ায় বিশেষ যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তির ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ নিয়োগের যেকোনো শর্ত শিথিল করতে পারবে। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতেও এই শর্ত উল্লেখ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই ধারার সুযোগ নিচ্ছে কর্তৃপক্ষ।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে তানজিম ওয়াহাব বলেন, "জুলাই জাদুঘরের নিয়োগের বিধিমালার সব নিয়মনীতি শতভাগ মেনেই কাজ করা হচ্ছে।" লিখিত পরীক্ষা বাধ্যতামূলক থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, "প্রবিধানমালার ধারা ৩-এর উপধারা ৩ অনুযায়ী বিশেষ যোগ্যতার ক্ষেত্রে শর্ত শিথিল করা যায়।"
তিনি আরও জানান, এই নিয়োগ প্রক্রিয়া রাষ্ট্রপতি অনুমোদন করেছেন। দ্রুত জাদুঘর চালু করার স্বার্থে লিখিত পরীক্ষার পরিবর্তে মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে স্বল্প সময়ে প্রার্থীদের প্রশাসনিক দক্ষতা, যোগাযোগক্ষমতা ও উপস্থিত বুদ্ধি যাচাই করে নিয়োগ সম্পন্ন করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সে অনুযায়ীই মৌখিক পরীক্ষার ভিত্তিতে নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, "এসব পদ রাজস্ব খাতে সৃষ্ট। রাজস্ব পদে লিখিত পরীক্ষা ছাড়া নিয়োগ দেওয়া প্রশাসনিক রীতির পরিপন্থী এবং এতে ভবিষ্যতে নিয়োগ বাতিলের ঝুঁকি থাকে।"
তার মতে, "শুধুমাত্র ভাইভা গ্রহণযোগ্য নির্বাচন পদ্ধতি নয়, বিশেষ করে প্রথম শ্রেণির পদের ক্ষেত্রে লিখিত পরীক্ষা বাদ দেওয়া স্বাভাবিক নয়। এতে নিয়োগের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।"
এদিকে, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ফলে এর আগে এ ধরনের নিয়োগ কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, অন্তর্বর্তী সময়ে দ্রুত নিয়োগ শেষ করার চাপ থাকায় লিখিত পরীক্ষার ধাপ এড়িয়ে মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে প্রার্থী বাছাইয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, নিয়োগ চূড়ান্ত করার আগেই কিছু নাম 'চূড়ান্ত তালিকায়' ধরে নেওয়া হয়েছে।
লিখিত পরীক্ষা ছাড়া সীমিতসংখ্যক প্রার্থীকে মৌখিক পরীক্ষায় ডাকার বিষয়টিও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। একাধিক আবেদনকারী জানিয়েছেন, তারা কোনো এসএমএস বা প্রবেশপত্র পাননি। এতে নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, লিখিত পরীক্ষা ছাড়া মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে প্রার্থী বাছাই করলে নম্বর কারচুপি ও পক্ষপাতের সুযোগ তৈরি হয়—যা মেধাভিত্তিক নিয়োগ নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান টিবিএসকে বলেন, প্রথম শ্রেনির পদসহ যেসকল পদে চাকরি প্রবিধানমালায় লিখিত পরীক্ষা নেওয়ার বিধান রয়েছে, সেখানে লিখিত পরীক্ষা ছাড়া শুধুমাত্র বিশেষ প্রতিষ্ঠানের অজুহাতে মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সরকারের এ ধরনের পদক্ষেপের মাধমে অস্বচ্ছতা, কর্তৃত্বপরায়নতা ও জবাবদিহিনতা প্রকাশ পায়। এই প্রতিষ্ঠানটি জাতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। এখানে জনবল নিয়োগসহ সব ধরনের কার্যক্রম যথাযথভাবে নিয়ম অনুসরণ করে করা উচিত। শুরুতেই নিয়ম বাইপাস করে করা হলে সেটি খারাপ উদাহরণ হবে।
তিনি বলেন, সকলেই চায় এই প্রতিষ্ঠানটি দ্রুত চালু হোক। কিন্তু দ্রুততার জন্য জনগণের অর্থে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানে নিয়ম এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। সরকার হয়তো এটি চালু করে লিগ্যাসি সৃষ্টি করবে, কিন্তু সেটি নেগেটিভ লিগ্যাসি হবে।
