ডিজিটাল মাধ্যম কর্মসংস্থানে সুযোগের পাশাপাশি ‘নতুন বৈষম্য’ সৃষ্টি করছে: দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য
ডিজিটাল মাধ্যম বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কর্মসংস্থানের অভূতপূর্ব সুযোগ তৈরি করলেও এটি একইসঙ্গে এক ধরনের 'নতুন বৈষম্য' সৃষ্টি করছে বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
তিনি বলেন, 'উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) প্রসারের ফলে প্রথাগত কর্মসংস্থান সংকুচিত হচ্ছে, যা শ্রমবাজারে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।'
মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) রাজধানীর সিরডাপ অডিটোরিয়ামে এক সেমিনারে নাগরিক ইশতেহারের প্রেক্ষাপটে দেশের ডিজিটাল অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি ও কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে এই বিশ্লেষণ তুলে ধরেন তিনি।
ড. দেবপ্রিয় বলেন, 'দেশের প্রান্তিক পর্যায়ে "গিগ ইকোনমি" ছড়িয়ে পড়েছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি ঠাকুরগাঁওয়ের দেড় হাজার ফ্রিল্যান্সারের কথা উল্লেখ করেন, যারা সীমিত প্রযুক্তির মধ্যেও বিশ্ববাজারে "ইলাস্ট্রেশন বিক্রি" করছেন। তবে এই খাতের প্রধান বাধা হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অভাবকে দায়ী করেন তিনি।'
তিনি বলেন, 'ফ্রিল্যান্সারদের টাকা গ্রহণের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো সুনির্দিষ্ট নিয়মনীতি নেই এবং তাদের ক্রেডিট কার্ডের মতো মৌলিক আর্থিক সুবিধাও নেই। এই নীতিমালার অভাব তাদের উপার্জনকে আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির মূলধারায় আনার ক্ষেত্রে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।'
দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে ডিজিটাল পদ্ধতির বড় ধরনের সম্প্রসারণ এখন সময়ের দাবি উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'বর্তমানে ইউটিলিটি বিল প্রদান এবং উপবৃত্তি বিতরণে ডিজিটাল পদ্ধতি ব্যবহারের ফলে অর্থের তছরুপ কমছে এবং অনিয়ম চিহ্নিত করার সুযোগ বেড়েছে।'
এই সুফলকে টেকসই করতে তিনি একটি 'একীভূত জাতীয় তথ্যভান্ডার' তৈরির প্রস্তাব দেন। ড. দেবপ্রিয় জোর দিয়ে বলেন, 'এই তথ্যভান্ডার পরিচালনার জন্য একটি 'স্বায়ত্তশাসিত নজরদারি ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান' তৈরি করতে হবে। এটি কোনোভাবেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা নির্বাচন কমিশনের অধীনে থাকা উচিত নয়। এখানে নাগরিকের এনআইডি, টিআইএন, বিআইএন এবং সরকারি সেবার (ভাতা, উপবৃত্তি) সকল তথ্য সংরক্ষিত থাকবে।'
সরকারের সাম্প্রতিক কিছু উদ্যোগ যেমন, 'স্টারলিংক' প্রবর্তন এবং অনিবন্ধিত মোবাইল ফোন বন্ধে 'এনইআইআর' সিস্টেমের প্রশংসা করেন এই অর্থনীতিবিদ। তবে তিনি মনে করেন, এসব সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় অংশীজনদের সাথে প্রয়োজনীয় আলাপ-আলোচনার অভাব ছিল।
পাশাপাশি, প্রস্তাবিত 'সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্ট অর্ডিন্যান্স ২০২৫' নিয়ে স্বচ্ছতার অভাব এবং ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা বা 'টেলিফোনে আড়ি পাতা' বন্ধে স্পষ্ট নির্দেশনার অভাবে জনমনে উদ্বেগ রয়েছে বলে তিনি জানান।
তিনি বলেন, 'সরকার 'মেটা'কে [ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান] চিঠি দিলেও বাংলাদেশে তাদের অফিস না থাকায় এবং ভাষার সীমাবদ্ধতার কারণে ঘৃণা প্রচার বা রাজনৈতিক সহিংসতা বন্ধ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।'
