বিত্ত-বৈভব, দামি গাড়ি—কিছুই নেই খালেদা জিয়ার
ভরি ভরি সোনা-দানা কিংবা দামী গহনার কোনো তালিকা নেই তিনবারের প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির সদ্য প্রয়াত চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার। উপহার হিসেবে পাওয়া মাত্র ৫০ তোলা স্বর্ণই রেখে গেছেন তিনি।
সাধারণ রাজনীতিবিদদের অনেকেই যেখানে কয়েক কোটি টাকা মূল্যের গাড়ি ব্যবহার করেন, সেখানে খালেদা জিয়ার ব্যবহৃত দু'টি গাড়ির মোট মূল্য ছিল মাত্র ৩৫ লাখ টাকা।
তিনবারের প্রধানমন্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও তার স্থাবর সম্পদের তালিকায় নেই কোনো বাগানবাড়ি কিংবা বিশাল জমি-জমা। রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের অনেকেই রাজউক থেকে প্লট বরাদ্দ নিলেও এমন কোনো প্লটও নেননি তিনি। অথচ একবার এমপি হয়েই অনেকে রাজউকের প্লট নিয়ে বাগানবাড়ি গড়ে তোলেন। দেশ থেকে এসব সুবিধার কিছুই নেননি খালেদা জিয়া।
সাধারণ গৃহিণী থেকে দেশনেত্রীর মর্যাদায় অধিষ্ঠিত খালেদা জিয়া বিদায় নিয়েছেন অর্জনকালীন মাত্র ৩,৩০০ টাকা মূল্যের ৮ শতাংশ এবং ৯,০০০ টাকা মূল্যের ০.০১৭৬৮ অযুতাংশ অকৃষি জমির মালিক হিসেবে।
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফেনী, বগুড়া ও দিনাজপুরের তিনটি আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে গত ২৯ ডিসেম্বর হাসপাতালের বিছানা থেকেই মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন তিনি। এর মধ্য দিয়ে মৃত্যুর আগে নিজের সম্পদের হিসাব জাতির সামনে উন্মুক্ত করে যান খালেদা জিয়া। কিন্তু বাঙালি জাতিকে কাঁদিয়ে পরদিন ভোরে মৃত্যুর সঙ্গে আপস করতে বাধ্য হন গণতন্ত্র রক্ষায় আপসহীন ভূমিকার উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে পরিচিত এই নেত্রী।
বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) লাখো মানুষের অংশগ্রহণে তার জানাজা ও দাফন সম্পন্ন হওয়ার পরপরই নির্বাচন কমিশন আসন্ন নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া সব প্রার্থীর হলফনামা প্রকাশ করে। সেখানে খালেদা জিয়ার মনোনয়নপত্রের সঙ্গে জমা দেওয়া হলফনামাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
হলফনামার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, তিনবারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের মোট পরিমাণ ছিল ২২ কোটি ৯০ লাখ ৮০ হাজার টাকা। এর মধ্যে নিজের ব্যবহৃত গাড়ি, বাসার আসবাবপত্র এবং ইলেকট্রনিক পণ্যের মূল্যও অন্তর্ভুক্ত। অথচ বিভিন্ন দলের অনেক স্থানীয় পর্যায়ের নেতার সম্পদের পরিমাণও এর চেয়ে বহুগুণ বেশি।
স্থাবর সম্পত্তি ভাড়া, ব্যাংকে রাখা আমানত এবং সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ থেকে বছরে তার আয় হতো ১ কোটি ১৭ লাখ টাকা। সে হিসাবে মাসিক গড় আয় দাঁড়ায় ১৪ লাখ ৬৮ হাজার টাকা। এ ছাড়া খালেদা জিয়ার আর কোনো আয়ের উৎস ছিল না।
খালেদা জিয়ার হলফনামা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তার আয়ের উৎস ছিল মাত্র দুটি। এর একটি বাড়ি, অ্যাপার্টমেন্ট বা অন্যান্য স্থাবর সম্পত্তি ভাড়া দিয়ে পাওয়া আয় এবং অন্যটি শেয়ার, বন্ড, সঞ্চয়পত্র ও ব্যাংকে রাখা আমানত থেকে প্রাপ্ত মুনাফা।
স্থাবর সম্পত্তি ভাড়া থেকে বছরে তার আয় হতো ৯০ লাখ টাকা এবং শেয়ার, বন্ড, সঞ্চয়পত্র ও ব্যাংকের আমানত থেকে বছরে আয় ছিল ৮৬ লাখ ১৬ হাজার ৫৮০ টাকা।
সর্বশেষ আয়কর বর্ষ অনুযায়ী, খালেদা জিয়ার হাতে নগদ অর্থের পরিমাণ ছিল মাত্র ৭ লাখ ৪১ হাজার ৭৫ টাকা এবং ব্যাংকে জমা অর্থের পরিমাণ ১৩ কোটি ৯৩ লাখ ৭৫ হাজার ৩৫৬ টাকা। অথচ গত আওয়ামী লীগ সরকারের অনেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে বিদেশে হাজার কোটি টাকা পাচারের প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক ও দুর্নীতি দমন কমিশন।
বিভিন্ন ব্যাংকে এফডিআর ও সঞ্চয়পত্রে খালেদা জিয়ার বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৭ কোটি ৮৫ লাখ ১৪ হাজার ২২৯ টাকা। এই বিনিয়োগ থেকেই মাসে গড়ে ৭ লাখ ১৮ হাজার ৪৮ টাকা আয় হতো তাঁর। হলফনামায় তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, তার কাছে কোনো বিদেশি মুদ্রা নেই।
তিনবারের প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা ছিল মাত্র দুটি। এর মধ্যে একটি নিশান জিপ, যার মূল্য ২২ লাখ ২৫ হাজার টাকা। অন্যটি একটি টয়োটা জিপ, যার মূল্য ১৩ লাখ ২০ হাজার টাকা। অথচ ঢাকার অনেক ওয়ার্ড কাউন্সিলরের ব্যবহৃত গাড়ির দামই কয়েক কোটি টাকা।
এ ছাড়া তার বাসায় ব্যবহারের জন্য ৫ লাখ টাকা মূল্যের বিভিন্ন ধরনের ইলেকট্রনিক পণ্য এবং ২ লাখ ৬০ হাজার টাকা মূল্যের আসবাবপত্র রয়েছে বলে হলফনামায় উল্লেখ করা হয়েছে।
খালেদা জিয়ার হলফনামার স্থাবর সম্পত্তির তালিকায় আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদে উচ্ছেদ হওয়া ক্যান্টনমেন্টের বাড়িটির চিহ্নও রয়েছে। এরশাদ সরকারের সময় প্রতীকী মূল্যে ক্যান্টনমেন্টের মঈনুল রোডের ওই বাড়িটি এবং গুলশানের বাড়িটি খালেদা জিয়াকে দেওয়া হয়।
হলফনামায় বলা হয়েছে, ১৯৬ নম্বর গুলশান এভিনিউয়ের বাড়িটির এক-তৃতীয়াংশের মালিক খালেদা জিয়া, যার অর্জনমূল্য দেখানো হয়েছে ১০০ টাকা। সেখানে আরও উল্লেখ রয়েছে, 'ক্যান্টনমেন্টে একটি বাড়ি, যা বর্তমানে মালিকানা ও দখলে নেই, অর্জনমূল্য ৫ টাকা।'
তবে হলফনামায় উল্লেখ করা হয়েছে, খালেদা জিয়ার এসব স্থাবর সম্পত্তির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৫০ কোটি টাকা।
