জাতীয় নির্বাচন: উত্তরাঞ্চলের শক্ত ঘাঁটিতে এবার অনেকটাই নীরব জাতীয় পার্টি
এক সময় উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে নিরঙ্কুশ রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করা জাতীয় পার্টি এবারের নির্বাচনী প্রচারণায় সেখানে তুলনামূলকভাবে নীরব অবস্থানে রয়েছে। জিএম কাদেরের নেতৃত্বে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলটি রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের আটটি জেলায় মোট প্রার্থী দিয়েছে ৩০ জন।
জাতীয় পার্টির দুর্গ হিসেবে পরিচিত উত্তরবঙ্গের জেলাগুলোতে গত দুই দিনে একের পর এক নির্বাচনী সমাবেশ করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নেতৃত্বাধীন ১০-দলীয় জোট। তবে এসব জেলায় জিএম কাদেরের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টির বড় ধরনের রাজনৈতিক কার্যক্রম খুব একটা চোখে পড়েনি।
প্রার্থীদের প্রতীক বরাদ্দের পর বৃহস্পতিবার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হয়। প্রচারণা শুরুর পর থেকেই রাজনৈতিক দলগুলো ধারাবাহিকভাবে নির্বাচনী সমাবেশ ও কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তার জোটসঙ্গীদের নিয়ে শুক্রবার ও শনিবার রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের আটটি স্থানে নির্বাচনী সমাবেশ করে। এসব সমাবেশে আট জেলার ৪০টি আসনের প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেন জামায়াতের আমির। সমাবেশগুলোতে জামায়াতের জোটসঙ্গী এনসিপি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, জাগপাসহ অন্যান্য দলের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
এই ৪০টি আসনের মধ্যে অন্তত ৩০টিতে এবার জাতীয় পার্টির প্রার্থী রয়েছে। উল্লেখযোগ্য আসনের মধ্যে রংপুর-৩ আসনে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদের, গাইবান্ধা-১ ও গাইবান্ধা-৫ আসনে দলের মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী, লালমনিরহাট-১ আসনে মো. মশিউর রহমান রাঙ্গা এবং রংপুর-১ আসনে মঞ্জুম আলীসহ বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী প্রার্থী রয়েছেন।
প্রচারণা শুরু হওয়ার পর থেকেই নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় উঠান বৈঠক ও সভাসহ গণসংযোগ চালাচ্ছেন জাতীয় পার্টির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী। শনিবার তিনি তার নির্বাচনী এলাকা ফুলছড়ি বাজারে গণসংযোগ করেন।
প্রচারণার কিছু ছবি ফেসবুকে শেয়ার করে তিনি লেখেন, ফুলছড়ি-সাঘাটার মেহনতি মানুষ আজ জেগে উঠেছে। ন্যায়, উন্নয়ন ও হারানো অধিকার ফিরে পাওয়ার প্রত্যয়ে সবাই ঐক্যবদ্ধ। দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও অবহেলার রাজনীতি ভেঙে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্নে আজ মানুষ এক হয়েছে। এই ঐক্যের প্রতীক লাঙ্গল। লাঙ্গল কোনো স্লোগান নয়, লাঙ্গল মেহনতি মানুষের শক্তি, ন্যায়ের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান এবং উন্নয়ন ও মানবিক রাজনীতির অঙ্গীকার।
এদিকে প্রচারণার শুরুর দিনেই রংপুরে এক সভায় জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের গণভোট বানচালের আহ্বান জানান।
গত ২২ জানুয়ারি তিনি বলেন, "আমাদের বিভিন্নভাবে বাধা দেওয়া হচ্ছে। নানা পন্থায় রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। আমরা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড পাচ্ছি না। স্বৈরাচার রোধের নামে যে সংস্কারের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, সেখানে প্রধানমন্ত্রীর হাতে প্রয়োজনীয় ক্ষমতা নেই, তার হাত-পা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। দেশ পরিচালনার জন্য ব্যক্তিক্ষমতা দিতে হবে, তা না হলে কেউ দায়িত্ব পালন করতে পারবে না।"
তিনি আরও বলেন, "এই গণভোট সংবিধানবিরোধী ও অবাস্তব। এটি বাস্তবায়িত হলে দেশ অস্থিতিশীলতার দিকে এগিয়ে যাবে।"
এ বক্তব্যের পরও স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, জাতীয় পার্টির কার্যক্রম এখনো অনেকটাই নীরব রয়েছে—এমনকি চেয়ারম্যানের নিজস্ব এলাকা হিসেবে পরিচিত রংপুর-৩ আসনেও। সীমিত পরিসরে বাড়ি বাড়ি গিয়ে গণসংযোগ চালানো হলেও গত তিন দিনে দলটির পক্ষ থেকে কোনো বড় সভা বা জনসমাবেশ আয়োজন করা হয়নি।
সাবেক সংসদ সদস্য ও রংপুর-২ আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী আনিসুল ইসলাম মন্ডল টিবিএসকে বলেন, "আমি আমার কাজের মেয়াদে (২০০৯–২০১৪) এলাকার মানুষের জন্য কাজ করেছি। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই এবার মানুষের কাছে যাচ্ছি। গতানুগতিক রাজনীতির বাইরে গিয়ে কর্মসংস্থানকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি এবং ভালো সাড়া পাচ্ছি। বড় সভা-সমাবেশ না করলেও গণসংযোগের মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছি। আমার কার্যক্রম অন্য দলগুলোর মতো নয়।"
রংপুরসহ উত্তরবঙ্গের রাজনীতিতে জাতীয় পার্টির সঙ্গে জামায়াতের খুব বেশি দৃশ্যমান দ্বন্দ না থাকলেও জামায়াত জোটের অন্যতম দল এনসিপির সঙ্গে দ্বন্দ রয়েছে। ২০২৪ সালের অক্টোবরে এনসিপির নেতা—তখন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক—হাসনাত আব্দুল্লাহ ও সারজিস আলমকে রংপুরে 'অবাঞ্ছিত' ঘোষণা করে জাতীয় পার্টি। এর মধ্য দিয়ে জাতীয় পার্টির সঙ্গে এনসিপির দ্বন্দ প্রকাশ্যে আসে।
এছাড়া এনসিপি দাবি জানিয়ে আসছিল, আওয়ামী লীগের সহযোগী জাতীয় পার্টিসহ ১৪ দলকে যেন নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ না দেওয়া হয়।
শুক্রবার পঞ্চগড়ের জামায়াতের নির্বাচনী সমাবেশে পঞ্চগড়-১ আসনে এনসিপির প্রার্থী মো. সারজিস আলমের হাতে শাপলা কলি তুলে দেন জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান। একইভাবে রংপুর-৪ আসনে আখতার হোসেন, সিরাজগঞ্জ-৬ আসনে এস এম সাইফ মোস্তাফিজ এবং দিনাজপুর-৫ আসনে ডা. মো. আব্দুল আহাদকে এনসিপির প্রতীক শাপলা কলি তুলে দেন তিনি।
তবে এবার পঞ্চগড়-১ আসনে জাতীয় পার্টি কোনো প্রার্থী দেয়নি।
জাতীয় পার্টির অন্যতম শক্ত ঘাঁটি রংপুরের টাউন হল মাঠে শুক্রবার কয়েক হাজার মানুষের সমাবেশে জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, "আল্লাহ আমাদের ক্ষমতায় নিলে কাউকে বাদ দেব না। সবাইকে বলব, আসুন মিলেমিশে বাংলাদেশ গড়ে তুলি।"
'৫৪ বছরের বস্তাপচা' রাজনীতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, "আমরা সেই বস্তাপচা রাজনীতি আর চাই না। যে রাজনীতি তার নেতা–নেত্রীকে চোর, লুটেরা, সন্ত্রাসী ও ফ্যাসিস্ট বানায়—সে রাজনীতি আর দেখতে চাই না।"
ওই সমাবেশে এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন বলেন, "আমরা চাই, রংপুরের মানুষের জমি, ভিটেবাড়ি ও ঘরবাড়ি যেন নদীগর্ভে বিলীন না হয়। বর্ষাকালে ভারত যদি পানি ছেড়ে দেয়, তাহলে অন্তত তিন দিন আগে যেন জানায়—যাতে তিস্তা পাড়ের মানুষ ফসল ঘরে তুলতে পারে এবং ঘরবাড়ি সরিয়ে নিতে পারে। ভারতের সঙ্গে আমরা এমন ন্যায্যতার সম্পর্ক চাই। আমরা মানুষের কাছে এমন প্রতিশ্রুতি দিতে চাই, যা পালন করা সম্ভব। জনগণের সঙ্গে ধোঁকাবাজি করা আমাদের কাজ নয়।"
