নির্যাতনবিরোধী কনভেনশনের রিজার্ভেশন প্রত্যাহারের প্রস্তাব অনুমোদন: রাষ্ট্রীয় নির্যাতনে মিলবে ক্ষতিপূরণ
নির্যাতন ও নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অবমাননাকর আচরণ বা শাস্তির বিরুদ্ধে জাতিসংঘ কনভেনশনের অনুচ্ছেদ ১৪(১)-এর ওপর দীর্ঘ ২৬ বছর ধরে বজায় রাখা রিজার্ভেশন (আপত্তি) প্রত্যাহারের প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ। এই সিদ্ধান্তের ফলে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে গুম, নির্যাতন বা অমানবিক আচরণের শিকার ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের অধিকার বাস্তবায়নের আইনি পথ সুগম হলো।
বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের সাপ্তাহিক বৈঠকে এই প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়। সভা শেষে সন্ধ্যায় রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানান প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম।
মানবাধিকার সংশ্লিষ্টরা এই সিদ্ধান্তকে বাংলাদেশের মানবাধিকার সুরক্ষার ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত অগ্রগতি হিসেবে অভিহিত করছেন।
ব্রিফিংয়ে শফিকুল আলম বলেন, '১৯৮৪ সালে গৃহীত জাতিসংঘের এই কনভেনশনটি বর্তমানে ১৯৫টি রাষ্ট্র অনুমোদন করেছে। বাংলাদেশ ১৯৯৮ সালে কনভেনশনটি অনুসমর্থন করলেও অনুচ্ছেদ ১৪-এর প্যারা ১-এর ক্ষেত্রে একটি রিজার্ভেশন রেখেছিল। এই অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের কার্যকর ক্ষতিপূরণ এবং পুনর্বাসনের বাধ্যবাধকতা রাষ্ট্রের ওপর আরোপ করা হয়েছে।'
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ছাড়াও এক সময় বাহামা, ফিজি, নিউজিল্যান্ড, সামোয়া ও যুক্তরাষ্ট্র এই অনুচ্ছেদের বিষয়ে রিজার্ভেশন জানিয়েছিল। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সর্বশেষ এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বাংলাদেশ সেই অবস্থান থেকে সরে আসার চূড়ান্ত ঘোষণা দিল।
রিজার্ভেশন প্রত্যাহারের সুফল ব্যাখ্যা করে শফিকুল আলম জানান, রিজার্ভেশন প্রত্যাহারের ফলে এখন রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রীয় সংস্থার মাধ্যমে নির্যাতিত ব্যক্তিরা ক্ষতিপূরণ দাবি করার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইনি সুরক্ষা আরও শক্তিশালীভাবে প্রয়োগ করতে পারবেন। একই সঙ্গে ভুক্তভোগীদের পুনর্বাসন নিশ্চিত করার দায় রাষ্ট্রের ওপর আরও স্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে।
নতুন এই বাস্তবতায়, নির্যাতনের শিকার কোনো ব্যক্তির মৃত্যু ঘটলে তার ওপর নির্ভরশীল ব্যক্তিরাও রাষ্ট্রীয় ক্ষতিপূরণ পাওয়ার আইনি অধিকার অর্জন করবেন—যা এর আগে স্পষ্টভাবে নিশ্চিত ছিল না।
মানবাধিকার বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা বাড়াতে সহায়ক হবে। একই সঙ্গে নির্যাতন প্রতিরোধে রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও দায়বদ্ধতা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে আরও সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।
দেশের মানবাধিকার সংগঠন ও অধিকারকর্মীরা গত দুই দশক ধরে এই রিজার্ভেশন প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে আসছিলেন। মানবাধিকার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই পদক্ষেপ বাংলাদেশে মানবাধিকার রক্ষায় রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সদিচ্ছার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন।
সরকারি সূত্রগুলো বলছে, 'এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বৈশ্বিক অঙ্গনে মানবাধিকার ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্ত হবে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে দেশের ভাবমূর্তি ইতিবাচকভাবে উপস্থাপিত হবে।'
