শেষ হলো আপিল শুনানি: দ্বৈত নাগরিকত্ব ইস্যুতে বেশিরভাগ প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা ইসির
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে প্রার্থিতার যেসব চ্যালেঞ্জ এসেছিল, ওই প্রার্থীদের বেশিরভাগেরই মনোনয়ন বহাল রেখেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ফলে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে তাদের অংশগ্রহণের পথ সুগম হলো।
গতকাল (১৮ জানুয়ারি) আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে আপিল শুনানির শেষ দিনে এসব সিদ্ধান্ত আসে। একটি বাদে পেন্ডিং সব আবেদনের রায় আজ ঘোষণা করেছে কমিশনের আপিল বোর্ড।
নির্বাচন কর্মকর্তারা জানান, দ্বৈত নাগরিকত্ব ইস্যুতে রিটার্নিং অফিসারদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে করা আপিলগুলো পর্যালোচনা করে কমিশন অধিকাংশ প্রার্থীকেই যোগ্য ঘোষণা করেছে।
তবে দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগে কুমিল্লা-১০ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মো. আবদুল গফুর ভূঁইয়ার প্রার্থিতা বাতিল করেছে কমিশন।
অন্যদিকে দ্বৈত নাগরিকত্বের ইস্যুতে কুমিল্লা-৩ আসনের বিএনপি প্রার্থী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদের প্রার্থিতার সিদ্ধান্তের বিষয়টি পেন্ডিং রেখেছে নির্বাচন কমিশন। তার মনোনয়ন গ্রহণের বিরুদ্ধে আপিল করেন জামায়াত প্রার্থী মো. ইউসুফ সোহেল। কর্মকর্তারা জানান, এই আবেদনের বিষয়ে আজ সোমবারই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
নির্বাচন কমিশনের জনসংযোগ পরিচালক রুহুল আমিন মল্লিক জানান, শেষ দিনে মোট ৬৩টি আপিলের শুনানি হয়েছে। শুনানিতে ২৩টি আপিল মঞ্জুর হয়েছে। এর মধ্যে মনোনয়নপত্র বাতিলের বিরুদ্ধে মঞ্জুর হয়েছে ২১টি আবেদন (যারা প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন) এবং মনোনয়নপত্র গ্রহণের বিরুদ্ধে মঞ্জুর হয়েছে ২টি আবেদন (বাদ পড়েছেন)।
যাদের মনোনয়ন বহাল বা পুনর্ববহাল হয়েছে, তাদের মধ্যে রয়েছেন ফেনী-৩ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আব্দুল আউয়াল মিন্টু, মানিকগঞ্জ-৩ আসনে আফরোজা খানম রিতা, দিনাজপুর-৫ আসনে এ কে এম কামরুজ্জামান, ফরিদপুর-২ আসনে শামা ওবায়েদ, মৌলভীবাজার-২ আসনে শওকাতুল ইসলাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ আসনে কবির আহমেদ ভূঁইয়া, সাতক্ষীরা-৪ আসনে মনিরুজ্জামান, সুনামগঞ্জ-২ আসনে তাহির রায়হান ও শেরপুর-২ আসনে ফাহিম চৌধুরী।
ছাত্রদলের বিক্ষোভ ও প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনার মধ্যে গতকাল সকাল থেকে নির্বাচন ভবনের চারপাশে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। শৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ, র্যাব, সেনাবাহিনী ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্যদের মোতায়েন করা হয়।
আপিলে ছিটকে পড়লেন বিএনপির ৩ হেভিওয়েট নেতা
চট্টগ্রাম-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী সারোয়ার আলমগীর ও কুমিল্লা–১০ আসনে দলটির প্রার্থী আবদুল গফুর ভুইয়ার মনোনয়নপত্র বাতিল করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। রিটার্নিং কর্মকর্তার বাছাইয়ে এই দুজনের মনোনয়নপত্র বৈধ হয়েছিল।
ঋণখেলাপি হওয়ায় চট্টগ্রাম-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী সারোয়ার আলমগীরের মনোনয়নপত্র বৈধতার বিরুদ্ধে করা আপিল মঞ্জুর করেছে ইসি। এতে তার প্রার্থিতা বাতিল হয়। এর ফলে ওই আসনে জামায়াত প্রার্থী মোহাম্মদ নুরুল আমিনের জন্য লড়াই সহজ হয়ে গেল।
কুমিল্লা-৪ আসনে ঋণখেলাপের দায়ে বিএনপি প্রার্থী মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে। এর ফলে এনসিপি মনোনীত প্রার্থী হাসনাত আবদুল্লাহর নির্বাচনি লড়াই অনেকটা সহজ হয়ে গেল বলে মনে করা হচ্ছে। হাসনাতের মনোনয়নের বিরুদ্ধে করা একটি আপিলও কমিশন খারিজ করে দিয়েছে, ফলে তার প্রার্থিতা এখন সম্পূর্ণ বৈধ।
কুমিল্লা-১০ আসনে দ্বৈত নাগরিকত্বের কারণে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মো. আব্দুল গফুর ভূঁইয়া অযোগ্য ঘোষিত হয়েছেন। অন্যদিকে বিএনপির আরেক সম্ভাব্য প্রার্থী মো. মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়াও তার প্রার্থিতা ফিরে পাননি।
এদিকে চট্টগ্রাম-৪ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আসলাম চৌধুরীর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেছে কমিশন। আপিল শুনানি চলাকালে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ তার উদ্দেশে বলেন, 'মনোনয়নপত্র বৈধ করলাম। ব্যাংকের টাকাটা (ঋণ) দিয়ে দিয়েন। টাকাটা না দিলে কিন্তু জনরোষ তৈরি হবে। মানুষ হিসেবে এটা আপনাকে বললাম।'
আপিলে প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন জামায়াতের অধিকাংশ প্রার্থী
দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগে ঢাকা-১ আসনে জামায়াতে প্রার্থী মোহাম্মদ নজরুল ইসলামের মনোনয়নের বিরুদ্ধে করা আপিল খারিজ করে দিয়েছে ইসি। ফলে তার প্রার্থিতা বহাল রয়েছে। ঢাকা-২ আসনে মো. আব্দুল হক ঋণখেলাপের অভিযোগে প্রথমে বাদ পড়লেও আপিলে প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন।
কক্সবাজার-২ আসনে জামায়াতের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদও নির্বাচনি দৌড়ে ফিরেছেন। আদালত অবমাননার তথ্য গোপনের অভিযোগে তার মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছিল।
দ্বৈত নাগরিকত্বের জন্য প্রার্থিতা বাতিল হওয়া যশোর-২ আসনের মোহাম্মদ মাসলেহ উদ্দিন ফরিদও প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন। এছাড়াও ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনে জুনায়েদ হাসান, চট্টগ্রাম-৯ আসনে এ কে এম ফজলুল হক ও কুড়িগ্রাম-৩ আসনে মাহবুবুল আলমকে যোগ্য ঘোষণা করেছে কমিশন।
স্বতন্ত্র ও ছোট দলগুলোর অবস্থান
মোট ভোটারের ১ শতাংশ স্বাক্ষরের শর্ত পূরণ করতে না পেরে শুরুতে বাদ পড়া বেশ কয়েকজন স্বতন্ত্র ও ছোট দলের প্রার্থীও আপিলে প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন। ঢাকা-৯ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারা ও বগুড়া-২ আসনে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না তাদের প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন।
দ্বৈত নাগরিকত্বের জন্য বাতিল হওয়া প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন সিলেট-১ আসনে এনসিপি প্রার্থী এহতেশামুল হক। এছাড়া টাঙ্গাইল-৪ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীর মনোনয়ন বহাল রেখেছে কমিশন; তার বিরুদ্ধে জাতীয় পার্টির লিয়াকত আলীর করা আপিল নাকচ করে দেওয়া হয়েছে।
পুরো আপিল প্রক্রিয়ায় মোট ৪১৭ জন প্রার্থী তাদের প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন। ২৯ ডিসেম্বর মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময় পর্যন্ত সারা দেশে প্রায় ২ হাজার ৫০০ মনোনয়ন জমা পড়েছিল।
আপিল শুনানি শেষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিন বলেন, 'আমাদের কিছু কার্যক্রমে আপনারা হয়তো আমাদের সমালোচনা করতে পারেন। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ক্ষেত্রে এক শতাংশ ভোটের বিষয়টা আমরা কীভাবে ছেড়ে দিয়েছি এটা আপনারা দেখেছেন। কারণ আমরা অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন চেয়েছি। আমরা চাই যে সবার অংশগ্রহণে একটা সুন্দর নির্বাচন হোক। সে বিষয়ে আপনারা সহযোগিতা না করলে কিন্তু হবে না।'
