আন্দোলন দমাতে ‘লাশ ফেলার’ নির্দেশ দেন হানিফ : ট্রাইব্যুনালে সাক্ষী
কুষ্টিয়ায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমাতে প্রয়োজনে লাশ ফেলার নির্দেশ দেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ এমন তথ্য জানান এক সাক্ষী। বুধবার (৭ জানুয়ারি) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সেই সাক্ষী এই জবানবন্দি দিয়েছেন।
ওই সাক্ষী জানান, হানিফ ফোনে আরেকটি নির্দেশ দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, আহত আন্দোলনকারীরা যেন সরকারি কোনো হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে না পারে। এমনকি ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হওয়া আহতদেরও বিছানা ছাড়তে বাধ্য করে।
গত বছর আন্দোলন চলাকালে কুষ্টিয়ায় ছয়জন নিহত হন। এ ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বুধবার সাক্ষ্যগ্রহণ হয়। মামলার পাঁচ নম্বর সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন ৩১ বছর বয়সী এক সমন্বয়ক। নিরাপত্তার স্বার্থে সাক্ষীর নাম-পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। ট্রাইব্যুনাল-২ ওই সাক্ষীর জবানবন্দি রেকর্ড করেন।
এ মামলায় মোট আসামি চারজন। তারা হলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ ও কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি সদর উদ্দিন খান। অন্য দুইজন হলেন জেলা সাধারণ সম্পাদক আজগর আলী ও শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান আতা।
জবানবন্দিতে সাক্ষী বলেন, ২০২৪ সালের ১২ জুলাই রাতে আমাদের ১২ জনের একটি বৈঠক হয়। এরপর রাতেই তারা ছোট একটি মিছিল করেন। পরে ১৮ জুলাই দিনের বেলায় আরেকটি মিছিল হয়। মিছিলটি সাদ্দাম বাজার থেকে চৌড়হাস মোড় পর্যন্ত যায়। পথে ছাত্রলীগের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা হামলা চালায়। এতে কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হন। একপর্যায়ে তাদের ধাওয়ায় মিছিলটি ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়।তারা তখন হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। কিন্তু ছাত্রলীগের ছেলেরা চিকিৎসা দিতে বাধা দেয়। ফলে আন্দোলনকারীরা ছদ্মনামে প্রাথমিক চিকিৎসা নেন।
তিনি বলেন, কুষ্টিয়ায় ছাত্র-ছাত্রীদের রাজপথে নামতে দিতো না আওয়ামী লীগ। ১০-১২ জন একত্রিত হলেই তাদের ওপর হামলা চালাতো তারা। ফলে জেলায় আন্দোলনটি গড়ে ওঠেনি। গত ২৭ জুলাই দলীয় কার্যালয়ে সমাবেশ করেন আওয়ামী লীগের নেতারা। সেখানে আজগর আলী, আতাউর রহমান আতা ও সদর উদ্দিন খান ছিলেন। হানিফের নির্দেশনায় তারা সমাবেশটি করেন। সেখানে বক্তারা বলেন, কুষ্টিয়ায় কোনোভাবেই আন্দোলন হতে দেওয়া হবে না। প্রয়োজনে যদি দু-একটি লাশ ফেলতে হয়, তাতেও তাদের আপত্তি নেই।
সাক্ষী আরও বলেন, 'তখন সারাদেশে ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ ছিল। তাই আন্দোলন এগিয়ে নিতে আমরা রাতের আঁধারে বৈঠক করি। একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ খোলা হয়। সেখানে ৮৬ জন সদস্য যুক্ত হন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ৩ আগস্ট কুষ্টিয়া জেলায় মিছিলের ডাক দিই। ওই দিন বেলা ১১টার দিকে সদর হাসপাতালের সামনে আমরা অবস্থান নিই। সেখান থেকে সাদ্দাম বাজার অভিমুখে মিছিল বের করি। সাদ্দাম বাজারে পৌঁছালে কয়েক হাজার মানুষ যুক্ত হন। আমরা মিছিলটি মজমপুরে গিয়ে শেষ করি।'
তিনি আরোও বলে, 'এর ধারাবাহিকতায় ৪ আগস্ট মিছিল ডাকা হয়। বিভিন্ন উপজেলা থেকে লোকজনকে শহরে আসতে বলা হয়। আমি নিজেও কুমারখালী উপজেলা পরিষদের সামনে যাই। সেখান থেকে দুপুর ২টার দিকে আমরা মিছিলসহ কুষ্টিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হই। চৌড়হাস মোড় থেকে বড় বাজার মোড় পর্যন্ত লাখও মানুষ অবস্থান নেন। বিকেল ৪টার দিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী টিয়ারশেল ছুড়তে থাকে। এতে আন্দোলনকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যান। গড়াই নদীর দিক থেকে ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা আমাদের ওপর হামলা চালায়। এতে ১০-১৫ জন গুরুতর আহত হন।'
সাক্ষী বলেন, 'এর মধ্যেই জানতে পারি হানিফ ফোনে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি নির্দেশ দেন, আন্দোলনকারীদের কেউ যেন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে না পারে। পরে আন্দোলনকারীরা বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিকে চিকিৎসা নেন। কিন্তু ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা সেখানেও হানা দেয়। তারা ভর্তি হওয়া রোগীদের বিছানা ছাড়তে বাধ্য করে।'
জবানবন্দিতে তিনি আরোও বলেন, '৫ আগস্ট সকাল ১০টার দিকে আমরা জড়ো হতে শুরু করি। তখন গোটা শহরের মানুষ রাজপথে নেমে আসে। একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও বিজিবি টিয়ারশেল নিক্ষেপ করতে থাকে। থানাপাড়া এলাকা ঘনবসতি হওয়ায় স্থানীয় লোকজনও প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে আসে।ওই দিন দুপুর ২টার দিকে হানিফের নির্দেশে হামলা চালানো হয়। আওয়ামী লীগের সশস্ত্র সন্ত্রাসী বাহিনী ও পুলিশ আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালায়। তাদের ছোড়া গুলিতে ছয়জন শহীদ হন। আহত হন শত শত আন্দোলনকারী। নিহতদের মধ্যে কিশোর আব্দুল্লাহও ছিল। পরে খুনি হাসিনার পালানোর খবর পাই। তখন আমরা সমন্বয়করা আন্দোলন সমাপ্ত ঘোষণা করি।'
সাক্ষী বলেন, হানিফের নির্দেশে এই মামলার অন্য আসামিরাও এসব হত্যাকাণ্ডে ভূমিকা রাখেন। তিনি চার আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেন।
সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে তাকে জেরা করা হয়। পলাতক আসামিদের পক্ষে জেরা করেন রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মো. আমির হোসেন। প্রসিকিউশনের পক্ষে ছিলেন প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ। আগামী ২১ জানুয়ারি মামলার পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ঠিক করেছেন ট্রাইব্যুনাল।
