ন্যায্যমূল্য ও মজুরি নিশ্চিতে রাজনৈতিক দলগুলোর বাস্তবধর্মী পরিকল্পনার তাগিদ
বাংলাদেশে ন্যায্যমূল্য ও মজুরি নিশ্চিত না হওয়া নাগরিকদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতার অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের সাম্প্রতিক এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, সাধারণ মানুষের আয় ও ব্যয়ের ভারসাম্য ক্রমেই নষ্ট হচ্ছে। জরিপের তথ্য অনুযায়ী, এক বছর আগের তুলনায় ভালো অবস্থায় নেই দেশের ৪০ দশমিক ৪ শতাংশ নাগরিক।
সম্প্রতি ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল ও যমুনা টেলিভিশনের যৌথ আয়োজনে 'ন্যায্যমূল্য ও মজুরি নিশ্চিত কীভাবে' শীর্ষক এক সংলাপে এসব বাস্তবতা ও সমাধানের পথ নিয়ে আলোচনা করা হয়। সংলাপে উঠে আসে, আয় করার সুযোগ কমে যাওয়ার কারণে ২৭ দশমিক ৪ শতাংশ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে ১৭ শতাংশ মানুষ অর্থনৈতিক চাপে রয়েছেন। এই পরিস্থিতি সরাসরি নাগরিকদের জীবনমানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
সংলাপে ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের চিফ অব পার্টি ক্যাথরিন সিসিল জানান, মূল্যবৃদ্ধি, আয়সংকট ও মজুরি সমস্যা এখন জনজীবনকে বিপর্যস্ত করছে। তিনি ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসের জরিপের তথ্য তুলে ধরে বলেন, এখনো ৩৩ শতাংশ ভোটার রাজনৈতিকভাবে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন, যার মধ্যে নারী ভোটারদের হার ৪৩ শতাংশ। এটি রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা যে, নাগরিকরা কেবল প্রতিশ্রুতি নয়, বরং বাস্তবসম্মত ও বিশ্বাসযোগ্য পরিকল্পনা দেখতে চান।
মজুরি ও বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনায় অংশ নিয়ে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সাদিকা হক বলেন, মালিক ও মধ্যস্বত্বভোগীরা সাপ্লাই চেইনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁদের বাদ দিয়ে অর্থনীতি সচল রাখা সম্ভব নয়; বরং কার্যকরভাবে রেগুলেট বা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এর ফলে পণ্যের দাম যেমন অযৌক্তিকভাবে বাড়বে না, তেমনি কৃষক ও ভোক্তা উভয়েই সুরক্ষা পাবে।
কর্মজীবী নারীর অতিরিক্ত নির্বাহী পরিচালক সানজিদা সুলতানা আক্ষেপ করে বলেন, সংসদ ও রাজনৈতিক আলোচনায় শ্রমিকদের সমস্যাগুলো এখনো পর্যাপ্ত গুরুত্ব পায় না। বিশেষ করে নারী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে বিদ্যমান মজুরি বৈষম্য দূর করা জরুরি, অন্যথায় অর্থনীতি কাঙ্ক্ষিত গতি পাবে না।
বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)-এর কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ডা. মনীষা চক্রবর্তী বলেন, ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে শ্রমিকের অধিকারের চেয়ে মালিকপক্ষের মুনাফাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। তিনি অবকাঠামো খাতে বিপুল ব্যয়ের পরিবর্তে শ্রমজীবী মানুষের কল্যাণে গণমুখী বাজেট বরাদ্দ এবং একটি পৃথক 'শ্রম কমিশন' গঠনের দাবি জানান।
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-র সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্থা শারমিন শ্রম ও শ্রমশক্তির সংজ্ঞা নতুন করে নির্ধারণের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, শ্রমের যথাযথ স্বীকৃতি ও মূল্যায়ন ছাড়া ন্যায্য মজুরি সম্ভব নয়। রাজনীতিবিদের উচিত প্রতিশ্রুতি থেকে বেরিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা এবং নতুন ধরনের পেশাজীবীদের প্রাতিষ্ঠানিক খাতের আওতায় আনা।
বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ও জামায়াতে ইসলামীর প্রতিনিধি অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান বলেন, বাজার ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা না ফিরলে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। কৃষক ও ভোক্তার মধ্যখানে থেকে যারা অনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছে, তাদের কঠোরভাবে দমন করতে হবে। আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে তাঁর দল শ্রমিকদের অধিকার আদায়ে পাশে থাকবে বলে তিনি জানান।
বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক কমিটির সদস্য ইসরাফিল খসরু বলেন, ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করতে মালিক ও শ্রমিকদের মধ্যে নিয়মিত সংলাপ ও স্টেকহোল্ডার কনসালটেশন জরুরি। তিনি ক্রিয়েটিভ অর্থনীতির আওতায় নতুন ধরনের পেশাজীবীদের ফরমাল সেক্টরে আনার প্রস্তাব দেন। একই সঙ্গে সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার কৃষিকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
সংলাপ শেষে সকল বক্তা একমত হন যে, ন্যায্যমূল্য ও মজুরি নিশ্চিত করতে হলে কেবল রাজনৈতিক অঙ্গীকার যথেষ্ট নয়; বরং কাঠামোগত সংস্কার, নিয়মিত সংলাপ এবং কার্যকর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। নাগরিকরা এখন দৃশ্যমান সিদ্ধান্ত ও বাস্তব পরিবর্তনের প্রত্যাশা করছেন।
