মাঠ যখন লালে রাঙা: যেভাবে নরসিংদীর ঐতিহ্যবাহী টেক্সটাইল শিল্প বাঁচিয়ে রেখেছে লালসালু
ঘড়ির কাঁটায় তখন ভোর সাড়ে ৩টা। ৪৮ বছর বয়সী শিরু মিয়া আর ৩২ বছরের আখতার হোসেনের গন্তব্য তাদের বাড়ি থেকে দুই মাইল দূরের কারখানা। সেখানে টানা ১০-১১ ঘণ্টা ধরে সাদা সালু কাপড়কে গভীর লালে রাঙানোর কাজ চলে। স্থানীয়ভাবে এটি 'লালসালু' নামেই পরিচিত। অন্তত ৪ হাজার গজ কাপড় রং করার পর তারা সেই ভেজা কাপড়ের রোল নিয়ে যান মাঠে, শুকানোর পর ভাঁজ করে আবার কারখানায় ফিরিয়ে দেন।
নরসিংদীর বালাপুর গ্রামে টেক্সটাইল মিলগুলোর চাকা ঘোরে বিরতিহীন। খটাখট, ফিসফাস শব্দে সারাক্ষণ মুখর থাকে চারপাশ। রাতের নিস্তব্ধতাতেও মেশিনের শব্দে ঘুম ভাঙে প্রতিবেশীদের। মানুষ আর যন্ত্রের এই অবিচ্ছেদ্য জুটিতে উৎপাদিত হয় লাখ লাখ গজ কাপড়। কর্মীরা শিফটে কাজ করেন। তাদের ভাষায়, 'ভোর ৪টা থেকে সকাল ১১টা, সকাল ১১টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা এবং সন্ধ্যা ৬টা থেকে ভোর ৪টা।'
টেক্সটাইল শিল্পের ঐতিহ্যের জন্য বিখ্যাত নরসিংদী। দেশের একমাত্র এই জেলাতেই লালসালু কাপড় তৈরি হয়। মেঘনা নদীর তীরের চারটি গ্রাম তথা মাধবদী উপজেলার ভঙ্গারচর, পাইকারচর, উত্তর চর ভাসানিয়া এবং বালাপুরে এই লাল কাপড় তৈরি হয়। মূলত ঐতিহ্যবাহী লেপ ও তোশক তৈরিতে এর ব্যবহার। তবে মসজিদ, মন্দির, দরগাহ ও মাজারের নানা কাজেও এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।
মহাজন বা মালিক এবং শ্রমিকরা জানান, সারা বছরই লালসালু তৈরি হয়। তবে নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এর প্রধান মৌসুম।
উত্তর চর ভাসানিয়া গ্রামের মোসলেম কোম্পানির মালিক মো. নাদির বলেন, 'কয়েক বছর আগেও শুধু শীতকালে বড় পরিসরে উৎপাদন হতো। এখন সারা বছরই হয়, তবে দৈনিক উৎপাদনের পরিমাণ কিছুটা কমেছে।'
মৌসুমের সময় দুপুরের দিকে এই চার গ্রামের মাঠগুলো লালে লাল হয়ে ওঠে। আধা কিলোমিটার বা তারও বেশি এলাকাজুড়ে লাল কাপড়ের সারি দেখা যায়। রং করা থেকে শুরু করে শুকানো ও ভাঁজ করা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে দুজন শ্রমিকের প্রয়োজন হয়।
শুধু উত্তর চর ভাসানিয়া এবং বালাপুর গ্রামেই অন্তত ৪০টি ডাইং মিল রয়েছে। মোসলেম কোম্পানিতে প্রতি সপ্তাহে ২৪ থেকে ৩০ হাজার গজ লালসালু তৈরি হয়। কোনো কোনো মিলে তা ৫০ হাজার গজও ছাড়িয়ে যায়।
উৎপাদকেরা বিভিন্ন উপায়ে কাঁচামাল সংগ্রহ করেন। কেউ কেউ নিজেদের তাঁত কারখানা থেকে কাপড় নেন, আবার কেউ কেউ মাধবদী, বাবুরহাট বা নরসিংদী সদরের মিল ও বাজার থেকে কেনেন।
নাদির বলেন, 'চাহিদা বাড়লে নিজেদের কারখানার বাইরেও সপ্তাহে গড়ে ৩০ থেকে ৪০ হাজার গজ বাড়তি কাপড় সংগ্রহ করতে হয়।'
রং করার দীর্ঘ ঐতিহ্য
ভোর ৪টায় শিরু-আখতার জুটি তাদের কাজ শুরু করে। রঙের উপকরণ খুলতে খুলতে শিরু মিয়া বলেন, 'প্রথমে রং তৈরি করতে হয়।' পানিতে অন্তত সাতটি উপকরণ মেশানো হয়: অ্যালুমিনা, কস্টিক সোডা, নাটিং, বাসন্তী (হলুদ) রং, বিএস (বাফার সল্ট), আরএস (লাল শেড) এবং অ্যাসিড।
সিমেন্টের দুটি বিশাল গামলায় তারা দুটি দ্রবণ তৈরি করে। একটি বাসন্তী রঙের, অন্যটি লাল শেডের। শিরু বলেন, 'আমরা প্রথমে সাদা কাপড়কে হলুদ এবং পরে লাল করি।'
সব উপকরণ ভালোভাবে মেশানোর পর কাপড়ের রোল মেশিনে বসানো হয়। এরপরই শুরু হয় মূল প্রক্রিয়া।
মেশিনের নিচে আয়তাকার জায়গায় রঙের দ্রবণ ঢেলে দেওয়া হয়। রড ঘুরিয়ে কাপড় ভিজিয়ে আবার খোলা হয়। শিরু বলেন, 'দেখুন, এটা হলুদ হচ্ছে। পরে আমরা লাল শেড মেশাব।' এই কাজে সময় ও মনোযোগ দরকার, তাই বিশ্রামের সুযোগ নেই। আখতার বলেন, 'মাঠে রোলগুলো ছড়িয়ে দেওয়ার পরই কেবল বিশ্রাম পাওয়া যায়।'
শিরু জানান, প্রতিটি কাপড়ে ওয়াক্স বা মোম দেওয়া দরকার। এতে রং পাকা হয় এবং ফিনিশিং ভালো হয়। আখতার গমের গুঁড়োর সঙ্গে পানি মিশিয়ে আরেকটি দ্রবণ তৈরি করেন, যা মোমের কাজ করে। এটি কাপড়ের উপরিভাগ মসৃণ করে এবং ভাঁজ করতে সুবিধা দেয়।
সকাল ৮টার দিকে তারা রঙের কাজ শেষ করে রোলগুলো কাছের মাঠে নিয়ে যায়। আধা ঘণ্টার মধ্যে সব ছড়িয়ে দেওয়া হয়। দুপুর ১২টার মধ্যে রোদে শুকিয়ে কাপড়গুলো গাঢ় লাল বর্ণ ধারণ করে।
শিরু বলেন, 'প্রতি মেশিনে ১ হাজার গজ কাপড় রং করতে ঠিক দুই ঘণ্টা সময় লাগে।'
গজপ্রতি মজুরি
দুপুরে বালাপুর গ্রামে শীতের শেষের কড়া রোদে নজরুল-শফিক জুটির খালি গা ঘামে ভিজে গেছে। তারা পলিথিনের ছাউনির নিচে শুকানো কাপড় ভাঁজ করছে। একটু দূরেই মাঠে কাপড়ের স্তূপ।
বৃহস্পতিবার হওয়ায় সপ্তাহের মজুরি পাওয়ার দিন। নজরুল জানান, তারা গজপ্রতি মজুরি পান। তিনি বলেন, 'আজ আমরা ৫ হাজার গজ কাপড় রং করেছি। প্রতি ১ হাজার গজের জন্য ৮২০ টাকা করে পাব।'
বালাপুর গ্রামের মো. তারামিয়া বলেন, 'গড়ে আমরা প্রতি সপ্তাহে ২৪ হাজার গজ কাপড় রং করি এবং প্রায় ২০ হাজার টাকা পাই। অর্থাৎ একেকজনের ভাগে ১০ হাজার টাকা।'
নরসিংদীর টেক্সটাইল ও ডাইং কারখানায় স্থানীয় শ্রমিক খুব একটা দেখা যায় না। বেশির ভাগ শ্রমিকই ময়মনসিংহ অঞ্চল থেকে এসে দশকের পর দশক ধরে এখানে কাজ করছেন।
কাপড়ের হাটের অন্দরমহল
বৃহস্পতিবার, শুক্রবার এবং শনিবার সাপ্তাহিক হাটের দিনে বাবুরহাটের শেখেরচর কাপড়ের বাজারের সরু গলিগুলো শত শত গজ কাপড়ে ভরে ওঠে।
সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বাজারে থাকে উপচে পড়া ভিড়। দোকানগুলোতে সাজানো থাকে নানা ধরনের কাপড়। বিক্রেতাদের দম ফেলার ফুরসত থাকে না।
চার গ্রামের লালসালু উৎপাদকেরা এই বাজারে জড়ো হন। পাইকারচর গ্রামের এক উৎপাদক বলেন, 'শনিবার পর্যন্ত আমি এখানে থাকব। শীতকালে বিক্রি ভালো হয়।'
গত ৪ মাসে তিনি প্রায় আড়াই লাখ গজ লালসালু সরবরাহ করেছেন, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ।
তবে চাহিদা, উৎপাদন এবং কাপড়ের মানের ওপর ভিত্তি করে লালসালুর দাম ওঠানামা করে।
শেখেরচর বাজারের সোহেলের দোকানে চার ধরনের লালসালু কাপড় রয়েছে। তিনি বলেন, 'এখানে ওয়াটারমার্ক দেখে কাপড়ের মান বোঝা যায়। ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে আমি ১ নম্বর গ্রেডের কাপড় ৩৯-৪০ টাকায় বিক্রি করেছি। এখন তা ৩৫-৩৬ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে।'
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিক্রি বাড়লেও উৎপাদক ও বিক্রেতারা বলছেন, এক দশক আগের তুলনায় উৎপাদন কমেছে। ছোট হয়ে আসা শীতকাল লেপের চাহিদা কমিয়ে দিয়েছে, যা লালসালুর প্রধান ব্যবহার। আর এতেই এই শিল্পের ভবিষ্যৎ নতুন মোড় নিচ্ছে।