‘দিন গুনতাম খাবার দেখে’: ট্রাইব্যুনালে গুম-নির্যাতনের বিবরণ দিলেন হুম্মাম কাদের চৌধুরী
গুমের ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় জবানবন্দি দিয়েছেন হুম্মাম কাদের চৌধুরী। জবানবন্দিতে হুম্মাম বলেছেন, আয়নাঘরে গুম থাকা অবস্থায় দিন-রাতের পার্থক্য বুঝতে পারতেন না। দিন গুনতেন খাবার দেখে। খাবারের জন্য রুটি আনলে বুঝতে পারতেন, নতুন দিন শুরু হয়েছে। দুপুর ও রাতের খাবারে থাকত ভাত, এক পিস মাছ অথবা এক পিস মুরগি, সঙ্গে কিছু সবজি। একদিন বিরিয়ানি দেওয়া হলে তিনি বুঝতে পারেন, সেটি ছিল ঈদের দিন।
এভাবেই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের শাসনামলে গুম হওয়ার পর জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেন্টার (জেআইসি) সেলে—যা আয়নাঘর নামে পরিচিত—আটক ও নির্যাতনের ঘটনা এভাবেই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) তুলে ধরেন বিএনপির প্রয়াত নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছেলে হুম্মাম কাদের চৌধুরী।
জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেন্টারে গুম-নির্যাতনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনাসহ ১৩ আসামির বিরুদ্ধে গতকাল (১৯ জানুয়ারি) বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ তিনি সাক্ষ্য দেন। এই মামলায় তিনি প্রথম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিরেন।
এর আগে আজ এই মামলায় সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। এর মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে মামলাটির বিচার শুরু হলো। সূচনা বক্তব্যের পর হুম্মামের সাক্ষ্যগ্রহণ (জবানবন্দি) শুরু হয়।
জবানবন্দিতে হুম্মাম বলেন, ২০১৬ সালের ৪ আগস্ট তাকে গুম করা হয়। গুম থাকা অবস্থায় তিনি দিন-রাতের পার্থক্য বুঝতে পারতেন না। দিন গুনতেন খাবার দেখে। খাবারের জন্য রুটি আনলে বুঝতে পারতেন, নতুন দিন শুরু হয়েছে। দুপুর ও রাতের খাবারে থাকত ভাত, এক পিস মাছ অথবা এক পিস মুরগি, সঙ্গে কিছু সবজি। একদিন বিরিয়ানি দেওয়া হলে তিনি বুঝতে পারেন, সেটি ঈদের দিন ছিল।
'প্রথম দুই মাস আমি একটি পেরেক দিয়ে দেয়ালে দাগ দিয়ে দিনের হিসাব রাখতাম। দুই মাস পর হিসাব রাখা বন্ধ করে দিই। পেরেকটি জানালার কোনায় পেয়েছিলাম,' জবানবন্দিতে বলেন হুম্মাম।
কক্ষের ভেতর দেয়ালে অনেক কিছু লেখা ছিল বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন হুম্মাম। তিনি বুঝতে পারেন, তার আগে যারা ওই কক্ষে বন্দি ছিলেন, তাদের লেখা ছিল সেগুলো। একজন লিখেছিলেন, 'আপনাকে কত দিন এখানে রাখা হবে, তা কেউ আপনাকে বলবে না।'
তিনি আরও বলেন, অন্য পাশের দেয়ালে বাংলাদেশের পতাকা আঁকা ছিল। তিনি যে কক্ষে ছিলেন, তার দৈর্ঘ্য ১৫ থেকে ১৮ ফুট, প্রস্থ ৮ থেকে ১০ ফুট। তিনি দেয়ালের এক কোনায় তার নামের আদ্যাক্ষর (এইচকিউসি) ও তার গুম হওয়ার তারিখ পেরেক দিয়ে লিখে রেখেছিলেন।
হুম্মাম বলেন, 'গুম থাকাকালে মাঝেমধ্যে জিজ্ঞাসাবাদের সময় আমাকে মারধর করা হতো। বাবার রাজনীতির বিষয়ে আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হতো। আমি আওয়ামী লীগের বিরোধিতা করি কি না, বিদেশি কোনো গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে আমার যোগাযোগ আছে কি না, এসব বিষয়ে আমাকে বারবার জিজ্ঞাসা করা হতো।'
এই মামলার আসামি ১৩ জন। এর মধ্যে ১২ জনই বর্তমান বা সাবেক সেনা কর্মকর্তা।
আসামিদের মধ্যে তিনজন গ্রেপ্তার আছেন। তারা হলেন প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) সাবেক তিন পরিচালক মেজর জেনারেল শেখ মো. সরওয়ার হোসেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহবুবুর রহমান সিদ্দিকী ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ তানভির মাজাহার সিদ্দিকী। সোমবার তাদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।
মামলার বাকি ১০ আসামি পলাতক আছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন ডিজিএফআইয়ের সাবেক পাঁচ মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. আকবর হোসেন, মেজর জেনারেল (অব.) মো. সাইফুল আবেদিন, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. সাইফুল আলম, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আহমেদ তাবরেজ শামস চৌধুরী ও মেজর জেনারেল (অব.) হামিদুল হক।
পলাতক আসামিদের মধ্যে আরও আছেন ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ তৌহিদুল উল ইসলাম, মেজর জেনারেল কবীর আহাম্মদ ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মখছুরুল হক। এছাড়া শেখ হাসিনা ও তার প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিকও এই মামলার আসামি।
