পোস্টার নিষিদ্ধ: নির্বাচনে বদলে যাচ্ছে প্রচারের ভাষা, ঢাকার ছাপাখানা নিস্তব্ধ, চাপে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা
ঢাকার ফকিরাপুল, আরামবাগ ও নীলক্ষেতের ছাপাখানাগুলোর জন্য নির্বাচনের মৌসুম মানেই ছিল ব্যবসার জমজমাট সময়। কিন্তু এবার চিত্রটি একেবারেই ভিন্ন। নির্বাচনি প্রচারণায় কড়াকড়ি আরোপের ফলে পোস্টার ও প্রচারসামগ্রীর চাহিদা তলানিতে ঠেকেছে। ফলে অস্বাভাবিক নীরবতা নেমে এসেছে এসব এলাকায়, আর লোকসানে পড়েছেন ক্ষুদ্র ও মাঝারি ছাপাখানা মালিকরা।
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) আচরণবিধি অনুযায়ী, নির্বাচনি প্রচারে যেকোনো ধরনের পোস্টার লাগানো নিষিদ্ধ। লিফলেট, হ্যান্ডবিল, ফেস্টুন ও ব্যানার তৈরিতে রেক্সিন, পলিথিন, প্লাস্টিক বা অন্য কোনো পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর ও পচনশীল নয়, এমন উপাদান ব্যবহার করা যাবে না। প্রচার সামগ্রীতে শুধু প্রার্থীর নিজস্ব ছবি ও নির্বাচনি প্রতীক থাকতে পারবে।
এর ফলে নির্বাচনের সেই চিরচেনা ব্যস্ততা—রাত জেগে ছাপার কাজ, অতিরিক্ত কর্মী নিয়োগ ও কাগজের জমজমাট বেচাকেনা—এবার নেই বললেই চলে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এই ব্যবসায় বড়সড় ধস নেমেছে।
পোস্টারের ওপর বিধিনিষেধ
ইলেকট্রনিক ও ডিজিটাল মিডিয়া ছাড়া সব ব্যানার, লিফলেট, হ্যান্ডবিল ও ফেস্টুন অবশ্যই সাদাকালো রঙে ছাপাতে হবে। ব্যানারের আকার ১০ ফুট বাই ৪ ফুটের বেশি হতে পারবে না, লিফলেট বা হ্যান্ডবিল অবশ্যই এ৪ সাইজের মধ্যে হতে হবে এবং ফেস্টুন ১৮ ইঞ্চি বাই ২৪ ইঞ্চির বেশি বড় হওয়া যাবে না।
প্রচারসামগ্রীর ওপর এমন কঠোর বিধিনিষেধের কারণে নির্বাচনি ছাপার কাজ একধাক্কায় কমে গেছে। এতে লোকসানে পড়েছেন ক্ষুদ্র ও মাঝারি ছাপাখানার মালিকরা।
নির্বাচনের মৌসুমেও ছাপাখানায় কাজের আকাল
রাজধানীর অধিকাংশ ছাপাখানা ফকিরাপুল, আরামবাগ ও নীলক্ষেত এলাকায়। এর মধ্যে ফকিরাপুলেই বেশি পোস্টার, লিফলেট ও হ্যান্ডবিল ছাপার কাজ হয়।
ময়নামতি প্রিন্টার্সের মালিক স্বপন আহমেদ বলেন, 'আমাদের ৭০ শতাংশ বিক্রি কমে গেছে। এটা ছিল আমাদের জন্য ঈদের মতো। নির্বাচনের সময়ের জন্য নতুন লোক নিয়ে আসতাম ১২-১৪ জন। কিন্তু এবার কাজ নেই, তাই বসে থাকতে হচ্ছে। গত ১৫ বছরে আমাদের এমন যায় নাই।'
আল নুর প্রিন্টার্স এন্ড প্রেসের মালিক শাহাদাত হোসেন টিবিএসকে বলেন, তাদের উৎপাদনে ধস নেমেছে। 'আগে আমরা নির্বাচনি মৌসুমে ১ হাজার ২০০ রিম কাগজের পোস্টার, লিফলেটসহ বিভিন্ন জিনিস বানাতাম। এই ইলেকশনে ২০০ কাগজের পোস্টার মনে হয় বিক্রি করতে পারব না। আগে দম ফেলার সময় পেতাম না, আর এখন মাছি মারি বসে বসে। সাদা-কালো লিফলেট করে লাভ নাই, তারপরও করতেছি।'
কাগজ ও ডিজাইন ব্যবসাতেও ধস
ছাপাখানার এই মন্দার প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যবসাতেও। রাশেদ পেপার হাউজের স্বত্বাধিকারী রাশেদ টিবিএসকে জানান, তারা অনেক কাগজ কিনে রেখেছিলেন নির্বাচন উপলক্ষে। কিন্তু কাগজ বিক্রি আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। '৭০ থেকে ৮০ রিম কাগজ আমরা প্রতিদিন বিক্রি করতাম নির্বাচন উপলক্ষে। তবে নির্বাচনে অনেক বিধিনিষেধ থাকায় আমাদের বেচাবিক্রি কমে গেছে।'
ডিজাইন স্টুডিওগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পেন্সিল গ্রাফিক্সের মালিক মাহমুদ হাসান বলেন, 'আমরা অনেক ডিজাইন করে থাকি নির্বাচন-কেন্দ্রিক পোস্টার, ব্যানার, লিফলেটের। তবে এ বছর আমাদের হাতে তেমন কোনো কাজ নেই নির্বাচন-কেন্দ্রিক। তাই আমরা আমাদের নিয়মিত কাজ নিয়েই আছি।'
চাপে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা
খাতসংশ্লিষ্ট নেতারা বলছেন, এই সংকটের প্রভাব ব্যাপক। ফকিরাপুল, আরামবাগ, নীলক্ষেত ও বাংলাবাজার এলাকায় দুই হাজারের ছাপাখানা রয়েছে। এর মধ্যে ফকিরাপুল ও পল্টনে অন্তত হাজারখানেক ছাপাখানা।
নির্বাচনের মৌসুমে ঢাকাসহ সারা দেশে ছাপাখানাগুলোতে ৫০ কোটি টাকার ওপরে ব্যবসা হয়। নির্বাচনি পোস্টার নিষিদ্ধ হওয়ায় সেই ব্যবসায় পুরোপুরি ধস নেমেছে বলে জানান বাংলাদেশ মুদ্রণ শিল্প সমিতির সাবেক সভাপতি তোফায়েল খান।
তিনি বলেন, নির্বাচনে পোস্টার ও প্রচারসামগ্রী না থাকার প্রভাব শুধু রাজনৈতিক নয়, অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবেও পড়েছে। আগে নির্বাচন এলেই পোস্টার, ব্যানার, লিফলেট ছাপাকে কেন্দ্র করে সারা দেশের জেলা-উপজেলার ক্ষুদ্র ও মাঝারি মুদ্রণ শিল্পে ব্যাপক কর্মচাঞ্চল্য তৈরি হতো। কর্মচারীরা ওভারটাইম পেতেন, মালিকরা বাড়তি আয় করতেন। কিন্তু এবারে সেই পুরো ব্যবস্থাটি ভেঙে পড়েছে।
তোফায়েল খান দাবি করেন, শুধু পোস্টার ও প্রচারসামগ্রী না ছাপানোর কারণে মুদ্রণ খাতে প্রায় ৫০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে, যার বড় অংশই বহন করছেন ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রেস মালিকরা। এর ফলে নিম্ন আয়ের শ্রমিকদের আয়ের সুযোগও বন্ধ হয়ে গেছে।
