মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা: বিদেশি বিশেষজ্ঞ দিয়ে আনিসুল-সালমানের ফোনালাপ পরীক্ষার আবেদন খারিজ
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চলাকালে ছাত্র-জনতাকে হত্যার উদ্দেশ্যে কারফিউ জারি ও উসকানি দেওয়ার অভিযোগে সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের ফোনালাপের রেকর্ড পরীক্ষার আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। প্রসিকিউশনের উপস্থাপিত ওই কল রেকর্ডটি বিদেশি বিশেষজ্ঞ দিয়ে পরীক্ষা করার আবেদন করা হয়েছিল আসামিদের পক্ষ থেকে।
রোববার (৪ জানুয়ারি) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এই আদেশ দেন।
মানবতাবিরোধী অপরাধের এই মামলায় আসামিপক্ষ থেকে অব্যহতি চেয়ে আবেদনের ওপর শুনানিকালে কল রেকর্ড পরীক্ষার আবেদনটি করা হয়েছিল। আদালত আবেদনটি নাকচ করে দিয়ে আগামী মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) আসামিদের অব্যাহতির আবেদনের ওপর পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেছেন।
জুলাই অভ্যুত্থানে কারফিউ দিয়ে ছাত্র-জনতাকে হত্যায় উসকানিসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের এই মামলায় রোববার অভিযোগ গঠনের বিষয়ে শুনানির দিন নির্ধারিত ছিল। আসামিদের পক্ষে ট্রাইব্যুনালে শুনানি করেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী।
শুনানির শুরুতে আসামিপক্ষের আইনজীবী ট্রাইব্যুনালে করা আবেদনে বলেন, 'আন্দোলন চলাকালীন কারফিউ জারি করে হত্যাকাণ্ডের জন্য সালমান এফ রহমান ও আনিসুল হক দুজনের যে ফোনালাপ ট্রাইব্যুনালে পেশ করা হয়েছে, সেটি পরীক্ষা করার জন্য বিদেশি বিশেষজ্ঞ দিয়ে তাদের ভয়েস রেকর্ড করে ম্যাচিং করলে সঠিক সত্য বেরিয়ে আসবে।' তবে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান গোলাম মূর্তজা মজুমদার জানান, আইনে এমন কোনো সুযোগ নেই এবং এই আবেদনটি খারিজ করে দেন।
এ সময় আনিসুল হকের পক্ষে বিদেশি আইনজীবী নিয়োগের জন্য গত ১০ ডিসেম্বরের আবেদনের বিষয়ে আদালতের আদেশ জানতে চান আইনজীবী। জবাবে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বলেন, 'বিদেশি আইনজীবী নিয়োগের জন্য আগে বার কাউন্সিল থেকে অনুমতি নিয়ে আসবেন। তারপর ট্রাইব্যুনাল এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাবে।'
শুনানির একপর্যায়ে সালমান ও আনিসুলের আইনজীবী বলেন, 'প্রসিকিউশন বিচারের দিকে যাচ্ছে, আর আমরা চাচ্ছি ন্যায় বিচার।' তখন ট্রাইব্যুনালের বিচারক শফিউল আলম মাহমুদ পাল্টা প্রশ্ন করে বলেন, 'যখন মামলাটির তদন্ত চলছিল বা ফর্মাল চার্জ দাখিল করেছিল তখন বিদেশি আইনজীবী নিয়োগ দিতে উদ্যোগ কেন নেওয়া হয়নি? বিচার শুরুর হওয়ার আগে এখন কেন এসব বলছেন?' এ সময় ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, আইন অনুযায়ীই বিচার প্রক্রিয়া চলবে।
পরবর্তীতে চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আবেদন জানান। তখন আসামিপক্ষের আইনজীবী মনসুরুল হক শুনানির জন্য আরও দুই দিন সময় চাইলে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বলেন, 'কয়েকবার সময় দেওয়া হয়েছে, আর সময় দেওয়া হবে না। বিচার শুরু হোক। আপনাকে আমরা আর একদিন সময় দিব।'
আসামিপক্ষের এই সময় চাওয়ার বিরোধিতা করে চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, 'আমাদের আপত্তি আছে। আসামিপক্ষ বিভিন্ন সাবমিশন রেখে মামলাটি বিচারে বিলম্ব করছে। তাদের আগেও ১৩ দিন সময় দেওয়া হয়েছে। এদেশের মানুষ জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার চায়। অন্তর্বর্তী সরকারকে বিচার করার জন্যই ক্ষমতায় বসিয়েছে জনগণ। অথচ আসামিপক্ষ মামলাটি বিভিন্নভাবে মিসগাইড করছে।'
উভয়পক্ষের বক্তব্য শুনে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান গোলাম মুর্তাজা মজুমদার আসামিপক্ষের আইনজীবীদের উদ্দেশে বলেন, 'আপনাদের শেষ বারের মতো দুই দিন সময় দেওয়া হচ্ছে। ৬ জানুয়ারি শুনানি করবেন। আর বাড়তি সময় দেওয়া হবে না।' এ সময় প্রধান বিচারপতির একটি নির্দেশনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'প্রধান বিচারপতি নির্দেশ দিয়েছেন আসামিপক্ষের আইনজীবীর মৃত্যু ছাড়া অন্য কোনো কারণে মামলার তারিখ মুলতবি বা পিছানো যাবে না।' এরপর আদালত ৬ জানুয়ারি পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেন।
এর আগে, গত ২২ ডিসেম্বর সালমান ও আনিসুলের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আবেদন করেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। ওই দিন শুনানিতে তাদের বিরুদ্ধে আনা সুনির্দিষ্ট পাঁচটি অভিযোগ পড়ে শোনানো হয় এবং আলোচিত ফোনালাপটি শোনানো হয়। গত ৪ ডিসেম্বর প্রসিকিউশন আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করার পর আদালত তা আমলে নিয়েছিলেন।
মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় আনিসুল হক ও সালমান এফ রহমান ফোনালাপ করেন। সেই আলাপে একপর্যায়ে কারফিউ চলাকালে আন্দোলনকারীদের 'শেষ করে দিতে হবে' বলে মন্তব্য করেন তারা। প্রসিকিউশনের দাবি, তাদের এই বক্তব্যের পর ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচারে গুলি চালিয়ে হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়, যেখানে সালমান ও আনিসুলের বক্তব্য উসকানি হিসেবে কাজ করেছেন।
রোববার শুনানির সময় কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়েছিল আনিসুল হক ও সালমান এফ রহমানকে।
