অন্তর্বর্তী সরকার নগরের সমস্যা সমাধানে তেমন কোনো কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারেনি: নগর বিশেষজ্ঞরা
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে নগর এলাকায় নাগরিকদের সমস্যা সমাধানে তারা তেমন কোনো কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারেনি বলে জানিয়েছেন নগর বিশেষজ্ঞরা।
শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি) আয়োজিত '২০২৫ সালে বাংলাদেশের নগর এলাকার পরিকল্পনা, উন্নয়ন, পরিবেশ ও ন্যায্যতা: নাগরিকদের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি'- শীর্ষক ওয়েবিনারে তারা এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানের মূল প্রবন্ধে আইপিডির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, 'বিগত বছর অন্তর্বর্তী সরকার পরিকল্পনা, ইমারত নির্মাণ, নগরায়ন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন আইন ও বিধিমালা তৈরি করেছে। কিন্তু নগর এলাকায় নাগরিকদের সমস্যা সমাধানে তেমন কোনো কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারেনি। মাঠ-পার্কের দখলদারিত্ব আগের মতোই রয়ে গেছে।'
তিনি আরও বলেন, 'নগর এলাকায় অনেক মাঠেই জনগণের প্রবেশ নিয়ন্ত্রিত। ময়মনসিংহ, বরিশাল, রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠন করেছে, যা আমলাতান্ত্রিক নির্ভরতা বাড়াবে। বিপরীতে নগর সরকার গঠনের ব্যাপারে নীরব থেকেছে।'
ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, 'খাল, নদী, জলাশয় দখল ও দূষণকারীদের সরকার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে ব্যর্থ হয়েছে। নাগরিক আন্দোলনের ব্যাপারে সরকার ছিল নির্লিপ্ত। নগর ও পরিবেশ সংক্রান্ত বিষয়ে গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে। নগর ব্যবস্থাপনায় মনোযোগের ঘাটতি ছিল। নগর সংস্থাসমূহের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে পারেনি। নগর এলাকায় রাজনৈতিক দূর্বৃত্তপরায়ণতার ব্যাপারে সরকার ছিল উদাসীন।'
বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি ড. মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বলেন, 'স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরেও আমরা সামগ্রিকভাবে দেশের জাতীয় পর্যায়ের স্থানিক পরিকল্পনা প্রস্তুত করতে পারিনি। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্রভাবে যা তৈরি হয়েছে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দিকে প্রয়োজনীয় অগ্রগতি নেই। ফলে সারা দেশে একটিও পরিকল্পিত শহর দেশে নেই।'
তিনি আরও বলেন, 'বিভিন্ন উন্নয়ন কর্তৃপক্ষসহ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দায়িত্বে যারা আছেন, তারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আমলা বা প্রশাসক। পেশাজীবীদের অন্তর্ভুক্ত করা অতীব জরুরি। বিশেষ করে পরিকল্পনাবিদদের নেতৃত্বে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হবে এটাই কাম্য।'
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফরহাদুর রেজা বলেন, 'অন্তর্বতী সরকার থেকে পরিকল্পনা বিষয়ক প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে বড় একটি ফাঁক রয়ে গিয়েছে। ড্যাপের সংশোধনের জন্য ঢাকা শহরে যে জনঘনত্ব বেড়ে যাবে, তাতে শহর আরও স্থবির হয়ে পড়বে।'
তিনি বলেন, 'রাজউক উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণের কাজ থেকে সরে গিয়ে আবাসন বাণিজ্যে লিপ্ত আছে। ঢাকা শহরের অল্প কিছু পার্ক আছে। পান্থকুঞ্জ পার্ক এই সরকারের সময়েও ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। পার্ক রক্ষার ক্ষেত্রে আইনি পদক্ষেপ জোরদার করতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। জলাবদ্ধতার মতো বিষয়গুলো যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। উন্নয়নের সঙ্গে ন্যায্যতা ও পরিবেশকে উপেক্ষা করবার কোনো সুযোগ নেই।'
আইপিডি সদস্য প্রকৌশলী তোফায়েল আহমেদ সজীব বলেন, 'রাজউকসহ রাষ্ট্রের নগর সংস্থাগুলো বিএনবিসি কোডের এনফোর্সমেন্ট করতে ব্যর্থ হয়েছে। দেশে অনুমোদনহীন ভবন নির্মাণের প্রবণতা এখনও আছে, যার ফলে আমাদের ক্রমাগত ঝুঁকি বাড়ছে। নাগরিক জীবনের ঝুঁকি কমাতে পরিকল্পনা ও ভবন নির্মাণ সংশ্লিষ্ট আইনের বাস্তবায়নে সরকার সফল হতে পারেনি।'
অনুষ্ঠানে আরও বলা হয়, 'গণঅভ্যুত্থানের পর আমাদের নগর এলাকাগুলোকে বাসযোগ্য, ন্যায্য ও টেকসই করবার ব্যাপারে রাষ্ট্র ও সরকার কার্যকর ব্যবস্থা নেবে, এটা নাগরিকদের প্রত্যাশা ছিল। ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকার জাতীয় নগর নীতি ও স্থানিক পরিকল্পনা অধ্যাদেশ অনুমোদন দিয়েছে, যা ইতিবাচক। তথাপি ঢাকাসহ বিভিন্ন বিভাগীয় শহর, জেলা, উপজেলা ও পৌর এলাকার নগর উন্নয়ন, ব্যবস্থাপনা, পরিকল্পনা ও পরিবেশের ব্যাপারে কার্যকর উদ্যোগ নিতে ব্যর্থ হয়েছে।'
বলা হয়, 'ব্যবসায়ীদের চাপে ঢাকার বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা বা ড্যাপের পরিবর্তন করেছে। নদী-খাল, জলাশয়-জলাভূমি দখলকারী কিংবা নগর এলাকায় বিপজ্জনক শিল্প-কারখানার মাধ্যমে বায়ু দূষণকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে। শহরের যানজট-জলজট-শব্দদূষণ দূর করতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারেনি।'
আরও বলা হয়, 'স্থানীয় পর্যায়ে ওয়ার্ড কাউন্সিল ছিল না। এলাকার সমস্যা সমাধানে সরকার পাড়া-মহল্লার মানুষ কিংবা কমিউনিটিকে সম্পৃক্ত করতে পারেনি। বিশেষত নগরে নিম্ন আয়ের ও প্রান্তিক এলাকায় বসবাসরত মানুষের দুঃখ-দুর্দশা আরও বেড়েছে। আগামী নির্বাচিত সরকারকে বড় প্রকল্পে মনোযোগ না দিয়ে নগর এলাকার সমস্যা সমাধানে কার্যকর পরিকল্পনা, সমন্বিত উদ্যোগ, উন্নয়ন ব্যবস্থাপনা ও জনঅংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।'
