‘আমরা কোনো পক্ষ নিই না’: নবনিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ক্রিস্টেনসেন
দুই দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন জানিয়েছেন, তার দেশ কোনো পক্ষ নেয় না এবং বাংলাদেশের মানুষ কাকে চায় সেটি তাদের একটি 'সার্বভৌম সিদ্ধান্ত'।
আজ বুধবার (২১ জানুয়ারি) রাজধানীর ইএমকে সেন্টারে সাংবাদিকদের একটি ছোট দলের সাথে তার প্রথম মতবিনিময়ের সময় তিনি বলেন, 'আমরা কোনো পক্ষ নিই না।'
মার্কিন এই রাষ্ট্রদূত দুই দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন এবং আগামী মাসে বাংলাদেশের 'ঐতিহাসিক নির্বাচনের' জন্য প্রতীক্ষায় আছেন বলে জানান।
আসন্ন নির্বাচন নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গি জানতে সম্প্রতি বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সাথে তার বৈঠকের পর রাষ্ট্রদূত বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শান্তি ও সমৃদ্ধি এগিয়ে নিতে বাংলাদেশের সকল রাজনৈতিক দলের সাথে কাজ করার জন্য উন্মুখ।
মার্কিন রাষ্ট্রদূত প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী এবং বিচার বিভাগ নিয়ে তার পরিকল্পনা এবং উভয় দেশের নিরাপত্তা জোরদার করার সম্ভাব্য ক্ষেত্রগুলো নিয়েও আলোচনা করেছেন। গণমাধ্যমের সাথে আলাপকালে তিনি বিস্তৃত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিষয়ে কথা বলেন এবং ইঙ্গিত দেন বাণিজ্য, অর্থনীতি এবং নিরাপত্তা সহযোগিতা হবে সম্পর্কের অগ্রাধিকার। রাষ্ট্রদূত বিশ্বাস করেন যে বাংলাদেশ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সহযোগিতার অনেক সুযোগ রয়েছে।
এর আগে ১৫ জানুয়ারি রাষ্ট্রদূত ক্রিস্টেনসেন বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের কাছে তার পরিচয়পত্র পেশ করেন এবং বাংলাদেশ-মার্কিন সম্পর্ক জোরদার করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। অনুষ্ঠানের পর এক সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে তিনি বলেন, 'আজ আমি রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের কাছে আমার রাষ্ট্রদূতের পরিচয়পত্র পেশ করার সম্মান পেয়েছি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে বন্ধু হিসেবে ডাকতে পেরে গর্বিত।'
৫০ বছরেরও বেশি সময়ের অংশীদারিত্বের কথা উল্লেখ করে মার্কিন রাষ্ট্রদূত জানান, তারা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, উভয় দেশের সুবিধাজনক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং মহান জাতিগুলোর সার্বভৌমত্ব প্রচারে একসাথে কাজ করেছেন। তিনি বলেন, 'আমি এই কাজ চালিয়ে যাওয়ার এবং মার্কিন-বাংলাদেশ সম্পর্ক আরও জোরদার করার জন্য উন্মুখ।'
বাংলাদেশে ১৯তম মার্কিন রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করাকে সম্মানের বলে উল্লেখ করেন ক্রিস্টেনসেন। তিনি তার স্ত্রী ডিন ডাওসহ গত ১২ জানুয়ারি ঢাকায় পৌঁছান। পৌঁছানোর পরপরই এক সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে তিনি জানান, তারা এমন একটি দেশে ফিরে আসতে পেরে রোমাঞ্চবোধ করছেন যেখানে তাদের অনেক মধুর স্মৃতি রয়েছে।
নবনিযুক্ত রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্ক বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন। রাষ্ট্রদূত ক্রিস্টেনসেন জানান, তিনি ঢাকা দূতাবাসে একটি দুর্দান্ত দলের নেতৃত্ব দিতে পেরে উৎসাহিত—যেখানে আমেরিকান এবং স্থানীয় কর্মী উভয়েই রয়েছেন। তিনি বলেন, 'এর লক্ষ্য হচ্ছে মার্কিন-বাংলাদেশ সম্পর্ক বৃদ্ধি করা, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এজেন্ডাকে এগিয়ে নেওয়া এবং আমেরিকাকে আরও নিরাপদ, শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ করতে প্রতিদিন কঠোর পরিশ্রম করা।'
ইউএস অ্যাম্বাসি ঢাকায় ক্রিস্টেনসেন তার প্রথম সপ্তাহটি চমৎকারভাবে কাটিয়েছেন বলে জানান। তিনি বলেন, 'পরিশ্রমী মার্কিন দূতাবাস দলে যোগ দিতে পেরে আমি গর্বিত এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অগ্রাধিকারগুলোকে এগিয়ে নিতে এবং মার্কিন-বাংলাদেশ সম্পর্ক আরও জোরদার করতে উন্মুখ।'
রাষ্ট্রদূত ক্রিস্টেনসেন গত ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে মার্কিন সিনেট কর্তৃক রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিশ্চিত হন। তিনি সম্প্রতি জানুয়ারি-অক্টোবর ২০২৫ পর্যন্ত অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার আন্ডার সেক্রেটারি অফ স্টেটের দায়িত্ব পালনকারী জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ছিলেন। এই ভূমিকায় তিনি নিরাপত্তা সহযোগিতা, নিরাপত্তা সহায়তা, সন্ত্রাসবাদ বিরোধী কার্যক্রম, মাদক বিরোধী এবং নিরস্ত্রীকরণে স্টেট ডিপার্টমেন্টের বৈশ্বিক প্রচেষ্টার তদারকি করেছেন।
সিনিয়র ফরেন সার্ভিসের একজন ক্যারিয়ার মেম্বার হিসেবে রাষ্ট্রদূত ক্রিস্টেনসেন এর আগে মার্কিন স্ট্র্যাটেজিক কমান্ডের কমান্ডারের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক উপদেষ্টা এবং বাংলাদেশের ঢাকা দূতাবাসে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিষয়ক কাউন্সিলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ফিলিপাইন, এল সালভাদর এবং ভিয়েতনামে মার্কিন মিশনে কাজ করেছেন।
তার অন্যান্য ভূমিকার মধ্যে রয়েছে রিজিওনাল সিকিউরিটি অ্যান্ড আর্মস ট্রান্সফার অফিসের ডেপুটি ডিরেক্টর, উত্তর কোরিয়া নীতি বিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধির বিশেষ সহকারী, মার্কিন হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভস কমিটি অন ফরেন অ্যাফেয়ার্সের ফেলো এবং দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক ব্যুরোতে বাংলাদেশ কান্ট্রি অফিসার। ক্রিস্টেনসেন মার্কিন ফেডারেল লেবার রিলেশনস অথরিটির অংশ ফরেন সার্ভিস ইমপাসেস ডিসপিউটস প্যানেলের দুজন ক্যারিয়ার ফরেন সার্ভিস মেম্বারের একজন হিসেবেও কাজ করেছেন।
ন্যাশনাল ওয়ার কলেজের একজন কৃতি স্নাতক ক্রিস্টেনসেন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে মাস্টার অব সায়েন্স ডিগ্রি অর্জন করেছেন। পাশাপাশি তিনি টেক্সাস এঅ্যান্ডএম ইউনিভার্সিটি থেকে পরিসংখ্যানে মাস্টার অব সায়েন্স এবং রাইস ইউনিভার্সিটি থেকে অর্থনীতি ও ব্যবস্থাপনা স্টাডিজে ব্যাচেলর অফ আর্টস ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি স্প্যানিশ, জার্মান এবং ভিয়েতনামী ভাষায় কথা বলেন এবং ফরাসি, জাপানি ও পর্তুগিজ ভাষা অধ্যয়ন করেছেন। ২০০২ সালে ফরেন সার্ভিসে যোগদানের আগে তিনি হিউস্টন এবং নিউইয়র্ক সিটিতে ম্যানেজমেন্ট কনসালটেন্ট হিসেবে কাজ করেছেন।
