বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সহজ করতে সমন্বয় সংস্কারে জোর অন্তর্বর্তী সরকারের
বিনিয়োগ ও বাণিজ্য প্রক্রিয়া সহজ করতে সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদারের মাধ্যমে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার। সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছে সরকার।
বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত 'বিনিয়োগ সমন্বয় কমিটির' সপ্তম সভায় এ তথ্য জানানো হয়। সভায় সরকারের ঊর্ধ্বতন নীতিনির্ধারক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিরা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসন, সেবার ডিজিটালাইজেশন এবং বিনিয়োগ দ্রুত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে গৃহীত সংস্কার কার্যক্রম পর্যালোচনা করেন।
কমিটির সভাপতি ও প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী বলেন, 'প্রক্রিয়াগত উন্নয়ন আমাদের প্রতিযোগিতার সক্ষমতাকে উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী করতে পারে এবং সাধারণ মানুষের জীবিকায় সরাসরি ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।'
তিনি আরও যোগ করেন, 'শুল্ক কাঠামো বা আন্তর্জাতিক বাজারের মতো বাহ্যিক বিষয়গুলোর ওপর আমাদের নিয়ন্ত্রণ সীমিত হলেও, নিজেদের নীতি ও পদ্ধতির ওপর আমাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। এক্ষেত্রে কর্মদক্ষতা বাড়ানো গেলে তার সুফল হবে তাৎক্ষণিক, দৃশ্যমান এবং সুদূরপ্রসারী।'
সভায় অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বিডা , বেজা ও পিপিপি কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী; বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর; চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সচিব ও প্রধানগণ।
সভায় আলোচিত প্রধান প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে— পণ্য আগমনের আগেই কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স (প্রি-অ্যারাইভাল ক্লিয়ারেন্স) ১০ গুণ বৃদ্ধি করা, ব্যবসা শুরুর প্রক্রিয়া সহজ করতে 'ইউনিফাইড অনলাইন স্টার্ট-আপ প্যাকেজ', চট্টগ্রাম বন্দরে ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল পেমেন্ট সুবিধা এবং একটি পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় বন্ড ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি।
এছাড়া অনুমোদিত বিনিয়োগ প্রস্তাবগুলো যাতে কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তবে রূপ পায়, তা নিশ্চিত করতে একটি বহুপাক্ষিক তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়ে সভায় একমত হয়েছেন কর্মকর্তারা।
সমন্বয় প্রক্রিয়ার সাম্প্রতিক কিছু সাফল্যের চিত্রও সভায় তুলে ধরা হয়। আন্তঃমন্ত্রণালয় জটিলতায় দীর্ঘ বছর আটকে থাকার পর জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) 'ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডো' চালু করেছে। এর ফলে মাত্র কয়েক মাসেই সরকারি দপ্তরে প্রায় ১২ লাখ বার সশরীরে যাতায়াতের প্রয়োজন দরকার পড়েনি।
পাশাপাশি চট্টগ্রাম বন্দরে ট্রাক প্রবেশের স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতির ফলে প্রবেশের সময় অন্তত ৯০ শতাংশ কমেছে। ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও ক্যাশলেস পেমেন্ট ব্যবস্থা বন্দরে স্বচ্ছতা ও গতিশীলতা বৃদ্ধি করেছে।
বিনিয়োগ উন্নয়ন সংস্থাগুলো—বিডা, বেজা, বেপজা এবং হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ—বর্তমানে যৌথভাবে বিনিয়োগের গতিপথ পর্যবেক্ষণ করছে। কর্মকর্তারা জানান, সাম্প্রতিক সময়ে রেকর্ড সংখ্যক জমি ইজারা চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। বিশেষ করে চীন, তুরস্ক ও দক্ষিণ কোরিয়ায় সাম্প্রতিক বিনিয়োগ প্রচারণার ফলে বড় ধরনের বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে।
তবে কমিটি কিছু স্থায়ী চ্যালেঞ্জের কথাও তুলে ধরে। ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু থাকলেও কিছু দপ্তরে এখনো সমান্তরালভাবে অফলাইন প্রক্রিয়া চালু রয়েছে, যার পেছনে ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতা ও সিস্টেম ব্যবহারের দুর্বল নজরদারিকে দায়ী করা হয়।
লুৎফে সিদ্দিকী এক্ষেত্রে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) ডিজিটাল আবেদন ও পেমেন্ট সিস্টেমকে একটি আদর্শ উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান জানান, ব্যবহারকারীদের অনলাইন প্ল্যাটফর্মে অভ্যস্ত করতে তারা বন্দরে বিশেষ 'এজেন্ট ডেস্ক' স্থাপন করেছেন।
আগামী দিনের অগ্রাধিকার হিসেবে বিডা-র 'বাংলাদেশ বিজনেস পোর্টাল'-এর প্রথম সংস্করণ চালু এবং চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসে পণ্য পরীক্ষা কমাতে 'অটোমেটেড রিস্ক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম' পাইলট প্রকল্পের কথা জানানো হয়।
প্রি-অ্যারাইভাল ক্লিয়ারেন্সের গুরুত্ব তুলে ধরে লুৎফে সিদ্দিকী বলেন, 'নিয়মগুলো আগে থেকেই আছে, অভাব শুধু সুশৃঙ্খল বাস্তবায়নের। যেখানে ৫০ শতাংশের বেশি পণ্য প্রি-ক্লিয়ারেন্স হওয়ার কথা, সেখানে ৫ শতাংশের কম হওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।'
সভায় অংশগ্রহণকারীরা বিনিয়োগ সমন্বয় কমিটির এই তথ্যনির্ভর ও কর্মমুখী পদ্ধতির প্রশংসা করেন। তারা সরকারের এই কার্যপদ্ধতিকে একটি 'শৈল্পিক সংস্কার' হিসেবে অভিহিত করেন, যেখানে ফলাফল ও বাস্তবায়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
