ঢাকা-১৫: বিএনপির স্থানীয় সংগঠকের মুখোমুখি জামায়াতের আমির
ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে বাংলাদেশ। এরই মধ্যে রাজধানীর অন্যতম আলোচিত আসন হয়ে দাঁড়িয়েছে ঢাকা-১৫। কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, কাফরুল ও মিরপুরের কিছু অংশ নিয়ে গঠিত এই আসনটিকে ঘিরে বাড়ছে রাজনৈতিক আগ্রহ ও আলোচনা।
এই আসনে মুখোমুখি হচ্ছেন ভিন্ন ধারার দুই রাজনীতিক। একদিকে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান—জাতীয় পর্যায়ে সুপরিচিত, সুগঠিত আদর্শিক ভিত্তিসম্পন্ন একজন নেতা। অন্যদিকে বিএনপির স্থানীয় সংগঠক ও যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন, যিনি প্রথমবারের মতো জাতীয় রাজনীতির মঞ্চে লড়াই করছেন।
মাঠপর্যায়ে পরিদর্শন ও প্রচারকর্মীদের সঙ্গে আলাপ করে বোঝা যায়, দুই প্রার্থীর নির্বাচনী কৌশলে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। শফিকুর রহমান তার জাতীয় পরিচিতি ও জামায়াতে ইসলামীর সুসংগঠিত দলীয় কাঠামোর ওপর ভর করে প্রচারণা চালাচ্ছেন। বিপরীতে মিল্টনের প্রচারণার মূল শক্তি হিসেবে কাজ করছে নিরবচ্ছিন্ন স্থানীয় যোগাযোগ ও তৎপরতা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ বলেন, জামায়াতের আমির এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মর্যাদার প্রশ্নে নয়; বরং এখানে দলটির একটি শক্ত ও কেন্দ্রীভূত ভোটব্যাংক রয়েছে বলেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
তিনি বলেন, "জামায়াতে ইসলামী দীর্ঘদিন ধরে এই এলাকায় সক্রিয়। তারা সেবামুখী প্রতিষ্ঠান পরিচালনার পাশাপাশি শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। এ ধরনের সুসংগঠিত আবাসিক বলয় দলের জন্য ভোটার সংগঠনে কার্যকর ভূমিকা রাখে।"
এদিকে, মিল্টনকে দেখা যাচ্ছে ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত বাজার, অলিগলি, মাঠ ও রাস্তার পাশের চায়ের দোকানে ঘুরে বেড়াতে। তিনি জোর দিচ্ছেন এমন একজন প্রতিনিধির প্রয়োজনীয়তার ওপর, যিনি শারীরিকভাবে সব সময় এলাকায় উপস্থিত থাকেন।
অনলাইন পরিসরেও দুই পক্ষই জোরালো প্রচারণা চালাচ্ছে। এর অংশ হিসেবে মিল্টনের টিম তার প্রতিশ্রুতি তুলে ধরে গান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের রিলস ও ফটোকার্ড প্রচার করছে। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী ডিজিটাল কৌশলে সুসংগঠিত অনলাইন বার্তার মাধ্যমে নিজেদের প্রচলিত সমর্থকগোষ্ঠীর বাইরেও পৌঁছানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
চ্যালেঞ্জ
তবে এখানে চ্যালেঞ্জও কম নয়। শফিকুর রহমান ঢাকা ও সিলেটের বিভিন্ন আসন থেকে চারবার জাতীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও এখনো জয় পাননি। অন্যদিকে, মিল্টনের সামনে রয়েছে দলীয় অভ্যন্তরীণ সমীকরণের চাপ। এ আসনে বিএনপির মনোনয়নের জন্য মামুন হাসান ও সাজ্জাদুল মিরাজসহ একাধিক নেতা আগ্রহী ছিলেন।
মিল্টনের নির্বাচন উপদেষ্টা ও ব্যবসায়ী নেতা মোয়াজ্জেম হোসেন মতি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, ওয়ার্ডভিত্তিক ছোট টিমের মাধ্যমে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ৩১ দফা সংস্কার কর্মসূচি তুলে ধরাই তাদের প্রধান কৌশল। তিনি বলেন, "এ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের সাড়া উৎসাহব্যঞ্জক।"
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী আসন কমিটির পরিচালক ফখরুদ্দিন মানিক জানান, নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার আগেই মসজিদ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন পেশাজীবী মহলে সরাসরি যোগাযোগ কার্যক্রম চালিয়েছে দলটি।
তিনি বলেন, "তফসিল ঘোষণার পর প্রচারণা সীমিত পরিসরে আমন্ত্রণভিত্তিক বৈঠকের মাধ্যমে হচ্ছে। এতে ব্যবসায়ী নেতা, ইমাম ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানদের মতো স্থানীয় প্রভাবশালীরা অংশ নেন।"
প্রচারকর্মীরা জানান, ঝুট (পোশাক বর্জ্য) ব্যবসা, গণপরিবহন ও দোকান থেকে চাঁদা আদায়ের সঙ্গে যুক্ত কিছু স্থানীয় চক্রও আলোচনায় এসেছে। তবে এসবকে তারা নির্বাচনকেন্দ্রিক নয়, বরং সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অংশ হিসেবে দেখছেন। মাঝে মধ্যে বাধা এলেও উভয় পক্ষই এলাকায় সামগ্রিকভাবে স্থিতিশীল জনসমর্থনের কথা বলছে।
হলফনামা প্রকাশ
নির্বাচনী হলফনামা অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, ৬৭ বছর বয়সী শফিকুর রহমান নিজেকে পেশায় চিকিৎসক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার শিক্ষাগত যোগ্যতা এমবিবিএস। অপরদিকে, ৫৬ বছর বয়সী শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন পেশায় ব্যবসায়ী এবং তার শিক্ষাগত যোগ্যতা অষ্টম শ্রেণি পাস।
হলফনামায় আয়ের ক্ষেত্রেও বড় পার্থক্য উঠে এসেছে। শফিকুর রহমানের বার্ষিক আয় ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা, আর মিল্টনের ঘোষিত আয় ২৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
শফিকুর রহমানের স্থায়ী ঠিকানা সিলেটের সবুজবাগে হলেও বর্তমানে তিনি মিরপুরের বড়বাগে বসবাস করছেন। মিল্টনের জন্ম ও বেড়ে ওঠা মিরপুরেই।
মামলা সংক্রান্ত তথ্যে দেখা যায়, শফিকুর রহমানের বিরুদ্ধে করা ৩৪টি মামলার মধ্যে ৩২টিতে তিনি খালাস পেয়েছেন, আর দুটি মামলায় হাইকোর্ট স্থগিতাদেশ দিয়েছেন। অন্যদিকে মিল্টনের বিরুদ্ধে ৫০টি মামলার কথা উল্লেখ আছে, যার বেশিরভাগই খালাস বা অব্যাহতির মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়েছে।
ভোটারদের উদ্বেগ
ঢাকা-১৫ আসনে মোট নিবন্ধিত ভোটার ৩ লাখ ৪৪ হাজার ৫০৭ জন। নারী-পুরুষের সংখ্যা প্রায় সমান। এই আসনে তরুণ, প্রথমবারের ভোটার, পোশাকশ্রমিক এবং ভাসমান নগরবাসীর উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য।
নগরজীবনের নানা সংকট ভোটারদের ভাবনায় বড় প্রভাব ফেলছে। রোকেয়া সরণি এলাকায় দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা, মেট্রোরেল প্রকল্পের পর বাড়িভাড়া বৃদ্ধি, স্থায়ী যানজট, ড্রেনেজ ব্যবস্থার ব্যর্থতা এবং উন্মুক্ত জায়গা কমে যাওয়ার মতো বিষয়গুলো স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিত্বকে ভোটের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
প্রথমবারের ভোটার আবদুল্লাহ সালেহিন বলেন, "আমরা প্রার্থীদের ইশতেহার বিশ্লেষণ করছি। গত দেড় দশকে আমাদের প্রতিনিধি নির্বাচনের সুযোগ হয়নি, তাই এই নির্বাচন আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।"
আরেক তরুণ ভোটার শায়লা আহমেদ বলেন, "আমি পরিবর্তন চাই। এবারই আমি প্রথম জাতীয় নির্বাচনে ভোট দেব।"
এর আগে এই আসনটি ছিল আওয়ামী লীগ নেতা কামাল আহমেদ মজুমদার-এর দখলে। বিতর্কিত নির্বাচন ও দলীয় বর্জনের মধ্য দিয়ে তিনি টানা চারবার নির্বাচিত হন।
এ আসনে জামায়াত ও বিএনপির প্রধান দুই প্রার্থীর পাশাপাশি আরও ছয়টি দল ও একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী মনোনয়ন জমা দিয়েছেন। তারা হলেন—আহমেদ সাজেদুল হক রুবেল (বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি), একেএম শফিকুল ইসলাম (গণফোরাম), মো. শামসুল হক (জাতীয় পার্টি), মো. আশফাকুর রহমান (জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল), খান শোয়েব আমান উল্লাহ (জনতার দল), মোবারক হোসেন (বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি) এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. তানজিল ইসলাম।
