আসন সমঝোতা নিয়ে অসন্তোষ, জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটে অনিশ্চয়তা
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটে আসন সমঝোতা নিয়ে বাংলাদেশ ইসলামী আন্দোলনের নেতাকর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
এ নিয়ে শরিক দলগুলোর সঙ্গে এবং দলের ভেতরে একাধিক স্তরে বৈঠক হলেও এখনো কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি। একই ধরনের অবস্থান মামুনুল হকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফতে মজলিসেরও।
বুধবার (১৪ জানুয়ারি) বিকেলে ১১ দলীয় জোটের সমন্বয়ক ও জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আজাদ আসন সমঝোতা নিয়ে সংবাদ সম্মেলন আহ্বান করলেও পরে অনিবার্য কারণ দেখিয়ে তা স্থগিত করা হয়।
পরে জামায়াতের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের অনুরোধে সংবাদ সম্মেলন স্থগিত করা হয়েছে। তবে বিষয়টি অস্বীকার করে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ পৃথকভাবে একটি বিবৃতি দেয়।
গত বছরের ৮ ডিসেম্বর থেকে আট দলের মধ্যে আসন সমঝোতা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। এরপর ২৮ ডিসেম্বর জাতীয় নাগরিক পার্টি, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি ও আমার বাংলাদেশ পার্টি জোটে যোগ দেয়। পরবর্তীতে দলগুলো স্বতন্ত্রভাবে ৩০০ আসনে মনোনয়ন জমা দেয়।
জোটের কয়েকটি দলের শীর্ষ নেতারা জানান, শুরুতে জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে আসন সমঝোতার নীতি থাকলেও পরে কয়েকটি দল নির্দিষ্ট আসনসংখ্যা দাবি করতে শুরু করে। এতে ইসলামী আন্দোলন ৭০টির বেশি আসন চাইলে জামায়াত সর্বোচ্চ ৪০ থেকে ৪৫টি আসন দিতে রাজি হয়।
বাংলাদেশ খেলাফতে মজলিস ২৫টি আসনে নির্বাচন করতে চাইলেও জামায়াত তাদের সর্বোচ্চ ১৫টি আসন দিতে চায়। অন্য নয়টি দলের সঙ্গে আসন সমঝোতা প্রায় চূড়ান্ত হলেও ইসলামী আন্দোলন ও খেলাফতে মজলিসের সঙ্গে এখনো আলোচনা চূড়ান্ত হয়নি।
বুধবার সকাল থেকেই দলগুলো নিজেদের মধ্যে ও শরিকদের সঙ্গে বৈঠক করে। রাতে শীর্ষ নেতৃত্বের আরও কয়েকটি বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। এরপরই চূড়ান্ত ঘোষণা আসতে পারে, যা আজ বৃহস্পতিবারও (১৫ জানুয়ারি) হতে পারে।
বুধবার বেলা সোয়া দুইটার দিকে জামায়াতে ইসলামীর পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়। সেখানে ১১ দলীয় জোটের সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আজাদ সংবাদ সম্মেলন স্থগিতের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
জোটের নেতারা বলেন, জামায়াত কিছু সিদ্ধান্ত এককভাবে নিয়েছে, যা অন্য দলগুলো ভালোভাবে নেয়নি। বিশেষ করে জাতীয় নাগরিক পার্টি, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি ও আমার বাংলাদেশ পার্টিকে আসন সমঝোতায় আনার ক্ষেত্রে জামায়াত তাদের সঙ্গে আলাদা করে বৈঠক করে, যা আগে অন্য শরিকদের জানানো হয়নি। এতে অসন্তোষ তৈরি হয়।
এরপর আসনসংখ্যা নিয়ে ইসলামী আন্দোলনের আপত্তি আরও স্পষ্ট হয়। দলটি শুরুতে শতাধিক আসনে নির্বাচন করতে চাইলেও আলোচনার পর ধাপে ধাপে সেই দাবি কমিয়ে সর্বশেষ ৫০টির বেশি আসন দাবি করে। তবে জামায়াত তাদের ৪০টি আসন দিতে চায়। ইসলামী আন্দোলনের অনেক নেতা এই প্রস্তাবে রাজি নন।
এদিকে জোটের অভ্যন্তরে অস্থিরতা ও ভাঙনের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে বগুড়া-৩ আসনে জামায়াতের প্রার্থী নূর মোহাম্মদের একটি ফেসবুক স্ট্যাটাসের মাধ্যমে। দুপুরে তিনি তার ভেরিফাইড প্রোফাইলে লেখেন, 'হ্যাঁ, সত্য এটাই— ১১ দলের সমঝোতা ভেঙে যাচ্ছে।'
নূর মোহাম্মদ তার পোস্টে আরও উল্লেখ করেন, ইসলামি আন্দোলন গত রাতে তাদের মজলিসে শুরা এবং সংসদ সদস্য প্রার্থীদের ডেকে মতামত নিয়েছে। সেখানে অধিকাংশ সদস্যই জোটের সমঝোতা থেকে বেরিয়ে এককভাবে নির্বাচন করার পক্ষে মত দিয়েছেন।
সমস্যার মূল কারণ ব্যাখ্যা করে নূর মোহাম্মদ লেখেন, 'ইসলামী আন্দোলনকে সমঝোতায় চূড়ান্তভাবে ৪৫টি আসন ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। ইসলামী আন্দোলনের দাবি এখন ৬৫-৭০ আসনের মতো। নির্বাচন পরবর্তী সরকার কাঠামো নিয়েও স্পষ্ট ঘোষণা চায়। সরকার গঠিত হলে কে কোথায় থাকবে, এগুলো স্পষ্ট চায়। ইতোমধ্যে অনেককিছু স্পষ্ট করা হয়েছে, যেগুলো আরও স্পষ্ট করা দরকার, সেগুলো নিয়ে আলাপ হতে পারে।'
তিনি আরও জানান, ইসলামি আন্দোলনের শীর্ষ নেতাদের ওপর তৃণমূলের নেতাকর্মীদের প্রচণ্ড চাপ তৈরি হয়েছে। জোটের কারণে অনেক আসনে প্রার্থী প্রত্যাহার করায় ওই সব এলাকার নেতাকর্মীরা নাখোশ, যা শীর্ষ নেতৃত্বকে সিদ্ধান্ত বদলাতে বাধ্য করছে।
'এক বাক্স'নীতিতে অনড় ইসলামী আন্দোলন
এদিকে বুধবার বিকেলে এক সংবাদ সম্মেলনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ (আইএবি) 'এক বাক্স' নীতি থেকে সরে আসছে না বলে জানিয়েছেন দলটির মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান।
তবে তিনি স্বীকার করেছেন, ইসলামপন্থী দলগুলোর চলমান জোট ও আসন সমঝোতা নিয়ে অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি।
গাজী আতাউর রহমান বলেন, "আমরা 'এক বাক্স'পলিসিতে এখনো আছি, ইনশাআল্লাহ থাকব। আগামী এক–দুই দিনের মধ্যে আমরা কীভাবে নির্বাচনে অংশ নেব এবং এই নীতি কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, তার রূপরেখা আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে।"
তার অভিযোগ, জোটের কোনো দলই ইসলামী আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ আসনগুলোতে ছাড় দেয়নি। বরং দেশের বিভিন্ন আসনে জোটের নাম ব্যবহার করে আগাম প্রচারণা চালানো হচ্ছে, যা সমঝোতার পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
"আমরা হুজুগে কোনো সিদ্ধান্ত নেব না। সবকিছু রেশনালি, নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সিদ্ধান্ত নেব," বলেন তিনি ।
বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত জনমত জরিপ নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন দলটির মুখপাত্র। তিনি দাবি করেন, "এসব জরিপ পক্ষপাতদুষ্ট এবং বিভ্রান্তিকর।"
তিনি জানান, তবে আজকের সংবাদ সম্মেলন স্থগিত করার বিষয়ে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমীর কাউকে কোনো অনুরোধ করেননি।
'ইসলামী আন্দোলনের আমীরের অনুরোধে ১১ দলের সংবাদ সম্মেলন স্থগিত' বলে যে সংবাদ প্রচারিত হয়েছে তার কোনো সত্যতা নাই বলে উল্লেখ করেন তিনি।
চলমান সংকটের মধ্যে ধৈর্য ধরার আহ্বান জামায়াত আমিরের
এদিকে জোটের চলমান সংকটের মধ্যে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে এক বার্তায় তিনি লিখেছেন, 'বহু ত্যাগ এবং কুরবানির সিঁড়ি বেয়ে প্রিয় সংগঠন ও জাতি মহান আল্লাহ তাআলার একান্ত মেহেরবানিতে এ পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে। সময়টা জাতীয় জীবনের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি বাঁক।'
বিচক্ষণতার পরিচয় দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি আরও বলেন, 'এ সময়ে সকলকে সর্বোচ্চ প্রজ্ঞা ও ধৈর্যের পরিচয় দিতে হবে, দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। কারও ব্যাপারেই কোনো ধরনের বিরূপ আচরণ করা থেকে বিরত থাকতে হবে।'
