চানখাঁরপুলে ৬ হত্যা মামলা: সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ ৩ জনের মৃত্যুদণ্ড
চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর চানখাঁরপুলে ৬ হত্যার অভিযোগে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ ৩ জনের মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। বাকি পাঁচ আসামীকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
এটি পুলিশ বাহিনীর কারও বিরুদ্ধে জুলাই হত্যাকাণ্ডের প্রথম মামলার রায়।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে হাবিবুর ছাড়াও রয়েছেন ডিএমপির সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী এবং রমনা অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার শাহ আলম মো. আখতারুল ইসলাম। তিনজনই পলাতক রয়েছেন।
বাকি পাঁচ আসামীর মধ্যে রমনা অঞ্চলের সাবেক সহকারী কমিশনার মোহাম্মদ ইমরুলকে ৬ বছরের কারাদণ্ড, শাহবাগ থানার তৎকালীন পরিদর্শক (অপারেশন) মো. আরশাদ হোসেনকে ৪ বছরের কারাদণ্ড, এবং কনস্টেবল মো. সুজন মিয়া, মো. ইমাজ হোসেন ইমন ও মো. নাসিরুল ইসলামকে তিন বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
আজ সোমবার (২৬ জানুয়ারি) দুপুর ১২টায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল রায় ঘোষণা করেন। রায়ের পুরো কার্যক্রম বিটিভিতে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।
ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে এই মামলায় শুনানি করেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম ও প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম। সেই সাথে ছিলেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামীম, সহিদুল ইসলাম ও আবদুল্লাহ আল নোমানসহ অপর প্রসিকিউটররা। অন্যদিকে আসামি ইমাজ হোসেন ইমনের পক্ষে ছিলেন করেন আইনজীবী মো. জিয়াউর রশিদ এবং পলাতক চার আসামির পক্ষে রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী হিসেবে ছিলেন কুতুবউদ্দিন আহমেদ।
তবে মামলার রায়ে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। রায় ঘোষণার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, 'আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পরও সীমিত সাজা দেয়া হয়েছে, তাতে আমরা অসন্তুষ্ট। আমরা এর বিরুদ্ধে আপিল করব। সাজা সীমিত হওয়া ন্যায় বিচারের সঙ্গে সঙ্গত না।'
তাজুল ইসলাম বলেন, 'পুলিশ কনস্টেবল সুজন গুলি করার সময় উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছে। কিন্তু তিনি যেহেতু কনস্টেবল ছিলেন, ঊর্ধ্বতনের আদেশ পালনে বাধ্য ছিলেন। তাই আদালত তাকে সীমিত সাজা দিয়েছেন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।'
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, 'এই সাজা বার্তা দেয় যে, কোনো বেআইনি নির্দেশ মানতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বাধ্য নন। মানলে তিনি আদালতের এজলাসে ছাড় পাবেন না।'
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট চানখারপুল এলাকায় শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে পুলিশ গুলি চালায়। এতে শাহরিয়ার খান আনাস, শেখ মাহদী হাসান জুনায়েদ, মো. ইয়াকুব, মো. রাকিব হাওলাদার, মো. ইসমামুল হক ও মানিক মিয়া শাহরিক শহীদ হন। এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের করা হয়।
গত ১১ আগস্ট চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলামের সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন শেষে এই মামলার প্রথম সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেন শহীদ আনাসের বাবা সাহরিয়ার খান পলাশ। এরপর শহীদ আনাসের মা ও নানাসহ মোট ২৬ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ ও জেরা সম্পন্ন করা হয়। এই মামলায় সাক্ষ্য দেন সাবেক স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া।
মামলায় মোট আটজন আসামী ছিলেন, যারা ঘটনার সময় পুলিশের বিভিন্ন পদে কর্মরত ছিলেন। এর মধ্যে চারজন গ্রেপ্তার হয়েছেন, বাকিরা পলাতক।
গ্রেপ্তার চার আসামি হলেন— শাহবাগ থানার সাবেক ওসি (অপারেশন) মো. আরশেদ হোসেন, কনস্টেবল মো. সুজন মিয়া, মো. ইমাজ হোসেন ইমন ও মো. নাসিরুল ইসলাম। অন্যদিকে পলাতক রয়েছেন- ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী এবং রমনা অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) শাহ আলম মো. আখতারুল ইসলাম ও সাবেক সহকারী কমিশনার (এসি) মোহাম্মদ ইমরুল।
গত বছরের ২১ এপ্রিল প্রসিকিউশন তদন্ত সংস্থার কাছে ৯০ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন দাখিল করে। প্রতিবেদন যাচাই-বাছাইয়ের পর ২৫ মে ট্রাইব্যুনাল-১-এ আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়। একই দিনে অভিযোগ আমলে নিয়ে আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়।
