স্থানীয় সুতা ব্যবহারে নগদ প্রণোদনা অথবা বন্ড সুবিধা স্থগিত—দুই বিকল্প নিয়ে ভাবছে সরকার
দেশের স্পিনিং ও টেক্সটাইল মিলগুলোর চলমান সংকট নিরসনে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সুতা ব্যবহারে নগদ প্রণোদনা দেওয়া অথবা সাময়িকভাবে বন্ডেড আমদানি সুবিধা স্থগিত করার বিষয়টি বিবেচনা করছে সরকার।
এ বিষয়ে নীতিগত বিকল্পগুলো নিয়ে গত মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) রাজধানীতে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বাণিজ্য উপদেষ্টার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে তৈরি পোশাক (আরএমজি) ও টেক্সটাইল খাতের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় একাধিক সহায়তামূলক পদক্ষেপ নিয়ে কাজ করলেও আগামী ৩ ফেব্রুয়ারি অর্থ উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকের পর এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে টিবিএসকে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মাহবুবুর রহমান দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "আমরা স্থানীয় সুতা ব্যবহারের ওপর প্রণোদনা দেওয়া এবং সাময়িক সময়ের জন্য আমদানিতে ডিবন্ডিং করার মতো বিকল্প নিয়ে ভাবছি। এর বাইরে আরও একটি বিকল্পও বিবেচনায় আছে।"
তিনি বলেন, "এর মধ্যে যেকোনো একটি বাস্তবায়ন করা হতে পারে। ৩ ফেব্রুয়ারি অর্থ বিভাগে এ বিষয়ে বৈঠক হবে। এর পর সিদ্ধান্ত আসতে পারে।"
তিনি আরও বলেন, "গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল—দুটিই আমাদের জন্য প্রধান খাত। তাদের স্বার্থ বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।"
কারখানা বন্ধের সিদ্ধান্ত সাময়িক স্থগিত করেছে বিটিএমএ
এদিকে, সরকারের ইতিবাচক মনোভাবের আশ্বাস পেয়ে ১ ফেব্রুয়ারি থেকে স্পিনিং মিল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ)।
বৃহস্পতিবার এক বিজ্ঞপ্তিতে সংগঠনটি জানায়, সরকারের আশ্বাস ও আলোচনায় গঠনমূলক অগ্রগতি বিবেচনায় রেখে এবং আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটসহ সামগ্রিক জাতীয় প্রেক্ষাপটের কথা মাথায় রেখে ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ থেকে সব টেক্সটাইল মিল বন্ধের পূর্বঘোষিত কর্মসূচি সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, বাণিজ্য উপদেষ্টা শিল্প সংশ্লিষ্টদের উত্থাপিত উদ্বেগের যৌক্তিকতা স্বীকার করেছেন এবং বাংলাদেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতা ও শিল্প মূল্যশৃঙ্খলে স্পিনিং খাতের কৌশলগত গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছেন।
এদিকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এমন একটি প্রস্তাবও পেয়েছে, যেখানে তৈরি পোশাক খাতে বিদ্যমান ০.৩০ শতাংশ নগদ প্রণোদনার অর্থ এই খাত থেকে কর্তন করে স্থানীয় সুতা ব্যবহারের শর্তে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন বিশেষজ্ঞ টিবিএসকে বলেন, বর্তমানে পোশাক খাতে ০.৩০ শতাংশ প্রণোদনা হিসেবে সরকার বছরে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়। ওই অর্থের সঙ্গে অতিরিক্ত কিছু তহবিল যোগ করে স্থানীয় সুতা ব্যবহারের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট হারে প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে।
বন্ড সুবিধা বাতিলের বিরোধিতায় পোশাক রপ্তানিকারকরা
পোশাক শিল্প মালিকদের দাবি, বন্ডেড আমদানি সুবিধা বাতিলের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে। এতে বাংলাদেশের প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানিনির্ভর এই খাত আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে।
ডিবন্ড করা বা বন্ড সুবিধা বাতিলের প্রস্তাবের বিরোধিতা করে পোশাক রপ্তানিকারকরা জানিয়েছেন, এ ধরনের পদক্ষেপ কাঁচামাল সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের ব্যাঘাত সৃষ্টি করবে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান টিবিএসকে বলেন, "আমাদের প্রস্তাব হলো টেক্সটাইল শিল্পকে বাঁচাতে হবে। এর জন্য সরকার চাইলে প্রণোদনা দিতে পারে। কিন্তু আমাদের কাঁচামালের সাপ্লাই চেইন যেন কোনোভাবেই বাধাগ্রস্ত না হয়।"
গত ১২ জানুয়ারি সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা বাতিলের জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) সুপারিশ পাঠায়। এর পরই বিষয়টি নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায় পোশাক রপ্তানিকারকরা।
বন্ড সুবিধা বাতিল হলে সুতা আমদানিতে প্রায় ৩৭ শতাংশ আমদানি কর দিতে হবে বলে জানান খাত সংশ্লিষ্টরা। এত বেশি কর দিয়ে সুতা আমদানি করে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব হবে না। সে ক্ষেত্রে রপ্তানিকারকরা বাধ্য হয়ে স্থানীয় সুতা কিনবেন, যা আমদানির তুলনায় কিছুটা বেশি দামে নিতে হবে।
এ অবস্থায় তীব্র আপত্তির মুখে সরকার ওই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন থেকে সরে আসে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
