নতুন পাঠ্যবইয়ে যে পরিবর্তন এল
মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের ২০২৬ সালের নতুন পাঠ্যবইয়ে বাংলাদেশের ইতিহাস পাঠ পরিবর্ধিত ও পরিমার্জিত হয়েছে। পাঠ্যবইয়ে বিশেষভাবে যুক্ত হয়েছে ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান প্রসঙ্গ।
২০২৫ সালের ৮ম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়ের তৃতীয় অধ্যায়ের শিরোনাম ছিল 'বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ', যা এবারের পাঠ্যবইয়ে 'বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক সংগ্রাম' হিসেবে পরিমার্জিত হয়েছে।
এ অংশে শেষে যুক্ত হয়েছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান, কোটা সংস্কার আন্দোলন ও ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলের ঘটনাপ্রবাহ।
বিভিন্ন শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়ে অধিকাংশ জায়গা থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের 'বঙ্গবন্ধু' উপাধি বাদ দেওয়া হয়েছে। তবে কিছু কিছু জায়গায় উপাধি রাখা হয়েছে। যুক্ত হয়েছে বাকশাল প্রসঙ্গ।
এছাড়াও সংক্ষিপ্ত হয়েছে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি রাজাকার, আল-বদর, আল-শামসের ভূমিকা।
পাঠ্যবইয়ে পরিবর্তনের ধরন
২০২৬ সালের নতুন পাঠ্যবই বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২৪-২৫ এর উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের ইংরেজি বইয়ের 'থ্রি স্পিচেস' নামে একটি প্রবন্ধ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বঙ্গবন্ধুর নাম। অষ্টম শ্রেণির বাংলা বই থেকে ৭ মার্চের ভাষণ সরানো হয়েছে। তবে মাধ্যমিক পর্যায়ের বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইতে ৭ মার্চের ভাষণ বিস্তারিতভাবে এসেছে। মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট বর্ণনায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ভূমিকা বা মতপার্থক্যের উল্লেখ সীমিত করা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী মতাদর্শ বা বিকল্প রাজনৈতিক অবস্থানের উল্লেখও সীমিত করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তনগুলো তথ্যগত পরিবর্তনের চেয়ে বেশি রাজনৈতিক প্রভাবযুক্ত।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক মো. মজিবুর রহমান বলেন, 'পাঠ্যবইয়ে ইতিহাসের অধ্যায়ে স্বাধীনতার পক্ষে কারা ছিলেন, কারা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তাদের সবার কথা যেমন থাকা দরকার, তেমনি কারা বিরোধী ছিলেন, রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস তাদের কথাও থাকা দরকার। আজ কারো অবদানের কথা বড় করে দেখানো হলো, কাউকে ছোট করা হলো। এগুলো উদ্দেশ্যমূলক রাজনৈতিক প্রভাব।'
তিনি মনে করেন, বার বার পাঠ্যবইয়ে ইতিহাসের বদল শিক্ষার্থীদের নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি তৈরির ক্ষেত্রে অন্তরায় হবে।
তিনি বলেন, 'একটি প্রজন্ম যদি প্রতিবারই ভিন্ন ভিন্ন ইতিহাস পড়ে বড় হয়, তবে তাদের মধ্যে জাতীয় ইতিহাস সম্পর্কে একটি সুসংহত ধারণা তৈরি হওয়া দুষ্কর।'
ইতিহাস বর্ণনায় রাজনৈতিক প্রভাব
বিশেষজ্ঞদের মতে, পাঠ্যবইয়ে ইতিহাস অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে একটি জাতীয় ঐকমত্য থাকা জরুরি। কিন্তু বাংলাদেশে প্রায়শই দেখা যায়, সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পাঠ্যবইয়ের ইতিহাসেও পরিবর্তন আসে। যেমন, ২০২৪ এর গণ-অভ্যুত্থানের আগে শেখ হাসিনার শাসনামলে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে জিয়াউর রহমানের প্রসঙ্গ পাঠ্যপুস্তকে উঠে আসেনি।
উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের ২০২৫ ও ২০২৬ সংস্করণের বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইতে যুক্ত হয়েছে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রসঙ্গ। সেখানে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালে ২৬ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা দেন জিয়াউর রহমান। এরপর ২৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর পক্ষে আবারো স্বাধীনতার ঘোষণা দেন তিনি।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক সাঈদ ফেরদৌস বলেন, 'ইতিহাসের যেটুকু প্রাপ্য তা দিতে হবে। ইতিহাস নিয়ে আমরা দল-মত নির্বিশেষে কোনো চুক্তিতেই পৌঁছাতে পারিনি। জুলাই অভ্যুত্থানের পর এসব কিছু অন্তভূর্ক্তিমূলক হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে তা দেখা যায়নি। ক্ষমতা বদলালেই ভিন্নমতকে বর্জন করার প্রবণতা এখনো তীব্রভাবে বর্তমান।'
তিনি আরো বলেন, 'কারা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে রাজনৈতিক ক্ষমতাবলে একপেশে ইতিহাস তুলে ধরে তাদের চিহ্নিত করা উচিত।'
দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের আশঙ্কা
পাঠ্যবইয়ে উঠে আসা ইতিহাসে রাজনৈতিক প্রভাব শিক্ষার্থীদের নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি তৈরিতে বড় বাধা হয়ে দাড়াঁয় এবং শিক্ষকেরাও স্বতঃস্ফূর্ত পাঠদানে বাধাপ্রাপ্ত হন- এমনটাই মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
একটি উচ্চ মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, 'ক্ষমতা বদল হলে নতুন পাঠ্যবইয়ের ভাষা ও কাঠামো শ্রেণিকক্ষে আলোচনা সীমিত করে দেয়। প্রতিবারই এমনটা হয়।'
তিনি আরো বলেন, 'অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা বইয়ের বাইরে গিয়ে প্রশ্ন করতে চাইলে শিক্ষকেরা সতর্ক হয়ে পড়েন। বই নিজেই যদি নির্দিষ্ট একটি ব্যাখ্যা হাজির করে, তাহলে বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরতে শিক্ষককেও বাড়তি চাপের মুখে পড়তে হয়।'
এর ফলে শ্রেণিকক্ষে ইতিহাসের জটিল ও বহুমাত্রিক আলোচনা ব্যাহত হচ্ছে বলে মনে করেন তিনি।
এ প্রসঙ্গে গবেষক মীর হুজাইফা আল মামদূহ বলেন, 'আমাদের পাঠ্যপুস্তকের জন্য ইতিহাস বর্ণনার একটা নির্দিষ্ট ধারাবাহিকতা, এর ধরন, আর রাজনীতি ঠিক করে সেটাকে সংবিধান দিয়ে সংরক্ষিত করা উচিত বলে আমি মনে করি। সেই রাজনীতি হতে হবে বাংলাদেশ পন্থার, যেখানে ঠিক আলাদা করে কাউকে মহিমান্বিত করা হবে না।
পাঠ্যবই বিতরণ পরিস্থিতি
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) একটি সূত্র জানায়, প্রাথমিক পর্যায়ে বই বিতরণ শেষ হয়েছে। আর মাধ্যমিক পর্যায়ে প্রায় ৮৫ শতাংশ বই বিতরণ সম্পন্ন হয়েছে।
এনসিটিবির বিতরণ কর্মকর্তা মোহাম্মদ মতিউর রহমান খান পাঠান জানান, ৩০ কোটি ২ লাখ ৫৫ হাজার ১৫৪টি পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে তারা এগোচ্ছেন। আগামী ১৫ জানুয়ারির মধ্যে বই বিতরণ কার্যক্রম শেষ হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
