চার বছরের শিশুকে অপহরণের অভিযোগে সাত বছরের শিশু গ্রেপ্তার, ৩ দিন পর জামিন
চট্টগ্রামে চার বছরের এক শিশুকে অপহরণের অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া সাত বছরের এক শিশুকে জামিন দিয়েছেন আদালত। শিশু আইন-২০১৩ অনুযায়ী ৯ বছরের কম বয়সী শিশুকে গ্রেপ্তার, আটক বা কোনো ফৌজদারি মামলায় জড়ানোর সুযোগ নেই—আদালতের এমন পর্যবেক্ষণের পর তাকে জামিন দেওয়া হয়।
রোববার (৭ ডিসেম্বর) চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালত এ আদেশ দেন।
চার বছরের এক শিশুকে অপহরণের অভিযোগে সাত বছরের ওই ছেলে শিশুকে তার মা-সহ শুক্রবার মামলা নিয়ে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। আদালত এরপর শিশুটিকে গাজীপুরের টঙ্গীতে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠিয়ে দেন। তিন দিন পর অবশেষে শিশুটির জামিন মিলেছে।
উল্লেখ্য, শিশু আইন অনুযায়ী, ৯ বছরের কম বয়সী কোনো শিশু আসামি হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মফিজুল হক ভূঁইয়া বলেন, 'আইন লঙ্ঘন করে সাত বছরের এক শিশুকে আটকের বিষয়টি নজরে আসার পর আদালত তা পর্যালোচনা করেন। রোববার রাষ্ট্রপক্ষ শিশুটির জামিনের আবেদন করলে বিচারক তা মঞ্জুর করেন।'
পিপি আরও জানান, বিকেলে দেওয়া লিখিত আদেশে মহানগর দায়রা জজ মো. হাসানুল ইসলাম উল্লেখ করেন, শিশু আইনের ৪৪(১) ধারা অনুযায়ী ৯ বছরের কম বয়সী কোনো শিশুকে গ্রেপ্তার বা আটক রাখা যাবে না। আদালত বর্তমানে টঙ্গী শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে থাকা শিশুটিকে অবিলম্বে তার বাবার জিম্মায় মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
এত কম বয়সী শিশুকে আসামি করা এবং আইনি বাধানিষেধ থাকার পরও মামলা প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ায় স্থানীয় পুলিশ ও আদালত পাড়ায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত গত ১৩ এপ্রিল। নগরীর ষোলশহর রেলওয়ে স্টেশন এলাকার বাসিন্দা আনোয়ারা বেগম তার অসুস্থ বড় ছেলেকে নিয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান। সঙ্গে ছিল তার চার বছর বয়সী ছোট ছেলে রামিম। হাসপাতাল চত্বর থেকে রামিম নিখোঁজ হয়ে যায়। বহু খোঁজাখুঁজির পর তিনি পাঁচলাইশ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। দীর্ঘ সাত মাসেও শিশুটির কোনো খোঁজ মেলেনি।
সন্তানকে না পেয়ে গত শুক্রবার আনোয়ারা বেগম একটি অপহরণ মামলা দায়ের করেন। এতে তিনি সাত বছর বয়সী ওই শিশু এবং তার ৩০ বছর বয়সী মাকে আসামি করেন। বাদীর অভিযোগ, খেলার ছলে ওই দুজন তার ছেলেকে হাসপাতালের করিডর থেকে সরিয়ে নিয়ে গেছে।
মামলার পরপরই পাঁচলাইশ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) এনামুল হক ওই দিনই ষোলশহর এলাকা থেকে মা ও শিশুকে গ্রেপ্তার করেন। শুক্রবার তাদের আদালতে হাজির করা হলে ম্যাজিস্ট্রেট মাকে কারাগারে এবং শিশুকে গাজীপুরের টঙ্গী শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানোর নির্দেশ দেন। সেখানে শিশুটি তিন দিন আটক ছিল।
শিশু আইন ও দণ্ডবিধি অনুযায়ী, ৯ বছরের কম বয়সী শিশুকে গ্রেপ্তার বা বিচার করার সুযোগ নেই। এরপরও পুলিশ কেন মামলা নিল এবং শিশুটিকে বিচার ব্যবস্থার মুখোমুখি করল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এ বিষয়ে পাঁচলাইশ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সোলাইমান বলেন, 'এত ছোট শিশুর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। নিখোঁজ শিশুটিকে উদ্ধারে পুলিশকে জরুরিভিত্তিতে কাজে লাগাতেই মামলাটি নথিভুক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু তদন্ত দল ভুলবশত সাত বছরের শিশুটিকে আসামি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে ফেলে। এমনকি শিশুটিকে যখন উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানো হয়, তখন প্রসিকিউশনও তার বয়সের বিষয়টি এড়িয়ে গেছে।'
নিখোঁজ শিশু উদ্ধারের চাপের কারণে এই 'অনিচ্ছাকৃত ভুল' হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
নিয়ম অনুযায়ী শিশু আসামিকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে হাজির করার কথা।
কিন্তু নিম্ন আদালতে এক মাসের অবকাশ চলায় মামলাগুলো সাময়িকভাবে চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালতে দেখাশোনা করা হচ্ছে। এর আগে শুক্রবার শিশুটিকে আদালতের কাঠগড়ায় হাজির না করেই নিয়মিত নথিপত্রের বাইরে একটি অন্তর্বর্তীকালীন আদেশের মাধ্যমে টঙ্গীতে পাঠানো হয়েছিল।
এদিকে অপহরণের অভিযোগ উঠলেও চার বছর বয়সী রামিমের কোনো খোঁজ এখনো মেলেনি। তার নিখোঁজের রহস্য উদঘাটনে তদন্ত চলছে।
