২০১৮ এর নির্বাচনে ৮০% কেন্দ্রে রাতেই ব্যালটে সিল মেরে রাখা হয়: তদন্ত প্রতিবেদন
২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৮০ শতাংশ কেন্দ্রে রাতেই ব্যালটে সিল মেরে আওয়ামী লীগের জয় নিশ্চিত করে রাখা হয় বলে জাতীয় নির্বাচন (২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪) তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, তদন্ত কমিশনের প্রাক্কলন অনুযায়ী ২০১৮ সালে ৮০ শতাংশ কেন্দ্রে রাতের বেলায় ব্যালট পেপারে সিল মেরে আওয়ামী লীগের বিজয় নিশ্চিত করে রাখা হয়। আওয়ামী লীগকে জেতাতে প্রশাসনের মধ্যে এক ধরনের অসৎ প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল। ফলে কোনো কোনো কেন্দ্রে ভোট প্রদানের হার ১০০ শতাংশের বেশি হয়ে যায়।
দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৪ সালের নির্বাচনে ১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এবং অবিশষ্ট ১৪৭টিতে 'প্রতিদ্বন্দ্বিতা'র নির্বাচন ছিল সম্পূর্ণ সাজানো ও সুপরিকল্পিত। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রাখতে এ বন্দোবস্ত করা হয়েছিল।
২০১৪ সালের নির্বাচন সারাবিশ্বে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচন হিসেবে সমালোচিত হওয়ায় শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ২০১৮ সালের নির্বাচনকে 'প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক' করার মিশন গ্রহণ করে। বিএনপিসহ অন্যান্য বিরোধী দল তাদের এ সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা বুঝতে না পেরে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে।
তদন্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০২৪ সালে বিএনপিসহ বিরোধী দল নির্বাচনে অংশ না দেওয়ায় 'ডামি' প্রার্থী দিয়ে নির্বাচনকে 'প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক' করার অপকৌশল গ্রহণ করা হয়।
তিনটি নির্বাচনের অভিনব পরিকল্পনা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী হয় এবং বাস্তবায়নে প্রশাসন, পুলিশ, নির্বাচন কমিশন ও গোয়েন্দা সংস্থার একটি অংশকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যবহার করা হয়। কিছু কর্মকর্তার সমন্বয়ে বিশেষ সেল গঠন করা হয়, যা নির্বাচন সেল নামে পরিচিত লাভ করে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০১৪-২০২৪ পর্যন্ত সময়কালে নির্বাচন ব্যবস্থাকে নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে মূলত প্রশাসনের হাতে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময়ে কমিশনের পরিবর্তে প্রশাসনই হয়ে উঠে নির্বাচন পরিচালনার মূল শক্তি।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনটি সংসদ নির্বাচনের নির্বাচনি অনিয়মে কয়েক হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী যুক্ত থাকায় এবং তদন্ত কমিশনের জন্য বরাদ্দকৃত সময় অপ্রতুল হওয়ায়—-সুনির্দিষ্টভাবে এদের নাম ও কার কী ভূমিকা ছিল, তা বের করা সম্ভব হয়নি।
এই তিন নির্বাচনে যেসব কর্মকাণ্ড নির্বাচন ব্যবস্থাকে কলুষিত করেছে তার একটি তালিকা তৈরি করেছে তদন্ত কমিশন। এগুলোর মধ্যে রয়েছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল; নির্বাচনি কৌশল নির্ধারণ ও নির্বাচনে রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এবং সশস্ত্র বাহিনীর মনোনীত একটি অংশকে ব্যবহার; বিরোধী প্রার্থী ও কর্মীদের নামে মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা দায়ের; বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের অজামিনযোগ্য মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার ও গুম; জাল ভোট প্রদান এবং নির্বাচনি কারচুপিতে নির্বাহি বিভাগকে ব্যবহার।
এছাড়াও রয়েছে, ভোটারদের ভয়ভীতি দেখানো; ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের প্রবেশে বাধা; অনিয়মতান্ত্রিকভাবে সংসদীয় সীমানা নির্ধারণ; আগে থেকেই ব্যালট বাক্সে ভোট ভরে রাখা; ভোট প্রদানের হারে পরিবর্তন; ভোটকেন্দ্রে গণমাধ্যম কর্মীদের প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ; প্রার্থীদের ভয়ভীতি, প্রলোভন দেখিয়ে প্রার্থিতা প্রত্যাহার; নির্বাচনে ডামি প্রার্থী দাঁড় করানো প্রভৃতি।
সোমবার তদন্ত প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টার কাছে তুলে দেয় তদন্ত কমিশন। কমিশনের সভাপতি হাইকোর্টের সাবেক বিচারপতি শামীম হাসনাইনসহ সদস্য হিসেবে আছেন সাবেক অতিরিক্ত সচিব শামীম আল মামুন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কাজী মাহফুজুল হক, আইনজীবী তাজরিয়ান আকরাম হোসাইন এবং নির্বাচন বিশেষজ্ঞ মো. আবদুল আলীম।
