এখনও উদ্ধার হয়নি লুট হওয়া ১,৩৬২ অস্ত্র; নির্বাচনে নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা
২০২৪ সালের জুলাই–আগস্ট আন্দোলনের সময় দেশের বিভিন্ন থানা, ফাঁড়ি ও কারাগার থেকে লুট হওয়া অস্ত্রের মধ্যে এখনো ১ হাজার ৩৬২টির হদিস মেলেনি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আশঙ্কা, এসব অস্ত্র ছিনতাই ও ডাকাতিসহ বিভিন্ন অপরাধে ব্যবহার হচ্ছে।
পাশাপাশি অস্ত্রগুলো উদ্ধার না হওয়ায় আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর দেশের বিভিন্ন থানা, ফাঁড়ি ও পুলিশের অন্যান্য স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এ সময় সেসব স্থাপনা থেকে মোট ৫ হাজার ৭৬৩টি অস্ত্র লুট হয়। পরে বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালিয়ে চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত ৪ হাজার ৪২৮টি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। তবে এখনো ১ হাজার ৩৩৫টি অস্ত্র উদ্ধার হয়নি।
অন্যদিকে কারাগার সূত্রে জানা গেছে, কারাগার থেকে ৯৪টি অস্ত্র ও ৯ হাজার গোলাবারুদ লুট হয়। এর মধ্যে ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত ৬৭টি অস্ত্র ও প্রায় ২ হাজার গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে। এখনো ২৭টি অস্ত্র ও প্রায় ৭ হাজার গোলাবারুদের সন্ধান মেলেনি।
লুটের অস্ত্রে ছিনতাই, ডাকাতি
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্র জানায়, থানা ও কারাগার থেকে লুট হওয়া অস্ত্র ও গোলাবারুদ বিভিন্ন হাত ঘুরে অপরাধীদের হাতে পৌঁছেছে। আর এসব অস্ত্র এখন ছিনতাই, ডাকাতিসহ বিভিন্ন ফৌজদারি অপরাধে ব্যবহার করা হচ্ছে।
মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) ভোরে রাজধানীর পল্লবীর আরমান কমিউনিটি লার্নিং সেন্টারের পাশে একটি নির্মাণাধীন বাসায় অভিযান চালিয়ে চার সন্ত্রাসী ও মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করে র্যাব-৪। পরে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ওই ভবন থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, এক রাউন্ড তাজা গুলি, চারটি দেশীয় অস্ত্র এবং ইয়াবা ট্যাবলেট ও ফেনসিডিল উদ্ধার করা হয়।
র্যাব-৪-এর কোম্পানি কমান্ডার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শাহাবুদ্দিন কবির জানান, উদ্ধার করা বিদেশি পিস্তলটি ৫ আগস্টের পর একটি থানা থেকে লুট করা হয়েছিল। পরে কয়েক দফা হাতবদল হয়ে অস্ত্রটি মিরপুর এলাকায় মাদক স্পট নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, ডাকাতি ও এলাকায় ভীতি প্রদর্শনের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছিল।
নির্বাচনের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা
জুলাই–আগস্ট আন্দোলনের সময় থানা ও কারাগার থেকে লুট হওয়া অস্ত্র পুরোপুরি উদ্ধার না হলে নির্বাচনের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে মনে করছেন রাজনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা।
নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের ওপর জোর দিয়ে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা গাজী আতাউর রহমান বলেন, "এখনো পর্যন্ত লুট হওয়া সব অস্ত্র উদ্ধার হয়নি। কমিশন আমাদের জানিয়েছে প্রায় ৭০ শতাংশ উদ্ধার হয়েছে। কিন্তু এখনো অনেক অবৈধ অস্ত্র রয়ে গেছে।"
তিনি বলেন, "নির্বাচনের আগে যে গতিতে অস্ত্র উদ্ধার হওয়া দরকার, এবার তার চেয়ে কিছুটা কম দেখা যাচ্ছে।"
লুট হওয়া অস্ত্র সুষ্ঠু নির্বাচন ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ তৌহিদুল হক দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "এই দুই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমরা বারবার অর্থবহ অভিযানের কথা বলে আসছি। সরকার ডেভিল হান্টসহ কয়েকটি অভিযান চালালেও লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।"
তিনি বলেন, "লুট হওয়া বা অবৈধ অস্ত্র অপরাধীদের হাতে থাকলে তারা ব্যক্তি স্বার্থ কিংবা নির্বাচনের মতো রাজনৈতিক ঘটনায় সেগুলো ব্যবহার করবে।"
"এসব অস্ত্র উদ্ধারে সুনির্দিষ্ট অভিযান জরুরি। দ্রুত উদ্ধার না হলে চ্যালেঞ্জের মাত্রা বাড়বে এবং মানুষের মধ্যে ভয় ও আতঙ্ক তৈরি হবে, যার প্রভাব নির্বাচনে পড়তে পারে," যোগ করেন তিনি।
আরও তৎপর হওয়ার নির্দেশ নির্বাচন কমিশনের
এদিকে নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ জানিয়েছেন, জুলাই অভ্যুত্থানের সময় থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্রের প্রায় ১৫ শতাংশ এবং গুলির ৩০ শতাংশ এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এসব অস্ত্র ও গুলি উদ্ধারসহ অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও তৎপর হওয়ার নির্দেশ দেন তিনি।
মঙ্গলবার সকালে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সেল এবং ভিজিল্যান্স ও অবজারভেশন টিমের সঙ্গে মতবিনিময় সভা শেষে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা বলেন।
তিনি বলেন, "১৩ ডিসেম্বর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ২০০টি লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। তবে এখনো উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার বাকি রয়েছে।"
নির্বাচন সামনে রেখে নিরাপত্তা ঝুঁকি এড়াতে এসব অস্ত্র দ্রুত উদ্ধারের বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।
অস্ত্র উদ্ধারে অপারেশন চলছে: পুলিশ
পুলিশ সদর দপ্তরের গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "আমরা লুট হওয়া অস্ত্রের প্রায় ৮০ শতাংশ উদ্ধার করেছি। বাকি অস্ত্র উদ্ধারে জোরদার অভিযান চলমান রয়েছে।"
তিনি জানান, নতুন করে 'অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ–২' চালু করা হয়েছে। এই অভিযানে অপরাধীদের গ্রেপ্তারের পাশাপাশি অস্ত্র উদ্ধারে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে এবং গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, "নির্বাচনের আগেই যত বেশি সম্ভব অস্ত্র উদ্ধার করা হবে। আশা করি, নির্বাচনের আগে সব অস্ত্র উদ্ধার করা গেলে নিরাপত্তা নিয়ে কোনো শঙ্কা থাকবে না।"
