রাজস্ব প্রবৃদ্ধি কম, বিনিয়োগ স্থবির: বিএনপি-জামায়াতের কর্মসংস্থান ও সামাজিক সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়ন সম্ভব?
দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক শক্তি বিএনপি ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী আসন্ন ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, শিল্পায়ন ও বিনিয়োগকে কেন্দ্র করে বেশ কিছু পরিকল্পনা সামনে এনেছে।
দুই দলের ভাবনাতেই ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ, তরুণদের ক্ষমতায়ন ও শিল্পায়নে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।
দলগুলোর নির্বাচনি ইশতেহারে এসব প্রতিশ্রুতি যুক্ত হবে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে বিএনপি ও জামায়াতের দলীয় সূত্রে।
জামায়াত এরইমধ্যে ঢাকায় একটি পলিসি সামিটের আয়োজন করে বিদেশি কুটনীতিবিদ, অর্থনীতিবিদ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের ব্রিফ করে বিস্তারিত তুলে ধরেছে।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা এসব পরিকল্পনাকে নীতিগতভাবে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন। তবে একইসঙ্গে তারা প্রশ্ন তুলছেন: এই পরিকল্পনাগুলো কত দিনে বাস্তবায়ন হবে, কীভাবে হবে, অর্থায়ন কোথা থেকে আসবে এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো কী হবে, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট রোডম্যাপ এখনো অনুপস্থিত।
এমন এক সময়ে এই প্রশ্নগুলো উঠছে যখন বাংলাদেশের অর্থনীতি একাধিক কাঠামোগত ও স্বল্পমেয়াদি চাপে রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে ৪-৫ শতাংশের মধ্যে নেমে এসেছে, যা করোনা মহামারি-পূর্ব সময়ের তুলনায় অনেক কম।
একইসঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে খাদ্য ও সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯-১০ শতাংশের আশপাশে অবস্থান করায় সাধারণ মানুষের ভোগক্ষমতা সংকুচিত হয়েছে এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে।
অন্যদিকে বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির প্রায় ২৩-২৪ শতাংশে স্থবির হয়ে আছে, যা নতুন শিল্প স্থাপন ও পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য অপর্যাপ্ত বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
আনুষ্ঠানিক হিসাবে বেকারত্বের হার ৪ শতাংশের কাছাকাছি থাকলেও তরুণ ও শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে বেকারত্বের হার বাস্তবে আরও বেশি বলে ধারণা করা হয়, যা শ্রমবাজারের চাপকে স্পষ্ট করে। এদিকে দেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনও ৭ শতাংশের নিচে রয়ে গেছে।
এর ওপর বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ বেড়েছে, ফলে উন্নয়ন ব্যয় বাস্তবায়নে রাজস্ব ঘাটতির সমস্যা প্রকট হয়ে উঠছে। বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর দৃশ্যমান অগ্রগতি থাকলেও শিল্প খাতে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতি এবং দুর্বল লজিস্টিকস ব্যবস্থা এখনও বিনিয়োগ ও উৎপাদনের বড় বাধা হিসেবে রয়ে গেছে।
এই বাস্তবতায় বিএনপি ও জামায়াতের উচ্চাকাঙ্ক্ষী ইশতেহারগুলো কতটা বাস্তবায়নযোগ্য, তা নিয়ে অর্থনৈতিক মহলে আলোচনা ও বিশ্লেষণ চলছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এখন আর আলোচনা এই নিয়ে নয় যে প্রতিশ্রুতিগুলো শুনতে কতটা আকর্ষণীয়; বরং দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানসমূহ ও সরকারি অর্থব্যবস্থা এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ভার বহন করতে পারবে কি না, সেটাই এখন মূল বিচার্য।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত পরিচালক (গবেষণা) তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর ভিশন এই মুহূর্তের জন্য অবাস্তব মনে হচ্ছে।
'তবে এর সঙ্গে অর্থসংস্থান কীভাবে হবে, পরিকল্পনাগুলো কত দিনে বাস্তবায়ন হবে, কী প্রক্রিয়ায় হবে এবং বাস্তবায়নে প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি অর্জনে কী ব্যবস্থা নেয়া হবে, তা স্পষ্ট করতে হবে। রাজস্ব বাড়াতে পারলে দীর্ঘমেয়াদের এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্ভব এবং তা উচিতও,' বলেন তিনি।
কর্মসংস্থান সৃষ্টি: উচ্চাকাঙ্ক্ষা বনাম সক্ষমতা
বিএনপি ক্ষমতায় গেলে ১৮ মাসে এক কোটি চাকরি সৃষ্টি এবং শিক্ষিত বেকারদের জন্য বেকার ভাতা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। অন্যদিকে জামায়াত বলছে, ৫ বছরে ১ কোটি তরুণকে স্কিল ট্রেনিং এবং ৫০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে ১৮-২০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করেন। সে হিসেবে এক কোটি চাকরি সৃষ্টি করতে হলে জিডিপি প্রবৃদ্ধি টেকসইভাবে ৮-১০ শতাংশের ওপরে নিতে হবে এবং বড় আকারে দেশি–বিদেশি বিনিয়োগ আনতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের একজন অধ্যাপক বলেন, কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি রাজনৈতিকভাবে আকর্ষণীয়, কিন্তু বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও রপ্তানি বাড়ানোর সুস্পষ্ট পরিকল্পনা ছাড়া এটি বাস্তবায়ন কঠিন।
ওই অধ্যাপক বলেন, 'বাংলাদেশে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ হার ২২-২৩ শতাংশে আটকে আছে বহু বছর ধরে। সাম্প্রতিক সময়ে এটি আরো কমেছে। কিছু অবকাঠামো হলেও হুট করে বিনিয়োগ বাড়ানোর মতো নয়। ফলে কর্মসংস্থান নিয়ে দলগুলোর ভাবনা অনেকটা উচ্চাকাঙ্ক্ষার মতো।'
অর্থনীতিবিদরা আরও বলেন, একটি কর্মসংস্থান তৈরি করতে বাংলাদেশে ঠিক কতটুকু বিনিয়োগ প্রয়োজন, সে বিষয়ে দেশে সুনির্দিষ্ট কোনো গবেষণা নেই। বিশ্বের অন্যান্য দেশে এমন গবেষণা থাকলেও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তা হুবহু প্রযোজ্য না-ও হতে পারে।
বিশ্বব্যাংক গ্রুপের সাবেক জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ এবং প্রোগ্রাম ম্যানেজার মাসরুর রিয়াজ বলেন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতির কারণে এখন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের স্পষ্ট অনুপাত হিসাব করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
'তবে বার্ষিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জিডিপি-বিনিয়োগের অনুপাত বিশ্লেষণ করলে এ বিষয়ে কিছুটা ধারণা পাওয়া যেতে পারে,' বলেন তিনি।
তিনি বলেন, গত বছর বেসরকারি বিনিয়োগ ছিল জিডিপির প্রায় ২২ শতাংশ, যা অর্থের অঙ্কে প্রায় ১১০ বিলিয়ন ডলার। এর বিপরীতে বেসরকারি খাতে বছরে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে মাত্র ১২ থেকে ১৩ লাখ।
'তবে এক বছরে যে বিনিয়োগ করা হয়, তা সেই বছরেই কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে না; বরং এর সুফল পর্যায়ক্রমে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাওয়া যায়,' বলেন তিনি।
এছাড়া অর্থনীতিবিদরা আরও বলেন, পরবর্তী সরকার যারাই গঠন করুক না কেন, তাদের ওপর সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের প্রচণ্ড চাপ থাকবে। কারণ ২০১৫ সালের পর তাদের জন্য আর কোনো নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণা করা হয়নি।
কর, সুদহার ও বিনিয়োগ
জামায়াতে ইসলামী করপোরেট কর স্থায়ীভাবে ১৯ শতাংশে ও মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার কথা বলেছে। বর্তমানে কিছু কোম্পানিকে ৫০ শতাংশেরও বেশি কর দিতে হয়। নিরুৎসাহিত ও বিলাসী পণ্যের ক্ষেত্রে এই করের হার ৭০০-৮০০ শতাংশ পর্যন্ত রয়েছে।
অন্যদিকে বিএনপি তাদের প্রস্তাবে নির্দিষ্ট করহারের কথা উল্লেখ না করলেও ব্যবসাবান্ধব সংস্কার ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা শিথিল করার (ডিরেগুলেশন) প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, কর কমানো হলে তা বিনিয়োগে উৎসাহ জোগাবে। তবে তারা সতর্ক করে বলেন, রাজস্ব আয়ের বিকল্প উৎস তৈরি না করে কর কমালে বাজেট ঘাটতি বেড়ে যেতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি ও ঋণের বোঝা বাড়িয়ে দেবে।
মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) সভাপতি কামরান টি রহমান বলেন, ব্যবসায়ীরা কর কমানোর পক্ষে, তবে অন্যান্য বিষয়েও স্বচ্ছতা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, 'আমরা ট্যাক্স কমানোর পক্ষে। কিন্তু একইসঙ্গে জানতে চাই ব্যাংকের সুদহার কীভাবে কমানো হবে, ডলার সংকট কীভাবে সামাল দেওয়া হবে, আর নীতিগত স্থিতিশীলতা কীভাবে নিশ্চিত হবে?'
এই ব্যবসায়ী নেতা আরও বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও সুদহার কমানো ছাড়া বিনিয়োগে গতি আসবে না। এছাড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও ঠিক করতে হবে। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট দূর করতে হবে।
তবে বিনিয়োগ বাড়াতে শেষপর্যন্ত রাজস্ব আদায় নিয়ে মহাপরিকল্পনা নিতে হবে বলে মনে করেন সিপিডির তৌফিকুল ইসলাম খান।
তিনি বলেন, 'একটি সেবা-কেন্দ্রিক কর ব্যবস্থা, স্বয়ংক্রিয়ভাবে রিটার্ন পূরণ ও যাছাই, অতিরিক্ত কর ফেরত নেওয়ার ব্যবস্থা চালু করতে হবে। এতে কর ফাঁকি ও প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রিতা কমবে এবং রাজস্ব আহরণ বাড়বে।'
সামাজিক সুরক্ষা: প্রতিশ্রুতি ও আর্থিক সীমাবদ্ধতা
আসন্ন নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াত উভয় দলই সামাজিক সুরক্ষা খাতকে গুরুত্ব দিয়ে একাধিক প্রস্তাবনা দিয়েছে। বিএনপি শিক্ষিত বেকারদের জন্য বেকার ভাতা, প্রত্যেক পরিবারের জন্য ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে নগদ সহায়তা, কর্মসংস্থানভিত্তিক সহায়তা ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণের কথা বলছে।
অন্যদিকে জামায়াত সুদমুক্ত ঋণ সহায়তা, দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য সরাসরি নগদ সহায়তা এবং কল্যাণমুখী রাষ্ট্র কাঠামোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
বর্তমানে বাংলাদেশ সরকারের সামাজিক সুরক্ষা খাতে বার্ষিক বরাদ্দ প্রায় ১.১৬ লাখ কোটি টাকা, যা জিডিপির প্রায় ২ শতাংশ। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, ভিজিডি, ভিজিএফসহ প্রায় ১৩০টির বেশি কর্মসূচির মাধ্যমে এই অর্থ বিতরণ হচ্ছে।
তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও রাজস্ব ঘাটতির প্রেক্ষাপটে এই খাতে বরাদ্দ বাড়ানো বড় চ্যালেঞ্জ।
বিএনপি চার কোটি পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার যে প্রস্তাব দিয়েছে, তাতে প্রতি কার্ডে ২ হাজার ৫০০ টাকা ধরা হলে মাসে ১০ হাজার কোটি টাকা বা বছরে ১.২ লাখ কোটি টাকার প্রয়োজন হবে।
সিপিডি অতিরিক্ত পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, সামাজিক সুরক্ষা বাড়ানো নীতিগতভাবে প্রয়োজনীয়, কিন্তু এটি টেকসই করতে হলে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো এবং ভর্তুকি ব্যবস্থায় সংস্কার জরুরি।
'জিডিপির ২ শতাংশ দিয়ে উন্নতমানের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়' উল্লেখ করে তিনি বলেন, লক্ষ্যভিত্তিক কর্মসূচি, ডিজিটাল ডেটাবেজ এবং অপচয় কমাতে পারলে একই বরাদ্দে বেশি মানুষকে কাভার করা সম্ভব হবে।
শিল্পায়ন ও জ্বালানিতে বড় বাধা
বিএনপি শিল্পায়নের ক্ষেত্রে প্রতিটি জেলায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প গড়ে তোলার প্রস্তুতি দিয়েছে। শিল্প খাতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়ার কথা বলেছে। কৃষিতে বিদ্যুতের ব্যবহার কমাতে খাল খননের কথা বলেছে। পাশাপাশি গ্যাস কূপ খননের কথা জানিয়েছে দলটি।
অন্যদিকে জামায়াত তিন বছর শিল্পে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির দাম না বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং শিল্পে সক্ষমতা অর্জনের পর প্রতি বছর মূল্যস্ফীতি ও আন্তর্জাতিক দামের সঙ্গে সমন্বয় করে বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে দলটি।
তবে বাস্তবতা হলো বর্তমানে গ্যাসের ঘাটতি, বিদ্যুতের চড়া উৎপাদন খরচ ও আমদানিনির্ভরতা শিল্প খাতের বড় চ্যালেঞ্জ।
গত পাঁচ অর্থবছরে বিদ্যুৎ ও গ্যাস খাতে সরকার ভর্তুকি দিয়েছে ২.০৭ লাখ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরেই এ খাতে ভর্তুকি দিতে হয়েছে ৬৩ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের মোট বাজেটের প্রায় ১০ শতাংশ। জ্বালানি খাতে ভর্তুকি ধরে রাখতে গেলে বা আরো বাড়ালে বাজেটের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়বে।
অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলছেন, এই বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি অব্যাহত রাখলে বা বাড়ালে তা সরকারি কোষাগারের ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করবে। সিপিডির একজন গবেষক বলেন, জ্বালানি ও শিল্প খাতে সংস্কার ছাড়া শুধু দাম স্থির রাখার ঘোষণা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে না।
কৃষি খাতের পরিকল্পনায় ভর্তুকির চাপ বাড়াবে
বাংলাদেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে কৃষি খাতের ভূমিকা এখনো গুরুত্বপূর্ণ। বিএনপি ও জামায়াত দুই দলই তাদের ইশতেহারে কৃষিকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। বিএনপি কৃষি কার্ড চালু, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত, খাল ও নদী খনন, কোল্ড স্টোরেজ ও কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের কথা বলছে। অন্যদিকে জামায়াত ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকদের জন্য সুদমুক্ত ঋণ সুবিধার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ভিন্ন। বর্তমানে কৃষি উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে, সারের দাম ও সেচ ব্যয় কৃষকের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।
দেশের কৃষিকে বাঁচিয়ে রাখতে এ খাতে সরকারের ভর্তুকিও বাড়ছে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং খাদ্য নিরাপত্তা খাতে ৪০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা মোট জিডির প্রায় ৬ শতাংশ।
এমন বাস্তবতায় এ খাতে ভর্তুকি বাড়লে তা দেশের বাজেটের ওপর চাপ বাড়াবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
তবে কৃষিপণ্যের বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমিয়ে কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে পারলে এ খাতে ভর্তুকি কমানো যাবে বলে মনে করছেন পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ।
তিনি বলেন, খাল-নদী খনন ও কোল্ড স্টোরেজ সম্প্রসারণ কার্যকর করতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ ও স্থানীয় প্রশাসনের দক্ষতা প্রয়োজন।
'শুধু নীতিগত ঘোষণা নয়, বরং বাজার ব্যবস্থাপনা সংস্কার, কৃষিঋণ সহজীকরণ এবং প্রযুক্তি সম্প্রসারণ নিশ্চিত করতে পারলেই কৃষি খাতে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব হবে,' বলেন তিনি।
আইসিটি ও ফ্রিল্যান্সিংয়ে জোর, তবে সীমাবদ্ধতা অনেক
দুই দলই তথ্যপ্রযুক্তি (আইসিটি) ও ফ্রিল্যান্সিংকে ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হিসেবে দেখছে। বিএনপি আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ের কথা বলছে, জামায়াত বলছে ২০ লাখ আইসিটি কর্মসংস্থান ও ৫ বিলিয়ন ডলার রপ্তানির কথা। আইসিটি খাতে ভিশন ২০৪০ ঘোষণা দিয়ে ১৫ বছরের রোডম্যাপও দিয়েছে জামায়াত।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই খাতে সম্ভাবনা আছে, তবে ডিজিটাল পেমেন্ট, ডেটা সিকিউরিটি, দক্ষতা ও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশাধিকার—এই চার বিষয়ে বড় ধরনের নীতিগত সংস্কার দরকার।
বিডিজবসের সিইও এবং ভয়েস ফর রিফর্মের কনভেনার ফাহিম মাশরুর বলেন, আইসিটি খাতে দলগুলোর দেয়া লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়ন সম্ভব। তরুণদের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রযুক্তিপণ্য সহজলভ্য করতে হবে। সেমিকন্ডাক্টরের মতো খাতে বিশেষ প্রণোদনা দিতে হবে।
