২৯৮ আসনে মোট প্রার্থী ১৯৮১, প্রতিদ্বন্দ্বিতায় শীর্ষে ঢাকা
নথিপত্র যাচাই, আপিল শুনানি ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা শেষে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৯৮টি আসনের জন্য মোট ১ হাজার ৯৮১ জন প্রার্থীকে চূড়ান্ত করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
পাবনা-১ ও পাবনা-২ আসনে একই দিনে ভোটগ্রহণ হওয়ার কথা থাকলেও কিছু আইনি জটিলতার কারণে এসব আসনের প্রক্রিয়া এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। তবে বাকি আসনগুলোর সঙ্গে একযোগে ভোটগ্রহণ নিশ্চিত করতে প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছে ইসি।
এ দুই আসনে আপিল শুনানি অনুষ্ঠিত হবে আগামী ২৫ জানুয়ারি। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন নির্ধারণ করা হয়েছে ২৬ জানুয়ারি। নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত পুনঃতফসিল অনুযায়ী পরবর্তী অন্যান্য কার্যক্রম সম্পন্ন করা হবে।
ইসির তথ্য অনুযায়ী, বিএনপি থেকে ২৮৮ জন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ২৫৩ জন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ২২৪ জন, এনসিপির ৩২ জন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ২৫৯ জন মনোনয়ন পেয়েছেন। সব মিলিয়ে প্রার্থীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৯৮১ জনে।
ইসির সর্বশেষ সমন্বিত তথ্য অনুযায়ী, গড়ে প্রতিটি আসনে ৬ জনের বেশি প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
এদিকে গতকাল বুধবার (২১ জানুয়ারি) প্রার্থীদের মধ্যে প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) থেকে শুরু হয়েছে নির্বাচনী প্রচারণা, যা চলবে আগামী ১০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।
দলীয় প্রার্থীরা নিজ নিজ দলের প্রতীক পেয়েছেন। আর স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য নির্বাচন কমিশন নির্ধারিত ১১৯টি প্রতীকের তালিকা থেকে প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
এর আগে নিবন্ধিত ৫৯টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৫১টি দলের প্রার্থী এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ৩০০টি আসনে মোট ২ হাজার ৫৮০টি মনোনয়নপত্র জমা দেন।
তবে রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত থাকায় দলটি এবারের নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না।
প্রার্থীসংখ্যায় শীর্ষে ঢাকা
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রার্থীসংখ্যা ও আসনভিত্তিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার দিক থেকে ঢাকা বিভাগ শীর্ষে রয়েছে। রাজধানীর একাধিক আসনে ১০ বা ১০ এর অধিক সংখ্যক প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে ঢাকা-১২ আসনে সর্বোচ্চ ১৫ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন—যা দেশজুড়ে সবচেয়ে বেশি।
রাজধানী ও আশপাশের অন্যান্য আসন—ঢাকা-৭, ঢাকা-৮, ঢাকা-১৫, ঢাকা-১৬, গাজীপুর-২ ও নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনেও ১০ থেকে ১৩ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন—যা এসব আসনে কঠিন লড়াইয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বেশ কয়েকটি জেলায় সীমিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা
ঢাকা বিভাগের তুলনায় বেশ কয়েকটি জেলায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা তুলনামূলকভাবে সীমিত। বরিশাল বিভাগের পিরোজপুর-১ আসনে সবচেয়ে কম প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা গেছে। এই আসনে লড়বেন মাত্র দুইজন প্রার্থী।
এছাড়া ঢাকা-২, চট্টগ্রাম-১৫, সুনামগঞ্জ-১, সুনামগঞ্জ-২, নেত্রকোনা-৫, মানিকগঞ্জ-২, টাঙ্গাইল-৭, খুলনা-২, নওগাঁ-২, জয়পুরহাট-২, ঠাকুরগাঁও-১, মেহেরপুর-২, চুয়াডাঙ্গা-১ ও চুয়াডাঙ্গা-২ আসনে মাত্র তিনজন করে প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এসব আসনে প্রার্থীসংখ্যা কম থাকায় নির্বাচনী প্রতিযোগিতার মাত্রা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কোনো আসনে প্রার্থীসংখ্যা খুব কম থাকলে তা অনেক সময় স্থানীয় ক্ষমতাকাঠামোর প্রভাব বা বিরোধীপক্ষের দুর্বল সংগঠনের ইঙ্গিত দেয়।
আঞ্চলিক বৈষম্য
অঞ্চলভেদে প্রার্থীসংখ্যায়ও স্পষ্ট বৈষম্য দেখা গেছে। ঢাকা অঞ্চলে প্রার্থীসংখ্যা সবচেয়ে বেশি এবং তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনের সংখ্যাও এখানে সর্বাধিক। এই অঞ্চলের ৪২টি আসনে মোট ৩৫২ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
কুমিল্লা অঞ্চল রয়েছে দ্বিতীয় অবস্থানে। এখানে সিটি করপোরেশন ও শিল্পাঞ্চল ঘিরে প্রতিযোগিতা তুলনামূলকভাবে বেশি। অন্যদিকে, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও উপকূলীয় এলাকাগুলোতে সমতল অঞ্চলের তুলনায় প্রার্থীসংখ্যা কম দেখা গেছে।
রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের অধিকাংশ আসনে মাঝারি ধরনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যাচ্ছে—যেখানে প্রতিটি আসনের বিপরীতে মোটামুটি ৫ থেকে ৮ জন প্রার্থী মাঠে রয়েছেন।
খুলনা ও বরিশাল বিভাগেও প্রার্থীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম, এসব বিভাগের একাধিক আসনে ৪ থেকে ৫ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
সিলেট বিভাগে সার্বিকভাবে প্রতিযোগিতা সবচেয়ে কম। এ বিভাগের অধিকাংশ আসনে প্রার্থীসংখ্যা ৪ থেকে ৬-এর মধ্যে।
সংখ্যাগুলো কী ইঙ্গিত দিচ্ছে
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশেষ করে ঢাকা মহানগরীর শহরাঞ্চলের আসনগুলোতে ক্রমেই বহু প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যাচ্ছে। বিপরীতে, মফস্বল ও গ্রামাঞ্চলের অনেক আসন এখনো সীমিত সংখ্যক রাজনৈতিক শক্তির দখলে রয়েছে।
তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ শহরাঞ্চলের আসনগুলোর দিকেই নজর বেশি থাকবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এসব আসনে ভোট বিভাজনের কারণে অপ্রত্যাশিত ফল আসতে পারে। অন্যদিকে, যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা কম, সেখানে ভোটার উপস্থিতিও তুলনামূলকভাবে কম থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, সব দলের অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে তারা।
রাজনৈতিক দলগুলোর একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ
বুধবার (২১ জানুয়ারি) জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের নির্বাচন কমিশনে উপস্থিত হয়ে বলেন, "আমরা এখনো দেখছি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের একটি অংশ পক্ষপাতমূলক আচরণ করছে। যে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড থাকার কথা, মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারীরা সেখানে একটি বিশেষ দলের দিকে ঝুঁকে পড়ছেন।"
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, "আমরা ইসিকে জানিয়েছি—যেসব কর্মকর্তা পক্ষপাতমূলক আচরণ করছেন, প্রয়োজনে তাদের তালিকাও একসময় জনসমক্ষে প্রকাশ করতে বাধ্য হব, যদি কমিশন যথাযথভাবে বিষয়টি দেখভাল না করে এবং তাদের নিরপেক্ষ থাকতে বাধ্য না করে। জনগণকে বিষয়টি জানানো আমাদের দায়িত্ব হয়ে দাঁড়াবে।"
এদিকে, গুলশানে বিএনপির কার্যালয়ে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে দলের মুখপাত্র মাহাদী আমীন বলেন, "আমরা একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন চাই। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, যদি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড থাকে এবং জনগণের ভোটের অধিকার সত্যিকার অর্থে মূল্যায়িত হয়, তাহলে অবশ্যই বিএনপি জনগণের রায় নিয়ে সরকার গঠন করবে।"
তিনি বলেন, "নির্বাচন কমিশনের কাছে আমাদের আহ্বান—লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা হোক, নির্বাচন যেন ত্রুটিমুক্ত ও বিতর্কমুক্ত থাকে। প্রতিটি দল যাতে নির্বাচন আচরণবিধি মেনে চলে, তা নির্বাচন কমিশনকে নিশ্চিত করতে হবে। ইতোমধ্যে বিএনপির কয়েকটি প্রতিনিধি দল নির্বাচন কমিশনে গিয়ে এসব বিষয় তুলে ধরেছে এবং কমিশনকে শক্ত অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।"
এদিন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সিনিয়র নায়েবে আমির মাওলানা ইউসুফ আশরাফ নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের বলেন, "কোনো কোনো দলের প্রধান ও দলের পক্ষ থেকে যেসব বক্তব্য আসছে এবং মিডিয়ায় প্রকাশিত হচ্ছে, সেসব বিষয়ে কমিশনের কোনো ব্যবস্থা চোখে পড়ছে না। এতে বোঝা যায়, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই।"
"আমরা বলেছি, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে হবে এবং সব দলকে সমান সুযোগ দিতে হবে," বলেন তিনি।
যোগাযোগ করা হলে নির্বাচন সংস্কার কমিশনের সদস্য এবং নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন তুলি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, প্রতীক বরাদ্দ হয়ে যাওয়ার পর নির্বাচন আচরণবিধি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করাই নির্বাচন কমিশনের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
তিনি বলেন, "রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা যদি নিয়ম যথাযথভাবে অনুসরণ না করেন, তাহলে পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়ার ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখা নির্বাচন কমিশনের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে।"
জেসমিন তুলি আরও বলেন, "আচরণবিধি শুধু কাগজে-কলমে থাকলেই হবে না, রাজনৈতিক দলগুলোকে তা বাস্তবে মেনে চলতে হবে।"
