সুতা আমদানিতে শুল্ক নিয়ে মুখোমুখি টেক্সটাইল ও পোশাক খাত: সমাধান কোন পথে?
টেক্সটাইল মিল ও গার্মেন্ট (পোশাক) রপ্তানিকারকদের মধ্যে অনেকদিন ধরে চলতে থাকা দ্বন্দ্ব দেশের রপ্তানি অর্থনীতির মূল কেন্দ্রে ফাটল ধরিয়েছে। নীতিনির্ধারকদের বিষয়টি অবহেলা বা ভুলভাবে পরিচালনার কোনো সুযোগ নেই।
এই সংকটের আশু কারণ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একটি চিঠি, যেখানে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধার আওতায় সুতা আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা বাতিল করতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) বলা হয়েছে। মন্ত্রণালয় মনে করছে, শুল্কমুক্ত আমদানির কারণে স্থানীয় স্পিনিং মিলগুলো অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়েছে এবং দেশীয় উৎপাদনকারীদের সুরক্ষায় এই সুবিধা স্থগিত করা উচিত।
গত ১২ জানুয়ারির সেই অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে এনবিআর এখনও কোনো পদক্ষেপ না নিলেও দুই খাতের প্রতিক্রিয়া ছিল ত্বরিত এবং সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী।
পোশাক রপ্তানিকারকরা এই প্রস্তাবকে 'আত্মঘাতী' বলে উল্লেখ করেছেন। তারা সতর্ক করে বলেন, সস্তায় সুতা আমদানির সুবিধা বন্ধ হলে বিশ্ববাজারে তাদের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অন্যদিকে টেক্সটাইল মিল মালিকরা এই পদক্ষেপকে তাদের জন্য 'লাইফলাইন' হিসেবে দেখছেন এবং অবিলম্বে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) আরও এক ধাপ এগিয়ে হুঁশিয়ারি দিয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকার হস্তক্ষেপ না করলে ১ ফেব্রুয়ারি থেকে তারা দেশের সব মিল বন্ধ রাখবে।
এটি কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী খাতের সংঘাত নয়। বরং এই দুটি শিল্প একে অপরের ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল এবং যৌথভাবে বাংলাদেশের রপ্তানি অর্থনীতির মেরুদণ্ড গড়ে তুলেছে।
গত অর্থবছরে শ্রমঘন পোশাক খাত প্রায় ৩৯ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে, যা দেশের মোট পণ্য রপ্তানির প্রায় ৮৫ শতাংশ। অন্যদিকে পোশাক কারখানাগুলোতে সুতা ও কাপড় সরবরাহ করে প্রায় ২৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগে গড়ে ওঠা পুঁজিঘন টেক্সটাইল খাত। দুটি খাতেই লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। উভয় খাতই ব্যাংকঋণের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল এবং বিশ্ববাজারের যেকোনো বড় ধাক্কায় অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকে।
বাণিজ্য ও শুল্ক বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, ব্যবসায়িক আস্থা যখন এমনিতেই নড়বড়ে এবং বিনিয়োগকারীরা ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতির স্বচ্ছতার জন্য অপেক্ষা করছেন, তখন এমন বৈরী অবস্থান বৃহত্তর অর্থনীতিকে অস্থিতিশীল করার ঝুঁকি তৈরি করছে। তারা বলেন, এক পক্ষের ক্ষতি করে অন্য পক্ষকে সহায়তা সমর্থন দিলে পুরো ভ্যালু চেইন আরও গভীর সংকটে পড়তে পারে।
যেভাবে এই অচলাবস্থার সূত্রপাত
একসময় সুতা ও ফ্যাব্রিকের জন্য আমদানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল ছিল বাংলাদেশ। তবে গত তিন দশকে বড় বিনিয়োগের ফলে শক্তিশালী 'ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ গড়ে উঠেছে। এর ফলে স্থানীয় উৎপাদনকারীরাই এখন নিটওয়্যারের প্রায় পুরো চাহিদা এবং ওভেন পোশাকের প্রায় অর্ধেক চাহিদা মেটাতে সক্ষম।
গত দুই-তিন বছরে সেই সাফল্য চাপের মুখে পড়েছে। আমদানিকৃত সুতা—মূলত ভারত থেকে আমদনাই করা—সস্তা হওয়ায় পোশাক রপ্তানিকারকরা ক্রমশ আমদানির দিকে ঝুঁকেছেন। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরের পরবর্তী দুই বছরে সুতা আমদানি দ্বিগুণ হয়েছে; এই সরবরাহের শীর্ষে রয়েছে ভারত।
এর ফলে স্থানীয় মিলগুলোর ওপর তীব্র নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। পোশাকের অর্ডার কমে যাওয়ায় স্পিনিং মিলগুলোতে স্বাভাবিকের চেয়ে তিন-চারগুণ বেশি মজুত জমেছে। একইসঙ্গে উৎপাদন ক্ষমতার প্রায় অর্ধেকই অলস পড়ে আছে। এই মন্দার আঁচ উইভিং, ডাইং ও প্রিন্টিংয়েও ছড়িয়ে পড়েছে। এতে প্রায় ২ হাজার টেক্সটাইল ইউনিটের কার্যক্রম বিঘ্নিত হচ্ছে।
মিল মালিকদের কয়েক মাসের অনুরোধের পর সরকার বন্ড লাইসেন্সের আওতায় শুল্কমুক্ত সুতা আমদানিতে লাগাম টানার উদ্যোগ নেয়। প্রস্তাবটি প্রকাশ্যে আসতেই রপ্তানিকারকরা তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান। এর পরপরই বিটিএমএ মিল বন্ধের হুঁশিয়ারি দেয়। এতে এই দুই খাত প্রকাশ্যে বিরোধের দিকে চলে জায়।
বিটিএমএর দাবি, শুল্কমুক্ত আমদানি অব্যাহত রাখা স্থানীয় মিলগুলোর অস্তিত্বের জন্য হুমকি। অন্যদিকে পোশাক প্রস্তুতকারকদের সংগঠন—বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ—পাল্টা যুক্তি দিয়ে বলছে, বন্ড সুবিধা বাতিল করলে উৎপাদন ব্যয় ৮-১০ শতাংশ বেড়ে যাবে। এতে রপ্তানিকারকদের বছরে ২ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি বাড়তি খরচ হবে।
শুল্কমুক্ত সুবিধা না পেলে সুতা আমদানিতে রপ্তানিকারকদের বাড়তি শুল্ক গুনতে হবে প্রায় ৩৭ শতাংশ। ফলে আমদানি করে পোষানো যাবে না। সেক্ষেত্রে বিকল্প হলো স্থানীয় মিলগুলোর কাছ থেকে সুতা কেনা, যার জন্য প্রতি কেজিতে বাড়তি ০.৪০ ডলার থেকে ০.৬০ ডলার পর্যন্ত গুনতে হবে।
বর্তমানে প্রতি কেজি সুতা ভারত থেকে আমদানি করতে খরচ হয় গড়ে ২.৫৫ ডলার। একই সুতা স্থানীয় মিল মালিকরা ২.৮০ ডলারের নিচে বিক্রি করতে পারেন না। স্থানীয় মিল মালিকদের দাবি, এই দরে বিক্রি করলেও তাদের লোকসান হচ্ছে। রপ্তানিকারকদের দাবি, বিদেশি ক্রেতারা এই বাড়তি দাম দেবে না। তবে মিলাররা বলছেন, এই তুলনাটিই অন্যায্য।
স্থানীয় সুতার দাম বেশি কেন
বাংলাদেশের স্পিনিং মিল মালিকদের দাবি, ভারত সরকার তাদের স্পিনিং মিল মালিকদের রপ্তানিতে বিভিন্ন ধরনের সহায়তা ও প্রণোদনা দেয়। এ কারণে তারা প্রায় বাড়তি ০.৩০ ডলার সুবিধা পায়। ওই সুবিধার কারণে তারা স্থানীয় বাজারের তুলনায় বাংলাদেশে সমপরিমাণ দর ছেড়ে দিয়ে বিক্রি করে। অর্থাৎ স্থানীয় বাজারে যে দরে বিক্রি হয়, তার তুলনায় প্রায় ০.৩০ ডলার কম দরে বাংলাদেশে বিক্রি করে, যাকে 'ডাম্পিং' হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন এখানকার টেক্সটাইল মিলাররা।
খাত সংশ্লিষ্টদের প্রাক্কলন অনুসারে, রপ্তানি রিবেট, প্রযুক্তি উন্নয়ন তহবিল, উৎপাদনভিত্তিক প্রণোদনা এবং বিদ্যুৎ, জমি ও অর্থায়নে রাজ্য পর্যায়ের ভর্তুকি মিলিয়ে কেজিতে প্রায় ০.৩০ ডলার সমপরিমাণ সুবিধা পায় ভারতীয় সুতা রপ্তানিকারকরা।
একই সময়ে বাংলাদেশ সহায়তা কমিয়েছে এ খাতের জন্য। যেমন স্থানীয় সুতায় তৈরি পোশাকের জন্য নগদ প্রণোদনা একসময় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত থাকলেও তা কমে এখন মাত্র ১.৫ শতাংশে নেমে এসেছে। তিন বছর আগে গ্যাসের দাম এক লাফে ১৭৯ শতাংশ বাড়ানো হয়েছিল। ব্যাংক ঋণের সুদের হার বেড়ে ১৬ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছেছে; রপ্তানি উন্নয়ন তহবিলের (ইডিএফ) আওতায় কম সুদে ঋণ পাওয়ার সুযোগও কমেছে। এছাড়া আগে করের ক্ষেত্রে যেসব ছাড় দেওয়া হতো, তা-ও বাতিল হয়েছে।
এর বাইরে কিছু স্পিনিং মিল এখনই প্রয়োজন না থাকলেও অতি উচ্চ প্রযুক্তির ও প্রয়োজনের অতিরিক্ত যন্ত্রপাতি আমদানি করে ব্যয় বাড়িয়েছে, যা তাদের জন্য বোঝা হয়েছে। ব্যাংকের দায় বেড়েছে। এর ফলে ভারত ও বাংলাদেশের এ খাতের উদ্যোক্তাদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় ব্যবধান ক্রমেই বাড়ছে।
মধ্যপন্থা কি সম্ভব?
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আমদানিকৃত সুতার ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি তৈরি করে—বিশেষ করে সরবরাহের উৎস সংকুচিত বা এককেন্দ্রিক হয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে। তবে সস্তা কাঁচামাল প্রাপ্তির সুযোগ হুট করে বন্ধ করে দিলে তা ৪০ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ডিস্টিংগুইশড ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সরকারের উচিত ঢালাওভাবে আমদানি নিষেধাজ্ঞা আরোপ না করে নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য কার্যকর সমাধান খোঁজা।
এসব সমাধানের মধ্যে থাকতে পারে সীমিত আকারে নগদ ক্ষতিপূরণ বা সহায়তা, এলডিসি বিধিমালার আওতায় বিশেষ ঋণের সুবিধা, অ্যান্টি-ডাম্পিং তদন্ত, অথবা একটি কোটা ব্যবস্থা যেখানে নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত শুল্কমুক্ত আমদানির সুযোগ থাকবে।
কেউ কেউ বলছেন, তৈরি পোশাক রপ্তানির ওপর সরকারের যে ০.৩ শতাংশ বিশেষ নগদ প্রণোদনা রয়েছে—যার পরিমাণ বছরে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা—তা সরাসরি টেক্সটাইল খাতকে সহায়তার জন্য বরাদ্দ করা যেতে পারে।
বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান এ সংকটের কথা স্বীকার করে বলেন, সরকার বিকল্পগুলো যাচাই-বাছাই করছে।
তিনি টিবিএসকে বলেন, 'টেক্সটাইল শিল্প যে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিছু একটা করতেই হবে। আমরা সম্ভাব্য বিকল্পগুলো নিয়ে চিন্তাভাবনা করছি।'
সাবেক এনবিআর চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, 'উপায় আছে। এটি মিশ্র পদ্ধতি হতে পারে—কিছু জায়গায় বিধিনিষেধ আরোপ করা এবং অন্য জায়গায় নিয়ম শিথিল করা, যাতে সব খাতই তাদের প্রাপ্য গুরুত্ব ও সুবিধা পায়।'
তিনি আরও বলেন, 'এদের কেবল দুটি আলাদা শিল্প হিসেবে দেখা উচিত নয়, বরং তারা অর্থনীতির অপরিহার্য অংশ। শুল্ক-সংক্রান্ত সমস্যাগুলোর ভারসাম্য রক্ষায় সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থাকতে হবে।'
তার পরামর্শ, এনবিআর নির্দিষ্ট কিছু শিল্প থেকে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের প্রভাব পুনর্মূল্যায়ন করতে পারে। একইসঙ্গে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কেও দেশের প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদারদের সঙ্গে শুল্ক কাঠামো সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। সমাধানের জন্য তিনি সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে একসঙ্গে বসার আহ্বান জানান।
আমদানি শুল্ক কাঠামোর পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত শিল্পকে সহায়তা করার জন্য অন্যান্য পদক্ষেপের মধ্যে নগদ প্রণোদনা, ভর্তুকি, ঋণ ও অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপের মতো বিকল্পগুলো বিবেচনা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এখনকার মূল চ্যালেঞ্জ হলো দ্রুত ও সতর্কতার সঙ্গে পদক্ষেপ নেওয়া। একটি ভুল পদক্ষেপ কয়েক দশকে গড়ে ওঠা এই ভ্যালু চেইনকে ভেঙে দিতে পারে, বিশেষ করে এমন এক সময়ে যখন বাংলাদেশ অর্থনীতির আরেকটি ধাক্কা সামলাতে মোটেও প্রস্তুত নয়।
