শীতে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে ট্রলি সংকট: যাত্রীদের ভোগান্তির নেপথ্যে কী?
চলতি শীত মৌসুমে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে যাত্রীদের জন্য বড় ভোগান্তির নাম হয়ে উঠেছে ট্রলি সংকট। আন্তর্জাতিক রুটের যাত্রীদের লাগেজ সংগ্রহের জন্য ট্রলি পেতে অনেক সময় এক থেকে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। বিশেষ করে ভোর ও সকালের দিকে যারা অবতরণ করছেন, তাদের ভোগান্তি সবচেয়ে বেশি। যাত্রীরা বলছেন, আগের বছরগুলোর শীতকালে এমন চরম পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়নি।
সম্প্রতি একাধিক যাত্রী টিবিএসকে জানিয়েছেন, লাগেজ সংগ্রহের পর ট্রলি না পেয়ে তারা দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে ছিলেন। শুক্রবার ঢাকা বিমানবন্দরে এক ব্যবসায়ী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, 'আজ ট্রলি পেতে আমাকে প্রায় দুই ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে।'
বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের দাবি, ট্রলির প্রকৃত কোনো সংকট নেই। বরং শীতকালীন কুয়াশার কারণে ফ্লাইট শিডিউল ভেঙে পড়া এবং নির্দিষ্ট সময়ে অতিরিক্ত ফ্লাইটের চাপই এই সংকটের মূল কারণ।
ঢাকা বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন রাগিব সামাদ টিবিএসকে বলেন, 'ঘন কুয়াশা ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে সকালে অনেকগুলো ফ্লাইট দেরিতে এসে প্রায় একসঙ্গে নামছে। দেরির কারণে বিপুল সংখ্যক যাত্রী একই সময়ে টার্মিনালে পৌঁছাচ্ছেন, যা ব্যাগেজ প্রসেসিং ও যাত্রী বের হওয়ার প্রক্রিয়া ধীর করে দিচ্ছে।'
তিনি আরও বলেন, 'ঢাকা বিমানবন্দরে মাত্র আটটি ব্যাগেজ বেল্ট রয়েছে। একটি বেল্ট পুরোপুরি খালি না হলে সেখানে নতুন ফ্লাইটের লাগেজ দেওয়া যায় না। ফলে যখন একসঙ্গে ১৩ থেকে ১৫টি ফ্লাইট আসে, যাত্রীদের দীর্ঘ অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় থাকে না।'
এই বিলম্বের সরাসরি প্রভাব পড়ে ট্রলি প্রাপ্তিতে। যাত্রীরা ইমিগ্রেশন শেষ করে ব্যাগেজ সংগ্রহের আগে ট্রলি নেন। কিন্তু আগের ফ্লাইটের যাত্রীরা বের হতে দেরি করায় ট্রলিগুলো দ্রুত ফিরে আসছে না বা রিসাইকেল হচ্ছে না। ঢাকায় আগমন ও প্রস্থান মিলিয়ে মোট ৩ হাজার ৭০০ ট্রলি থাকলেও পিক আওয়ারের চাপ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
রাগিব সামাদ জানান, ভোর থেকে দুপুর ২টা বা আড়াইটা পর্যন্ত চাপ সবচেয়ে বেশি থাকে। এরপর শিডিউল স্বাভাবিক হলে পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি হয়। চাপ কমাতে চট্টগ্রাম থেকে অতিরিক্ত ১০০ ট্রলি আনা হয়েছে এবং মেরামতে থাকা ট্রলিগুলো দ্রুত সচল করা হয়েছে।
একই চিত্র চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও। সেখানকার নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন শেখ আব্দুল্লাহ আলমগীর জানান, বিমানবন্দরে ৬০০ ট্রলি প্রয়োজন হলেও আছে প্রায় ১ হাজার ২০০টি। তবুও শীতে একসঙ্গে ৬-৭টি ফ্লাইট অবতরণ করায় সাময়িক সংকট তৈরি হচ্ছে। জানুয়ারি মাসজুড়ে এই চাপ থাকতে পারে বলে তিনি জানান।
এবারের পরিস্থিতি কেন বেশি জটিল?
বিমান চলাচল সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবারের ট্রলি সংকটের নেপথ্যে বড় কারণ হলো ঢাকা বিমানবন্দরের ইনস্ট্রুমেন্ট ল্যান্ডিং সিস্টেম (আইএলএস) ক্যাটাগরি অবনমন বা ডাউনগ্রেড হওয়া।
ঘন কুয়াশায় রানওয়ের দৃশ্যমানতা নিরাপদ সীমার নিচে নেমে গেলে ফ্লাইটগুলো কলকাতা, সিলেট বা চট্টগ্রামে ডাইভার্ট (দিক পরিবর্তন) করতে হচ্ছে। পরে আবহাওয়া ভালো হলে এই ফ্লাইটগুলো একসঙ্গে ঢাকায় এসে নামছে, ফলে টার্মিনালে যাত্রীদের ভয়াবহ জট তৈরি হচ্ছে।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সহকারী পরিচালক (জনসংযোগ) মুহাম্মদ কাউসার মাহমুদ জানান, গত ২৯ অক্টোবর থাই এয়ারওয়েজের একটি বিমান অবতরণের সময় রানওয়ের লাইটিং সিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে আইএলএস ক্যাটাগরি-২ বজায় রাখার শর্ত পূরণ করা যাচ্ছে না। ক্ষতিগ্রস্ত লাইটগুলো বিদেশ থেকে আমদানির জন্য ইতোমধ্যে টেন্ডার প্রক্রিয়া চলছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বর্তমানে শাহজালাল বিমানবন্দর আইএলএস ক্যাটাগরি-১ সুবিধায় পরিচালিত হচ্ছে। এই ক্যাটাগরিতে নিরাপদে নামার জন্য কমপক্ষে ১ হাজার ২০০ মিটার দৃশ্যমানতা প্রয়োজন। অথচ ক্যাটাগরি-২ থাকলে ৫০০ থেকে ৭৫০ মিটার দৃশ্যমানতাতেও বিমান নামতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইএলএস ক্যাটাগরি-২ সুবিধা বজায় রাখতে রানওয়ের লাইটিং সিস্টেমের অন্তত ৯৫ শতাংশ কার্যকর থাকতে হয়। বর্তমানে সেন্টারলাইনসহ বিভিন্ন লাইটের কার্যকারিতা ওই মানের নিচে নেমে যাওয়ায় কর্তৃপক্ষ ক্যাটাগরি-২ সুবিধা দিতে পারছে না। এর পরোক্ষ প্রভাবেই তৈরি হচ্ছে ফ্লাইট জট, যাত্রী চাপ এবং শেষ পর্যন্ত তীব্র ট্রলি সংকট।
